kalerkantho

মুক্তিযুদ্ধের সত্যি গল্প

বাবার রক্তে লাল রাজ্জাকের জামা

১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল, সিরাজগঞ্জ। চোখের সামনে দানবীয় হত্যাযজ্ঞ শুরু করে পাকিস্তানি বাহিনী। ক্ষেতে দাঁড়িয়ে তা দেখছিল বাবা আর ছেলে। আচমকা তাদের সামনেই চলে আসে শত্রুসেনাদের একটি দল। তারপর? ১৯৭১ সালে কিশোর রাজ্জাকের দেখা বিভীষিকার গল্পটা তুলে ধরেছেন অসীম মণ্ডল

২৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাবার রক্তে লাল

রাজ্জাকের জামা

অঙ্কন : মাসুম

আগের রাতে—অর্থাত্ ২৬ এপ্রিলই সিরাজগঞ্জ শহর ছেড়ে চলে যান ছাত্রনেতারা। শহর দখলে নিয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তাদের সঙ্গে আছে ঈশ্বরদী থেকে আসা অবাঙালিরাও। প্রাণের ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছে সবাই। তবে রাস্তাঘাট ভালো নয়, পাকিস্তানিরা আসতে পারবে না—এই ভরসায় গ্রামেই রয়ে যান অনেকে।

সিরাজগঞ্জ শহর থেকে দুই মাইল পশ্চিমের ধীতপুর আলাল গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক শেখের বয়স তখন বারো কি তেরো। ক্ষেতের কাজে বাবাকে সাহায্য করতে যায় নিয়মিত। সেদিনও পাশের বেড়াবাড়িচরে কাজ করতে যায় বাপ-বেটা। দুজন ভাবে, চরে থাকলে দূর থেকেও দেখা যাবে শত্রুসেনাদের। দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া যাবে।

বিকেলের দিকে শহর থেকে পাকিস্তানি বাহিনী হামলে পড়ে ধীতপুর আলালসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামে। বাড়ি বাড়ি আগুন দিতে দিতে নিরীহ মানুষদের তাড়া করতে থাকে দানবের মতো। ক্ষেতের মধ্যে দাঁড়িয়ে দেখে রাজ্জাক ও তার বাবা। হঠাত্ তাদের সামনেই চলে আসে পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল। তাড়া করে ওদের। চিলের মতো দৌড় দেয় কিশোর রাজ্জাক। কিন্তু বয়সের ভারে দৌড়ে পারেন না বাবা। পাকিস্তানি সেনাদের একজন খপ করে ধরে ফেলে ইসমাইলকে।

রাজ্জাক পালিয়ে বেড়াবাড়ি গ্রামের চরার মধ্যে একটি গাছে উঠে পড়ে। দেখে, বাবাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানি সেনারা। তাকে নিয়ে ধীতপুর আলাল গ্রামের তফিজ খাঁর বাড়ির সামনে দাঁড় করায় অন্যদের সঙ্গে। দূর থেকে রাজ্জাক চেয়ে থাকে অপলক। ভেবেছিল, মারধর করে ছেড়ে দেবে সবাইকে। কিন্তু তা আর হয় না। আচমকা ঠা ঠা করে গুলি চালিয়ে দিল। লুটিয়ে পড়ল সবাই। হতবিহ্বল কিশোর রাজ্জাকের চোখের সামনেই ঢলে পড়ে তার বাবা।

কতক্ষণ গাছের ওপর বসে ছিল মনে করতে পারে না রাজ্জাক। পাকিস্তানি সেনারা হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে চলে যায়। একসময় রাজ্জাক নেমে আসে গাছ থেকে। এগিয়ে আসে নদীর ঢালে। তখনো কেউ কেউ কাতরাচ্ছে পানি পানি করে। অনেকে এসেছেন স্বজনের লাশ খুঁজতে। রাজ্জাকও তার বাবাকে খুঁজতে থাকে লাশের স্তূপে। একসময় পেয়েও যায়। ভাবে, যেভাবেই হোক লাশ নিয়ে যাবে বাড়িতে, কবর দেবে। টেনেহিঁচড়ে কোনোমতে কাঁধে নেয় বাবা শহীদ ইসমাইলের লাশ। রক্তে লাল হয়ে যায় কিশোর রাজ্জাকের জামা। ঘাবড়ে যায় খুব। অবশ হয়ে আসে শরীর। ওইটুকুন শরীরে এত শক্তি পাবে কোথা থেকে! বাবার লাশটা শুইয়ে দেয় মাটিতে। চিন্তা করে, বাড়িতে কাউকে না কাউকে পাবে। তাকে বলবে বাবার লাশটা নিয়ে যেতে।

ফেরার পথে কাউকেই খুঁজে পায় না কিশোর রাজ্জাক। দু-একজন পরিচিতের সঙ্গে দেখা হলেও তারা রাজ্জাকের রক্তে ভেজা শরীর দেখে দৌড়ে পালায়। ততক্ষণে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। সারা রাত বাড়ির আঙিনায়ই কাটে রাজ্জাকের। ভোরে আবার ছুটে যায় তফিজ খাঁর বাড়ির সামনে। তখনো চলছিল লাশের খোঁজ। রাজ্জাক তার বাবার লাশের পাশে দাঁড়ায়। আঁতকে ওঠে! লাশের অনেক জায়গা খুবলে গেছে। জানতে পারে, শেয়ালের কাজ।

সেদিন সেখানে মারা গিয়েছিলেন মোট ৩৯ জন। আর তখনো ১৭টি লাশ পড়ে ছিল সেখানে। কেউ কেউ পরামর্শ দেয়, বাকিদের এখানেই গণকবর দেওয়া ভালো। এগিয়ে আসেন ফুলবাড়ী গ্রামের বীরু মুন্সী। তাঁর পরামর্শে মরদেহের স্তূপের ওপর কয়েক কলসি পানি ঢেলে দিয়ে গোসলের কাজ করা হয়। যে কয়জন উপস্থিত ছিলেন তাঁদের নিয়ে জানাজা পড়ান বীরু মুন্সী।

এখন আবদুর রাজ্জাক শেখ ষাটোর্ধ্ব কিষান। ইদানীং চোখে ভালো দেখেন না। তবু ক্ষেতের কাজ শেষে প্রতিদিন বিকেলে বসে থাকেন তফিজ খাঁর বাড়ির সামনে। বসে বসে ধানচারার মাথা দোলানো দেখেন, আর ভাবেন, তাঁর বাবা শহীদ ইসমাইল হোসেন শেখ যেন ধানচারা হয়ে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে তাঁকেই ডাকছেন। বাবার কথা মনে হতেই বুকটা কেঁপে ওঠে তাঁর। পানিতে ভরে যায় দুচোখ। এভাবেই প্রতিদিন সন্ধ্যা নামে রাজ্জাকের।

মন্তব্য