kalerkantho

বিজ্ঞান

পৃথিবী ছাড়িয়ে অন্য প্রাণ

পৃথিবীর বাইরে প্রাণী আছে? থাকলে তারা কেমন? পৃথিবীর মতো কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন দিয়ে তৈরি? নাকি বাক্সের বাইরে চিন্তা করতে হবে? অসম্ভব মনে হলেও পৃথিবীর বাইরে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে গড়ে উঠতে পারে এমন কিছু প্রাণিজগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন কাজী ফারহান পূর্ব

২৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পৃথিবী ছাড়িয়ে অন্য প্রাণ

প্যানস্পার্মিয়া

প্যানস্পার্মিয়া হলো এমন এক ক্ষুদ্র প্রাণ, যারা এক গ্রহ থেকে আরেক গ্রহে গ্রহাণু, স্পেস ডাস্ট, ধূমকেতু, মহাকাশযান—এসবের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ধরনের এলিয়েন অণুজীব যদি থেকে থাকে, তবে তাদেরকে প্রচণ্ড বৈরী পরিবেশে খাপ খাওয়ার মতো হতে হয়। কারণ মহাশূন্যের গড় তাপমাত্রা অনেক কম। প্রায় মাইনাস ২৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবার মহাকাশের মধ্য দিয়ে ভ্রমণের সময় এই প্রাণগুলোর অনেক গরমও সহ্য করা লাগে। এ ছাড়া গ্রহাণুর মধ্যে সংঘর্ষ, কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে সৃষ্ট উত্তাপ—এগুলোকেও উতরে যেতে হবে। শুনে অবাক হবে যে এ ধরনের প্রাণ পৃথিবীতেও আছে। এদের টার্ডিগ্রেড বা জলভালুক বলে। লাইভসায়েন্স ডটকম থেকে জানা যায়, মাইনাস ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ঠাণ্ডা এবং ১৪৮.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গরমেও কিছু হয় না ওদের। চরম পরিবেশে থেকে অভ্যস্ত বলে এদের এক্সট্রিমোফাইলও বলা হয়।

 

নেবুলায় প্রাণ

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, জৈবযৌগসমৃদ্ধ স্থানে প্রাণের বিকাশ ঘটা অসম্ভব নয়। আতাকামা লার্জ মিলিমিটার-সাবমিলিমিটার টেলিস্কোপ দিয়ে দেখা যায়, আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ের এক লাখ ৬৩ হাজার আলোকবর্ষ দূরে লার্জ মেগালিথিক ক্লাউড নামের একটি প্রতিবেশী গ্যালাক্সির দুটি নেবুলাতে জীবন গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক মিথানল, ডাইমিথাইল ইথার এবং মিথাইল ফরমেট রয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, যথেষ্ট সময় এবং উপযোগী অবস্থা পেলে এই অণুগুলোই হয়তো প্রাণের ভিত্তি হয়ে দাঁড়াবে। পরে তারা জটিল জটিল প্রাণীতে পরিণত হতে পারবে। পৃথিবীর মতো মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সেখানে নেই। তাই প্রাণীগুলোর চেহারা কেমন হবে, তা নিয়ে ধারণা নেই বিজ্ঞানীদের।

 

প্লাজমাভিত্তিক প্রাণ

উত্তপ্ত আয়োনাইজড গ্যাস হলো প্লাজমা। এটা হলো প্রায় সমানসংখ্যক ধনাত্মক আধানযুক্ত আয়ন এবং ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রনের একটা গণগণে স্যুপের মতো। পদার্থের কঠিন, তরল ও বায়বীয় অবস্থা তো চেনোই। চার নম্বর অবস্থাটি হলো এই প্লাজমা। ২০০৭ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, প্লাজমা ও তার আশপাশের কিছু কণাগুলো এমন আচরণ করতে পারে, দেখে মনে হবে—ওটাও একটা প্রাণী। এমনকি তারা ডিএনএর গঠনও করতে পারবে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা।

 

আরো যতভাবে সম্ভব

এখন পর্যন্ত আমরা জীবন সম্পর্কে যা জানি, সবই কার্বন বেইজড, মানে মৌলিক পদার্থ কার্বনকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা। সুতরাং এটা বলাই যায় যে শত শত গ্রহ আছে, যেখানে কার্বনভিত্তিক প্রাণের বিকাশ হতে পারে। আমাদের পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাণীর দিকে তাকালেই দেখা যায়, তারা যেকোনো স্থানে যেমন—কেউ সমুদ্রের গভীরে, কেউ বা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের মতো গরম স্থানেও বেঁচেবর্তে আছে। তাই পৃথিবীর বাইরেও এমন পরিবেশ নেই, তা তো হলফ করে বলা যায় না। কার্বনের একটি যৌগ মিথেনও প্রাণের ভিত্তি হতে পারে। শনির বৃহত্তম উপগ্রহ টাইটান এর ভালো উদাহরণ। কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে জানা যায়, মিথেননির্ভর প্রাণ অত্যন্ত শীতল পরিবেশের জন্য উপযোগী। তাদের অক্সিজেনেরও দরকার নেই। আরো চমক আছে! পানিকে আমরা জীবনের সঙ্গে তুলনা করি। কিন্তু পৃথিবীর বাইরে পানির বিকল্প কী হতে পারে? বিজ্ঞানীরা বলেন, এমোনিয়া হতে পারে সেই বিকল্প যৌগ। পানির বিকল্প হতে হলে সেই যৌগের তাপমাত্রার রেঞ্জ বেশি হতে হবে। পানি ০ থেকে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে তরল থাকে, অর্থাত্ এর রেঞ্জ ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এমোনিয়ার রেঞ্জ ৪৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা তুলনামূলকভাবে টাইটানের মতো ঠাণ্ডা উপগ্রহে পানির মতো আচরণ করে। তবে এমোনিয়াকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এসব প্রাণের বিকাশ হবে খুব ধীরগতিতে। তবে তাদের জীবনকাল হবে অনেক বেশি।

বিজ্ঞানীরা আর্সেনিকভিত্তিক জীবনের কথাও কল্পনা করছেন। যেখানে আমরা আর্সেনিককে ক্ষতিকর জানি, তা দিয়েই প্রাণের বিকাশ? কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, আর্সেনিক নাকি একটা সময় পৃথিবীর প্রাণীর ডিএনএরই অংশ ছিল! পরে সেই জায়গা দখল করেছে ফসফরাস। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আমাদের মতো জটিল প্রাণের জন্য বিষাক্ত পদার্থটি উপযোগী না হলেও অ্যামিবার মতো সরল প্রাণের বিকাশে আর্সেনিক কাজে আসবে।

জীবনের বিকল্প বিকাশে আরেকটি ভিত্তি হতে পারে সিলিকন। ওয়েবএলিমেন্টস ডটকম থেকে জানা যায়, পৃথিবীতে দ্বিতীয় সহজপ্রাপ্য মৌল হলো সিলিকন, যা সিলিকন ডাই-অক্সাইড হিসেবে বালি, কোয়ার্টজ, পাথর, ক্রিস্টালে পাওয়া যায়। এর কাজকর্মের সঙ্গে কার্বনের মিল পাওয়া যায়। কার্বন যেমন তার অণুর চার হাত ব্যবহার করে যৌগ গঠন করে, সিলিকনেরও সেই ক্ষমতা আছে। পৃথিবীতেই ডায়াটম নামক এক ধরনের এককোষি শৈবাল আছে। লাইভসায়েন্স ডটকমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ডায়াটম নাকি প্রতিবছর ৬০০ কোটি মেট্রিক টন সিলিকন ব্যবহার করে পৃথিবীর ২০ শতাংশ অক্সিজেন উত্পাদনে বিশেষ অবদান রাখছে।

 

হয়তো আমরা একাই থাকব

এমনও হতে পারে যে মহাবিশ্বে পৃথিবীই একমাত্র প্রাণের ধারক। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এতই বিশাল যে আমাদের বাইরে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব আদৌ আছে কি না তা খুঁজে বের করা আপাতত অসম্ভব। তা ছাড়া আমাদের বিশ্বের বয়স মাত্র ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। সংখ্যাটা খুব বড় মনে হলেও মহাবিশ্বের সম্ভাব্য আয়ুর হিসাবে এটা শিশুকাল। বিজ্ঞানের বেশ কিছু ওয়েবসাইট বলছে, মহাবিশ্ব তার জীবনের মাত্র ১.৩৮ শতাংশ সময় পার করেছে। তাই এমনও তো হতে পারে যে পৃথিবীতেই প্রথম প্রাণের বিকাশ ঘটেছে। পরে আরো আরো গ্রহে ঘটবে। এমনও হতে পারে, কিছু কিছু গ্রহে এখন সবে এককোষি প্রাণের আবির্ভাব ঘটেছে। তার পরও বিজ্ঞানীরা কান খাড়া করে আছেন। দূরের কোনো গ্রহের একটা ছোট্ট সংকেতও যদি শোনা যায়!

গ্রহাণুতে বয়ে বেড়াতে পারে প্যানস্পার্মিয়া নামের ক্ষুদ্র প্রাণ

সিলিকনের সঙ্গে কার্বনের মিশেলে প্রাণের অস্তিত্ব দেখা গেছে পৃথিবীতেই, তো বাইরে থাকতে দোষ কী! ছবিটা কি শিল্পীর আঁকা একটি সিলিকনভিত্তিক জলহস্তীর?

এখন হয়তো আমরা একা; কিন্তু মহাবিশ্বের হাতে যে এখনো প্রায় ৯৯ শতাংশ আয়ু পড়ে আছে।

মন্তব্য