kalerkantho

মুক্তিযুদ্ধের সত্যি গল্প

দেখি বাবার শরীরটা হলুদ হয়ে গেছে

মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকের ঘটনা। বাড়ির পাশে কামানের গোলা এসে পড়তেই সবাইকে নিয়ে ছুটতে থাকেন কিশোর ফখরে আলমের বাবা। একপর্যায়ে খিদে পায় সবার। কিন্তু আশপাশে খাবার নেই। মা জানান, বাড়িতে রান্না করা ছিল। সেটা আনতে ফের ছুটে যান বাবা। ভয়াবহ সেই সময়টার কথা শোনা যাক ফখরে আলমের মুখেই

২৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দেখি বাবার শরীরটা হলুদ হয়ে গেছে

অঙ্কন : দেওয়ান আতিকুর রহমান

যশোর শহরতলির চাঁচড়া গ্রামে আমাদের বাড়ি। পাশ দিয়ে গেছে মুক্তেশ্বরী নদী। একাত্তরে আমার বয়স ১০-১১ বছর। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শুরুতে যশোর শহরে গোলাগুলি শুরু হয়। আমার বাবা তখন ডিএসবিতে কর্মরত। ৩ মার্চ সন্ধ্যায় বাড়ি এসে বলেন, ‘টিঅ্যান্ডটি অফিসের সামনে পাকিস্তানি আর্মি গুলি চালিয়েছে। গুলিতে একজন শহীদ হয়েছেন। শহরের পরিস্থিতি খুব খারাপ। পাকিস্তানি বাহিনী খ্যাপা হয়ে গেছে।’

২৫শে মার্চ শহরে ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানি আর্মি এসে গোলাগুলি শুরু করে। এলাকার অনেক নেতাকর্মীকে ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী যশোরের অন্যতম নেতা এমপি মশিয়ূর রহমানও ছিলেন। ক্যান্টনমেন্টের টর্চার সেলে তাঁর ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। পরে শুনি, পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে ২৩ এপ্রিল মেরে ফেলেছিল।

শহর থেকে শত শত মানুষ প্রাণভয়ে গ্রামে চলে আসছে। কেউ রিকশায়, কেউ হেঁটে আমাদের বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে শাড়াপোলের দিকে ছুটতে থাকে। আমরা চিঁড়া-মুড়ি ও পানি নিয়ে মুক্তেশ্বরী সেতুর কাছে দাঁড়িয়ে থাকি। ক্ষুধার্ত শরণার্থীদের মুখে তুলে দিই।

জানতে পারি, পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ভাতুড়িয়া, রুপদিয়া, শাড়াপোল, বেনেয়ালি, মথুরাপুরসহ বিভিন্ন গ্রামের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ শহরের দিকে ছুটে যাচ্ছে। তাদের পরিকল্পনা হলো, ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে পাকিস্তানি সেনাদের মেরে ফেলবে।

আমিও মিছিলের সঙ্গে ছুটতে থাকি। অনেকটা পথ যাওয়ার পর বড়রা বলেন, ‘তোমরা বাড়ি ফিরে যাও। ছোট মানুষ। যুদ্ধ করতে পারবে না।’ আমরা শিশু-কিশোররা দল বেঁধে বাড়ি ফিরে আসি।

আধা ঘণ্টা পরই গুলির শব্দ শুনি। অনেক মানুষ দৌড়ে গ্রামের দিকে পালাচ্ছে। জানতে পারি, চাঁচড়া রাজবাড়ীর সামনে জয় বাংলার মিছিলে পাকিস্তানি সেনারা গুলি চালিয়েছে। অনেকে শহীদ হয়েছেন। যারা দা-খন্তা নিয়ে গ্রাম থেকে ছুটে গিয়েছিল, তাদের ৪০-৫০ জনকে মেরে ফেলেছে। গ্রামের মহিউদ্দিন শরীফ, বর্মণপাড়ার শ্যাম বর্মণ, রতন বর্মণ, রাজবাড়ীর নজরুলের স্ত্রীসহ আরো কয়েকজন মারা গেছেন। নজরুলের স্ত্রী তাঁর কোলের শিশুকে দুধ খাওয়াচ্ছিলেন। বুলেটের আঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়। শিশুটি অক্ষত ছিল। মর্মান্তিক এই ঘটনার খবর বিবিসিতেও প্রচার হয়েছিল।

অবশ্য পাল্টা প্রতিরোধের ঘটনাও ঘটেছে। রাজবাড়ীতে ওই দিনই বাঙালিদের হামলায় প্রায় ৫০ জন পাকিস্তানি সেনা মারা যায়। পরদিন আবার শত শত লোক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে। পানি ও বিদ্যুতের লাইন কেটে দেয়। বন্ধ করে দেয় খাবার সরবরাহের রাস্তাও। কয়েক দিন ঘেরাওয়ের পর ৪ এপ্রিল ক্যান্টনমেন্ট থেকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে পাকিস্তানি সেনারা বের হয়ে আসে। তাদের সঙ্গে আমাদের বাড়ি থেকে এক মাইল দূর বিএডিসি অফিসের কাছে সাধারণ মানুষের যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধেও অনেকে মারা যান। আমাদের গ্রামের প্রায় সব যুবক এ যুদ্ধে অংশ নেয়। আমরা বাড়ি থেকে গুলির আওয়াজ শুনি। সন্ধ্যা পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। এলাকার বড় ভাইয়েরা পাকিস্তানি সেনাদের পরাজিত করে তাদের অস্ত্র নিয়ে আসেন।

পরে পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে আমার বাবা অভয় দিয়ে আমাদের বলেন, বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে হবে। একদিন সকালে পাকিস্তানি সেনাদের একটি কামানের গোলা এসে পড়ে আমাদের বাড়ির পাশে। গোলার আঘাতে আমাদের বাড়ির পশ্চিম পাশের আমগাছ উপড়ে যায়। আমরা সবাই খাটের নিচে ঢুকি। আমার বাবা আমাদের দুই ভাইকে আবার খাটের নিচ থেকে বের করে আনেন। তিনি মাকে বলেন, ‘আমি আগে ছেলেদের নিয়ে গেলাম।’ আমার বাবা লুঙ্গি পরা। খালি গা। আমাদেরও গায়ে কিছু নেই। তিনি আমাদের দুই ভাইয়ের হাত ধরে দৌড়াতে থাকেন। মুক্তেশ্বরী নদী পার হয়ে দাড়িপাড়ার হাজের আলীর বাড়ির কাছে পৌঁছলে আরেকটি কামানের গোলা এসে পাশের পুকুরে পড়ে। বাবা আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়েন।

পরে আবার উঠে দৌড়াতে থাকি। ভাতুড়িয়া গ্রাম পার হয়ে হরিণার বিলের কালাবাগা মাঠে এসে পৌঁছি। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। মা আর ছোট তিন বোনের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল। আমি কাঁদছিলাম। বাবা বলেন, ‘তোরা এখানে বস। আমি বাড়ি গিয়ে তোর মা-বোনদের নিয়ে আসি।’

আমরা দুই ভাই রাস্তার পাশে বসে থাকি। এখান থেকে আমাদের বাড়ি দুই-তিন মাইল হবে। দেখি শত শত মানুষ শহর থেকে পালিয়ে শাড়াপোল গ্রামের দিকে ছুটে যাচ্ছে। সবার চোখেমুখে ভয় আর আতঙ্ক।

দুপুরের দিকে বাবা সবাইকে নিয়ে আসেন। এদিকে আমার আর হাঁটার শক্তি নেই। খিদের যন্ত্রণায় ছোট ভাই কাঁদছে। বাকিদের অবস্থাও খারাপ। এই অবস্থায় খাবারই বা কোথায় পাই! মা ছোট ভাইকে কোলে তুলে নিয়ে বাবাকে বলেন, ‘তুমি বাড়ি যাও। আমি ভাত রান্না করে রেখেছি, নিয়ে আসো।’ আবার ছুটতে থাকেন বাবা। আমরা বসেই থাকি। বিকেলের দিকে বাবা ফিরে আসেন। দেখি তাঁর পুরো শরীর হলুদ হয়ে গেছে। তিনি একটি লুঙ্গির ওপর ভাত আর ডাল ঢেলে একটি পুঁটলির মতো বানিয়ে মাথায় করে নিয়ে এসেছেন। সেই ডাল বাবার পুরো শরীর ভিজিয়ে দিয়েছে। আমরা সবাই মিলে সেই ডাল-ভাত খেয়ে জীবন বাঁচাই। বাবার হলুদ হয়ে যাওয়া শরীরটার ছবি এখনো চোখে ভাসে

মন্তব্য