kalerkantho

মুক্তিযুদ্ধের সত্যি গল্প

পথ দেখাল রমজান

মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে দিনাজপুরের জলপাইতলিতে পাকিস্তানিদের একটি ক্যাম্পে সফল অপারেশন চালিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। ওই অপারেশনের পথ দেখিয়েছিল রমজান নামের ১৩ বছর বয়সী এক কিশোর। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও লোকমুখে প্রচলিত রমজানের গল্পটা শোনাচ্ছেন হাসান মাহামুদ

২৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পথ দেখাল রমজান

রমজান সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়নি। যুদ্ধ করবে কী, ভারী অস্ত্র তোলার শক্তি থাকতে হবে তো গায়ে! একদিনের একটি অপারেশনে সহযোগী ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে। আর তার সেই সহযোগিতার কারণে সেদিন মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানিদের একটি ক্যাম্প উড়িয়ে দেয়।

১৯৭১ সালে বগুড়ার শান্তাহার রেলস্টেশনে ছিল রমজানের বাবার চায়ের দোকান। পাকিস্তানিরা যখন শান্তাহারে আক্রমণ চালায়, তখন রমজানের বাবাকে দোকানেই গুলি করে মারে। কাছেই ছিল রমজানদের ছোট্ট থাকার ঘর। সেই ঘরও জ্বালিয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনারা।

স্টেশনের আশপাশে যারা থাকত, তাদের সঙ্গে পালায় রমজান। মাকে খুঁজে পায়নি। সম্ভবত তাঁকেও সেদিন মেরে ফেলে হানাদাররা। এক দিনেই সবাইকে হারিয়ে দিশাহারা ও ক্লান্ত রমজান রাতে চলে আসে ভারত সীমান্তের কাছাকাছি অচেনা এক জায়গায়। সকালে যখন ঘুম ভাঙে, দেখে কেউ নেই। সে একা। পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন আশরাফ মণ্ডল নামের এক ব্যবসায়ী। রমজানের ঘটনা শুনে তাকে নিয়ে এসে নিজের চালের আড়তে কাজ দেন। সেখানে হাজির হয় এক রাজাকার। রমজানকে ভয় দেখিয়ে নিয়ে যায় পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে। ফরমায়েশ খাটার জন্য।

এদিকে নভেম্বরের দিকে ওই অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা তুমুল প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু করেছে। এক ভোররাতে আবদুর রহমান নামের এক মুক্তিযোদ্ধা লুকিয়ে জলপাইতলির পাকিস্তানি ক্যাম্পের তথ্য আনতে যান। হঠাত্ চোখে পড়ে রমজানকে। নাগালের কাছে আসতেই ছেলেটাকে ধরে নিয়ে আসেন মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে। তবে ভয় পায় না রমজান। সে জানে, এরা মুক্তিবাহিনী। তাই দেরি না করে ভেতরের সব কিছু খুলে বলে। এমনকি সুযোগ থাকলে দেশের জন্য কিছু করার আকুতিও জানায়।

১৭ নভেম্বর ঠিক করা হয়, পাকিস্তানিদের ক্যাম্প রেকি করা হবে। শত্রুর অবস্থান, গতিবিধি—এসব জানা থাকলে পরিকল্পনা সহজ। কিন্তু ক্যাম্পের আশপাশে যাওয়া ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধা তারেক বলেন রমজানের কথা। রমজান তো ক্যাম্পেই কাজ করেছে। সব কিছু বুঝিয়ে বলতেই রাজি হয়ে যায় কিশোর। সেনাদের চোখ এড়িয়ে ক্যাম্পের কাছাকাছি যাওয়ার কিছু পথের কথা সে জানত। সেগুলোই চিনিয়ে দেয় মুক্তিযোদ্ধাদের। সঙ্গে থাকে নিজেও। রীতিমতো সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যায় রেকি করা দলটিকে। সফল রেকি শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আক্রমণ হবে ২০ নভেম্বর।

আক্রমণের প্রস্তুতি চলে ক্যাম্পে। রমজানের মধ্যেও সেকি চঞ্চলতা! সে-ও থাকবে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে।

দিনাজপুর এবং হিলির দিকে ব্লকিং পজিশন তৈরি করে আক্রমণ চালানো হলো। আক্রমণের প্রথম ধাপেই পাকিস্তানি বাহিনী হতভম্ব হয়ে যায়। কিছু সেনা পালিয়ে যায় ফুলবাড়ীর দিকে। বাকিরা এক দিক থেকে তখনো মেশিনগানের গুলি এবং গোলা ছুড়তে থাকল। মুক্তিবাহিনীর দলটি কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। পাল্টা আক্রমণ থামিয়ে পেছন দিক থেকে একটা বাংকারে যাওয়ার পথ খুঁজতে লাগলেন মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার। আবার দায়িত্ব পড়ল রমজানের কাঁধে। বাঁশঝাড়, ডোবা পার হয়ে রমজান তখন মুক্তিযোদ্ধাদের দলটিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসে বাংকারের কাছে।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৬ গার্ড রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল ভি কে দত্ত বাংকারের কাছে আসতে পেরে দারুণ খুশি। রমজান তাঁদের এমন এক জায়গায় নিয়ে আসতে পেরেছিল যে সেখান থেকে সহজেই পাকিস্তানি ক্যাম্পটি উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। তবে ঝুঁকিও অনেক। কারণ বাংকারটা ক্যাম্পের এত কাছে যে শত্রুরা জানতে পারলে এক গোলার আঘাতেই খতম করে দেবে।

কর্নেল দত্ত রকেট লঞ্চার ফায়ার করতে বললেন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন। প্রথম আঘাতেই উড়ে গেল ক্যাম্প। আহত পাকিস্তানিদের আর্তনাদের সঙ্গে থেমে গেল প্রতিরোধ। আক্রমণ সফল। সবাই উল্লাস করছিল। কিশোর রমজান একটু বেশিই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। কিছু না বুঝেই বাংকার ছেড়ে ক্যাম্পের দিকে দৌড়াতে থাকে। পেছন থেকে ডাকাডাকি করলেও শোনেনি। ক্যাম্পের কাছে মাইন পুঁতে রাখত পাকিস্তানি বাহিনী। আর এমনই এক মাইনে পড়ে গেল রমজানের পা। গোটা এলাকা কাঁপিয়ে ঘটল বিস্ফোরণ। ছোট্ট কিশোর রমজান চলে গেল না-ফেরার দেশে। মুহূর্তেই উল্লাস ঢেকে গেল বিষাদে। সবার চোখে পানি। রমজানের ছিন্নভিন্ন শরীরের যেটুকু পাওয়া গেল, সেটুকু একটা স্ট্রেচারে তুলে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় রমজানকে সবাই শেষ বিদায় জানায়।

দিনাজপুর অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে রমজানের নাম খুব একটা আসেনি। কিন্তু সেদিনের জলপাইতলিতে যুদ্ধে যারা ছিলেন, তারা আজও মনে রেখেছেন অকুতোভয় কিশোর রমজানকে।

মন্তব্য