kalerkantho

বিজ্ঞান

একগুঁয়ে তাপের যত বিদ্যা

পদার্থবিজ্ঞানের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে তাপ। তা কিভাবে কাজ করে, কোথায় যায়, কেন যায়—সব কিছুতেই বিজ্ঞানীদের খুঁতখুঁতে ভাব। তাপটাও বেশ নাছোড়বান্দা। নিজের কাজ নিজের নিয়মেই করতে চায়। বিজ্ঞানীরাও চান তাপের গলায় লাগাম পরাতে। তাপকে শাসন করতে পারলে বেশি বেশি কাজ করিয়ে নেওয়াটাই উদ্দেশ্য। তাপের একরোখা এ আচরণের আদ্যোপান্ত ধরার চেষ্টা চালাচ্ছেন কাজী ফারহান পূর্ব

১৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



একগুঁয়ে তাপের যত বিদ্যা

বিগব্যাংয়ের শুরু থেকেই মহাবিশ্বের সব কিছু ছুটে চলেছে এনট্রপি তথা বিশৃঙ্খলতার দিকে

কী এই তাপগতিবিদ্যা?

তাপের সঙ্গে শক্তি ও কাজের সম্পর্ক নিয়ে যে আলোচনা, সেটাই হলো তাপগতিবিদ্যা বা থার্মোডায়নামিকস। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সংজ্ঞা অনুযায়ী তাপ, কাজ, তাপমাত্রা এবং শক্তির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে যে বিজ্ঞান সেটাই তাপগতিবিদ্যা। তোমার সঙ্গে তোমার বইয়ের সম্পর্ক, তুমি সেটা ঠিকমতো পড়ছ কি না এবং তারপর তুমি পরীক্ষায় কেমন ফলাফল করো—এসব নিয়ে মা-বাবা যেমন আগ্রহ নিয়ে কথা বলেন, তেমনি তাপ কী পরিমাণ কাজ করল, ঠিকমতো করল কি না, কিভাবে করল—এগুলোও পদার্থবিজ্ঞানীদের বেশ ভাবায়। জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী আরনল্ড সমারফিল্ড মজা করে বলেন, ‘তাপগতিবিদ্যা একটা মজার বিষয়! প্রথমবার পড়লে মনে হবে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, দ্বিতীয়বার পড়লে মনে হবে, দু-একটা জিনিস বাদে একেবারে সব বোঝা গেল। তৃতীয়বার পড়ে মনে হবে, তুমি জানো তুমি আসলে কিছুই বুঝতে পারছ না। কিন্তু ততক্ষণে তুমি থার্মোডায়নামিকস বিষয়টার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছ, ফলে বোঝা না-বোঝার ব্যাপারটা অবান্তর!    

 

চার জবরদস্ত সূত্র

তাপগতিবিদ্যা কী তা তো বুঝলে। (নাকি বুঝলে না)! এর বিষয়গুলো কিন্তু একেবারে ইচ্ছামতো ঘটে না। ওই যে বললাম না, তাপ খুবই একগুঁয়ে স্বভাবের। এই তাপ হলো, শক্তির এমন একটি রূপ, যা বস্তুর অভ্যন্তরীণ শক্তির সঙ্গেও সম্পর্কিত। আর এটা তাপগতিবিদ্যার চারটি নির্দিষ্ট সূত্র মেনে চলে।

 

শক্তি ধ্বংস করতে পারবে?

আমরা বলি, এই যা! মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে গেল! কিন্তু এর মানে কি আমাদের মহাবিশ্বের মোট শক্তির কিছুটা লোপ পেয়ে গেল? এ প্রশ্ন শুনে মহাবিশ্বের বিলিয়ন বিলিয়ন গ্যালাক্সির বিলিয়ন বিলিয়ন তারা একচোট হেসে নেবে। কারণটা কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারবে। তাপগতিবিদ্যার চারটা সূত্রের মধ্যে প্রথমটি হলো শক্তির নিত্যতাসূত্র। ওলফ্রাম সায়েন্স ডটকম থেকে জানতে পারবে, ১৮৫০ সালের দিকে রুডলফ ক্লসিয়াস এবং উইলিয়াম থমসন এই সূত্র সম্পর্কে প্রথম আলোচনা করেন। এতে বলা হয়, শক্তি কখনো ধ্বংস বা সৃষ্টি করা যায় না, এক রূপ থেকে আরেক রূপে পরিণত করা যায় মাত্র। ধরো, তোমার বাসায় ১০টি বল রেখেছ। তোমার ছোট ভাই পাঁচটি বল বারান্দায়, তিনটি বল আলমারিতে আর বাকি দুটি ব্যাগে রেখেছে। শেষ পর্যন্ত কিন্তু তোমার বাসায় ১০টি বলই রয়েছে। মজার বিষয় হলো, পুরো বিশ্বের শক্তির পরিমাণও ওই বলের মতো নির্দিষ্ট। শুধু মাঝে মাঝে অবস্থানের পরিবর্তনের মতো শক্তির রূপের পরিবর্তন ঘটে। যেমন আমগাছের পাতা সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে আলোক শক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তর করে, সেই আমের মধ্যে রাসায়নিক শক্তি জমা রাখে। আর সেটা খেয়ে পত্রিকার হকার তোমার বাসায় আসার পথে সাইকেল চালালে রাসায়নিক শক্তিটা গতিশক্তিতে রূপ পায়। অর্থাৎ শক্তি ঠিক ‘নষ্ট’ হয় না। তাই বলে অকারণে পাখা-বাতি জ-ালিয়ে রাখবে না কিন্তু! কারণ কাজের উপযোগী শক্তি তথা বিদ্যুত্শক্তি, আলোক শক্তি এগুলোকে ধরতে পারাটা যথেষ্ট শ্রমসাধ্য। শক্তির রূপান্তর সম্পর্কে আরো জানতে চাইলে রোডরানার কার্টুনের মজার ভিডিওটি দেখে নিতে পার— www.youtube.com/watch?v=SYpJS3D6vo0

 

মহাবিশ্বের অসহায় মৃত্যু

তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্রে শক্তির রূপান্তরের কথা থাকলেও সে রূপান্তর কোন দিকে হবে এবং আদৌ তা হবে কি না, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো আলোচনা নেই। তোমার কাপের চা ঠাণ্ডা হচ্ছে, শরবতে চিনি দিলে তা গলে যাচ্ছে। এসব ঘটনা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটবে। কিন্তু একবার চিন্তা করে দেখো তো সেই ঠাণ্ডা চা কি আপনা-আপনি গরম হবে? অথবা গলে যাওয়া চিনি কি আপনা-আপনি ফেরত আসবে? সুতরাং এই স্বতঃস্ফূর্ততা এবং রূপান্তরের দিকই আমাদের দ্বিতীয় সূত্রের মূল বিষয়। এখন আবার আমাদের তাপ ভাইকে নিয়ে আসি। তাপ সব সময় উচ্চতর তাপমাত্রার বস্তু থেকে নিম্নতর তাপমাত্রার বস্তুতে প্রবাহিত হয়। ব্যাপারটা অনেকটা ওপর থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ার মতো। গড়াগড়িতে তাপ ভাইয়ার খুব আগ্রহ থাকলেও এর উল্টোটা—অর্থাৎ ওপরে ওঠার কষ্ট সইতে সে একেবারেই নারাজ! তাই ঠাণ্ডা বস্তু থেকে উষ্ণ বস্তুতে তাপের প্রবাহ ঘটাতে হলে আমাদের বাইরে থেকে যান্ত্রিক শক্তি ব্যবহার করে বাধ্য করতে হয়।

স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাপের আদান-প্রদানের জন্য তাপমাত্রার পার্থক্য থাকতে হবে। ধরো, দুটি বস্তুর মধ্যে তাপমাত্রার কোনো পার্থক্য নেই। তখন কিন্তু ওপর থেকে নিচে নামার আর কোনো সুযোগ নেই। তখন তাপও চুপচাপ বসে থাকবে। এখান থেকেই আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যার নাম এনট্রপি। আমেরিকান হেরিটেজ সায়েন্স ডিকশনারিতে বলা হয়েছে, কোনো একটা তাপীয় ব্যবস্থায় যদি কোনো ধরনের শক্তির রূপান্তর না ঘটে, তবে তাকে এনট্রপি বলে। তোমার চিনির শরবতের গ্লাসের গোলানো চিনির কথা মনে করো। খেয়াল করে দেখো, পানিতে গোলানোর আগে চিনিটা সুশৃঙ্খলভাবে বিন্যস্ত থাকে। কিন্তু পানির সংস্পর্শে গেলেই এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে যেতে থাকে। চিনি সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার পর আবার একটি স্থির অবস্থা তৈরি হলেও সেখানে কিন্তু একটা চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়। এই বিশৃঙ্খলার বিষয়টা অগোছালো বই-খাতা কিংবা স্কুল ছুটি হলে বাচ্চাদের হৈ-হুল্লোড়ের মতোই। কোনো ব্যবস্থা যত বিশৃঙ্খল হবে, তার এনট্রপিও তত বেশি। সব স্বতঃস্ফূর্ত পরিবর্তনই বিশৃঙ্খল হয়ে একটা পর্যায়ে সাম্যাবস্থায় আসে। আর এটাকেই বলে এনট্রপি বেড়ে যাওয়া। বিশ্বের সব কিছুই এমন এক অবস্থায় যেতে চায়। তাই বলা যায়, মহাবিশ্বের এনট্রপি ক্রমাগত বাড়ছে। ভয়ংকর বিষয়টা কী জানো? এই বিশৃঙ্খলার মান সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেলে সব কিছুর তাপমাত্রা সমান হয়ে যাবে। তখন তাপশক্তিকে আর যান্ত্রিক শক্তিতে পরিণত করা যাবে না! অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থে গোটা মহাবিশ্ব অলস হয়ে পড়বে। কোনো কাজই হবে না! এটাকে বলা যায়, মহাবিশ্বের তাপীয় মৃত্যু। মহাবিশ্বের সব শক্তি খরচ হয়ে যাবে অণু-পরমাণুর ঘোরাঘুরিতে।

সিনসিনাত্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক মুরে হ্যানসন বলেন, তারাগুলো তখন তাদের সব নিউক্লিয়ার জ-ালানি ক্ষয় করে ফেলে সাদা বামন অথবা ব্ল্যাক হোলে পরিণত হবে। এরপর সেগুলো কালক্রমে প্রোটন, ইলেকট্রন, ফোটন, নিউট্রনে পরিণত হবে। তবে এই তাপীয় মৃত্যু আমাদের জীবদ্দশায় ঘটছে না। ক্যালিফোর্নিয়া রিভারসাইড বিশ্ববিদ্যালয়ের গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানী জন বায়েজ বলেন, এনট্রপির চূড়ান্ত পর্যায় আসতে প্রায় ১০^১০^২৬ বছর লেগে যাবে! একেই বলে হিট ডেথ অব ইউনিভার্স বা বিশ্বের তাপীয় মৃত্যু। 

 

বিশৃঙ্খলার মান শূন্য কখন হবে?

পরম শূন্য বা অ্যাবসলিউট জিরো তাপ হলো, যার চেয়ে ঠাণ্ডা আর কিছু হতে পারে না। এর মান এক কেলভিন তথা মাইনাস ২৭৩.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিজ্ঞান ওয়েবসাইট আর্থ স্কাই ডটঅর্গ থেকে জানা যায়, বুমেরাং নেবুলা হলো এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে ঠাণ্ডা জায়গা। এ পর্যন্ত গবেষণাগারে অর্জিত সবচেয়ে কম তাপমাত্রা হলো মাইনাস ২৭৩.১৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ইতালিতে পরীক্ষাটি করা হয়। এদিকে আদর্শ ক্রিস্টাল হলো এমন ক্রিস্টাল, যাতে কোনো ভেজাল নেই। তত্ত্বীয়ভাবে প্রমাণ করা গেছে যে তাপগতিবিদ্যার তৃতীয় সূত্রানুসারে পরম তাপমাত্রায় আদর্শ ক্রিস্টালের ভেতর আর কোনো বিক্রিয়া বা ঘটনা ঘটবে না। অর্থাৎ এর এনট্রপি হবে শূন্য।

 

জিরোথ

তাপগতিবিদ্যায় এক নম্বরের আগেও একটি সূত্র আছে। হিসাব মতে, ওটার নাম শূন্যতম সূত্র। এ সূত্রানুসারে দুটি বস্তু যদি তৃতীয় বস্তুর সঙ্গে তাপীয় সাম্যাবস্থায় থাকে, তবে বস্তু দুটিও পরষ্পর তাপীয় সাম্যাবস্থায় থাকবে। ধরো, তুমি একটি থার্মোমিটারকে একটি গরম পানিভর্তি কাপে রাখলে এবং দেখলে, থার্মোমিটার রিডিং ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখন বলা যায় থার্মোমিটার এবং কাপটি তাপীয় সাম্যাবস্থায় আছে। এখন তুমি যদি এই থার্মোমিটারটিকেই দ্বিতীয় একটি কাপে নাও এবং দেখো যে সেটিও ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা দেখাচ্ছে, তাহলে বলা যাবে, দ্বিতীয় কাপটিও থার্মোমিটেরের সঙ্গে তাপীয় সাম্যাবস্থায় আছে। এ ক্ষেত্রে জিরোথ ল ব্যবহার করে বলা যাবে দুইটি কাপই তাপীয় সাম্যাবস্থায় আছে। কিন্তু একে শূন্যতম সূত্র বলা হয় কেন? কারণ প্রথম তিনটি সূত্র আবিষ্কার হওয়ার পর এ সূত্র আবিষ্কার হলেও তাপমাত্রা স্কেলের ধারণা দেওয়ায় সূত্রটি বিজ্ঞানীদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। এ কারণে এ সূত্রটাকে একেবারে সবার আগে, মানে শূন্য নাম্বারে স্থান দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য