kalerkantho

মুক্তিযুদ্ধের সত্যি গল্প

‘আইছি যহন আর ফেরত যামু না’

ময়মনসিংহের এ এস এম আকরাম ছিলেন ১১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা। নেত্রকোনার মদন, কেন্দুয়া, কিশোরগঞ্জের আঠারবাড়ি, বলাইশিমুল, কাওরাট ও তাড়াইলের দড়িজাহাঙ্গীরপুর, শৈলাহাটি, ধলা—এসব এলাকায় যুদ্ধ করেছেন গেরিলা ধাঁচে। বেঁচে থাকতে তাঁর মুখে যুদ্ধের গল্প শুনেছিলেন আবুল কালাম আজাদ। প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা আকরামের ভাষ্যে গল্পটি যেমন ছিল—

২৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



‘আইছি যহন আর ফেরত যামু না’

অঙ্কন : বিপ্লব

একটা মিশন ছিল কেন্দুয়ায়। কাওরাট এলাকায় নদীর পূর্ব পারে আমরা প্রতিরোধ করলাম। তথ্য ছিল, নদীর পশ্চিম দিক থেকে এসে পূর্ব পার হয়ে পাকিস্তানি সেনারা মদন যাবে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের কিছু সেনাকে অবরোধ করে রেখেছেন।

আকাশ পরিষ্কার। ছোট ছোট কিছু ট্রেঞ্চ (লম্বা করে বানানো গর্ত) বানালাম পজিশন নেওয়ার জন্য। এলএমজির ট্রেঞ্চটি একটু দূরে বড় করে তৈরি করলাম। ট্রেঞ্চগুলো নদীর পার থেকে নিচে, ধানক্ষেতে। সবাই পজিশন নিয়ে অপেক্ষা করছি। সারা দিন অপেক্ষা করার পর পজিশন তুলে নিলাম। ওরা শেষ পর্যন্ত এলো না।

পাশের মলিগ্রামে আশ্রয় নিলাম। গ্রামের একজন মুক্তিযোদ্ধাও সঙ্গে ছিলেন। সেখানে রাত কাটাই। সারা রাত বৃষ্টি। সকাল হতেই মুষলধারে আবার শুরু। সেই বাড়ি থেকেই দেখতে পেলাম, পাকিস্তানি সেনারা নদীর পার ধরে এগোচ্ছে। সঙ্গে ভারী অস্ত্র। ওরা রাস্তা পার হয়ে চলে গেল মদনের দিকে। আমরা পেছন থেকে ধাওয়া করলাম। সময়ের ব্যবধানটা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল, ফলে ওদের ধরতে পারলাম না। আবার ফেরত এলাম। দুই দিন পর ঠিক করলাম, পাশের এলাকা তাড়াইল যাব। নভেম্বরের শেষ তখন। হালকা শীতের আমেজ। সন্ধ্যায় দুজনকে সঙ্গে নিয়ে রওনা দিলাম। রাতে পৌঁছলাম। এক দোকানে রাত কাটালাম। সঙ্গের দুজন এক দিন থেকে ফিরে গেল। আমি রয়ে গেলাম।

পরদিন সকালে বাজারের পাশের গ্রাম সাচাইলের মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দীনের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাঁর বাড়িতে গেলাম। খেতে বসলাম। খাওয়া শেষ হয়নি। একজন এসে খবর দিল, কিশোরগঞ্জ থেকে পাকিস্তানি সেনারা অগ্রসর হচ্ছে। খাবার ফেলে বাইরে এলাম। থানার সামনে ইউনিয়ন কাউন্সিলের ফাঁকা জায়গায় দাঁড়ালাম। দেখলাম, পাকিস্তানি বাহিনী বিভিন্ন গ্রামে আগুন দিতে দিতে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যে আইয়ূব আলী নামে এক মুক্তিযোদ্ধা একটা এলএমজি নিয়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। তাঁর সঙ্গে আরো কয়েকটি ছেলে। তাদের মাথায় লাল কাপড় বাঁধা। পেটা শরীর সবার। চলনে-বলনে সাহসী। সঙ্গীদের বললাম, ওদের ঠেকাতে হবে, বসে থাকলে চলবে না। চলো সামনে। প্রতিরোধ করি। সামনেই হুতি গাঙ। সেই গাঙের পারে এসে পেছন ফিরে দেখি, নতুন যে ছেলেগুলো এসেছিল, ওদের পাত্তা নেই। আইয়ূব আলীকে বললাম, আইছি যহন তহন আর ফেরত যামু না।

গাঙ পার হয়ে হাঁটতে হাঁটতে শৈলহাটি গ্রামে পৌঁছলাম। এখানে দুই রাস্তার মিলনস্থল। একটা রাস্তা চলে গেছে কিশোরগঞ্জের দিকে, আরেকটি নান্দাইলে। আমরা কিশোরগঞ্জের রাস্তা ধরে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিলাম।

দুই কিলোমিটার পার হওয়ার পর দড়িজাহাঙ্গীরপুর গ্রাম। সামনে এগোলাম, আইয়ূব আলীকে বললাম আমার পেছন পেছন থাকতে। এ-ও বললাম, কোনো সমস্যা হলে কাভার দেবেন। দ্রুত হেঁটে গ্রামটি পার হয়ে শেষ মাথায় গিয়ে আরেকটি মাঠ পেলাম। মাঠের পাশ দিয়ে কাঁচা রাস্তা। দেখলাম, ৫০-৬০ জন পাকিস্তানি সেনা লাইন ধরে হেঁটে যাচ্ছে। পাশে একটি বিশাল মোটা আর বড় গাছ। গাছের আড়ালে গিয়ে অবস্থান নিলাম। দেখে মনে হলো, তারা এসএলআরের রেঞ্জে আছে। সাত-পাঁচ না ভেবে ফায়ার ওপেন করলাম। ওরা দাঁড়িয়ে গেল। গাছের আড়ালে লুকালাম। তারা হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগল আমাদের। কিছুক্ষণ পিনপতন নীরবতা। এরপর ওরাও ফায়ার করল। আমার ফায়ার ওদের সীমানা পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে মনে হলো না। আইয়ূব আলীও পেছন থেকে গুলি করতে করতে এগোতে থাকলেন। দুই পক্ষে কিছুক্ষণ গোলাগুলি চলার পর ভাবলাম, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে নির্ঘাত ক্রসফায়ারে পড়ব। ক্রলিং করে দক্ষিণ দিকে একটা টিলার আড়াল নিই। এরপর গুলি চালাতে থাকলাম। ওদিকে আইয়ূব আলী গ্রামের মুখে রাস্তার পাশে ওত পেতে পজিশন নিয়ে গুলি চালাতে থাকলেন।

টিলার পরে একটা পুকুর আছে। আমি ধীরে ধীরে সেটি অতিক্রম করে আইয়ূব আলীর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছি। অনেকটা সময় পর আইয়ূব আলীর কাছে পৌঁছলাম। আমাকে কাছে পেয়ে আইয়ূব আলীর চোখ যেন খুশিতে জ্বলে উঠল। দ্বিগুণ উত্সাহে গুলি চালাতে লাগল। আমিও ফায়ার করা শুরু করলাম। কিন্তু ওরা ততক্ষণে রেঞ্জের বাইরে। কিছুক্ষণ গোলাগুলির পর আইয়ূব আলীর এলএমজির গুলি বন্ধ হয়ে গেল।

এদিকে খবর পেয়ে আফতাব উদ্দীন কিভাবে যে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন, তা আজও আমার মাথায় আসে না। তার সাহসের তারিফ না করে পারি না। তিনি আমার পাশে এসে পজিশন নিলেন। গুলি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আইয়ূব আলী নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর হঠাত্ দেখি, আফতাব উদ্দীন পাশে নেই। তখন দুপুর ১২টা কি ১টা। চিন্তায় পড়ে গেলাম। পুকুরের জঙ্গল ঘেঁষে পাশে আরেকটি পুকুরের ঢালে আশ্রয় নিলাম। সেখান থেকে দেখলাম, সেনারা তিন ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একদল দক্ষিণের ক্ষেতের আইল দিয়ে বাজারের দিকে এগোচ্ছে। ফায়ার করলাম। মিস হলো। আরেক দল মেইন রোড ধরেই অগ্রসর হচ্ছে এবং তৃতীয় দল উত্তর দিক দিয়ে এগোচ্ছে। আমি প্রায় ওদের ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে যাচ্ছিলাম। তাই ওদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দ্রুত ক্রল করে মেইন রোড ধরে সেই হুতি গাঙের পারে এসে হেঁটে গাঙ পার হলাম। গাঙে তখন হাঁটুপানি। আইয়ূব আলীকে দেখলাম, এলএমজি কাঁধে উত্তর দিকে যাচ্ছেন। পাকিস্তানি সেনারা আমাদের আর খুঁজে পেল না।

এরই মধ্যে হেঁটে সাচাইল গ্রামে এলাম। এখানে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা সম্মুখযুদ্ধের জন্য অগ্রসর হচ্ছিলেন। তাঁদের একজন ছানা মিয়া। তাঁকে বললাম, পাকিস্তানি সেনারা তিন দিক ঘেরাও করে ফেলেছে। তোমরা সাচাইল গ্রামের ভেতর দিয়ে উত্তর দিকে গুলি করতে করতে আগাও।

কিন্তু আমি বোকামি করে পূর্ব দিকের মাঠে নেমে পড়লাম। সেই মাঠটা বাজারের খুবই কাছে। এদিকে দক্ষিণ দিকের দলের পাকিস্তানি সেনারা বাজারে ঢুকেই এলোপাতাড়ি গুলি করতে লাগল। মানুষ দিগ্বিদিক ছুটছে। মুহূর্তের মধ্যে বাজার খালি।

আমি বাজারের খুব কাছে। দূর থেকে ওরা আমাকে এসএলআর হাতে দেখলেও তেড়ে আসবে। তাই বোরো ধানের শুকনো ক্ষেতের মাঝখানে একটা নৌকার ভেতর অস্ত্রটা রেখে সাদাসিধা ভঙ্গিতে পূর্ব দিকে হাঁটতে থাকলাম। বুরগাঁও অতিক্রম করে বেলংকাপুর গ্রামে হাজির হলাম। এখান থেকে দেখতে পেলাম, পাকিস্তানিরা আফতাব উদ্দীনদের সাচাইলের বাড়িতে আগুন দিয়েছে। গ্রামের মানুষ যে যেদিকে পারছে ছুটে পালাচ্ছে। কেউ একটি সুতাও সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারছে না। শুধু দেহ আর পরিধানের কাপড়টাই পাথেয়। একদিকে ক্লান্তি, অন্যদিকে আগুন জ্বালানোর এমন ভয়াবহ দৃশ্য; মনটা হু হু করে উঠল। ওদের জন্য কিছু করতে না পারার জন্য।

এক বাড়ির বারান্দায় একটা লম্বা বেঞ্চে বসে আছি। ক্লান্তিতে চোখ ঢুলুঢুলু। বেঞ্চের ওপরই ঘুমিয়ে পড়লাম। জেগে উঠলে গ্রামের জনৈক ব্যক্তি আমার পরিচয় জানতে চাইলে আমি মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিলাম এবং আফতাব উদ্দীনের কথা বললাম। তিনি চিনলেন এবং তাঁর কাছে থাকার অনুরোধ করলেন। বললাম—না ভাই, আমার কাজ আছে, যেতে হবে। এসএলআরটা বোরোক্ষেতে রেখে এসেছি। আপনি পারলে সেটা আমাকে ফতেহপুর পৌঁছে দিন। এ কথা বলে চলে গেলাম। পরদিন সে ঠিকঠাক  অস্ত্রটা আমার কাছে পৌঁছে দেয়। নৌকায় পানি থাকায় অস্ত্রটার ভেতরেও পানি ঢুকেছিল। সেটি মুছে, রোদে শুকিয়ে, তেল মেখে ব্যবহার উপযোগী করে তুললাম।

ফতেহপুরে এরই মধ্যে একে একে অনেক মুক্তিযোদ্ধা জড়ো হলো। আমরা সেখানে বসে তাড়াইল প্রতিরোধের পরিকল্পনা করলাম। পরদিন আমরা ২০-২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা প্রতিরোধ অভিযানে যাত্রা করলাম। আমরা কৈজানি গাঙ পার হয়ে ধলাগ্রামে প্রবেশ করার পর পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ করলাম। স্থানীয় বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে গুলি ছুড়তে থাকলাম।

সময়ক্ষেপণ করছি বেশি; কিন্তু গুলি ছুড়ছি কম। কারণ আমাদের গুলি সীমিত। অনেকক্ষণ গোলাগুলির পর ওরা রণে ভঙ্গ দিল। এই যুদ্ধে সহযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুস শহীদ হন। আমাদের অন্য এক যোদ্ধাকে পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে যায়। তাঁর ভাগ্যে কী ঘটেছিল জানি না।

আব্দুল কুদ্দুসের লাশ নিয়ে গাঙ পার হলাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। কয়েকজনকে কৈজানি গাঙের গুদারাঘাটের পাশে একটি বাড়িতে থাকতে বললাম পর্যবেক্ষণের জন্য। এরপর ফতেহপুর চলে এলাম। রাতে মৃত শহীদ যোদ্ধাকে তাঁর গ্রামের গোরস্তানে দাফন করি। পরে দেশ স্বাধীন হলে আব্দুল কুদ্দুসের নামে আমাদের এলাকায় একটি সেতুর নাম রাখি আমরা।

মন্তব্য