kalerkantho


বিজ্ঞান

ওদের ভাষা

মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীদেরও আছে নিজস্ব ভাষা। আর ওরা কিভাবে একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তা জানতে বিভিন্ন সময় হয়েছে অনেক অনেক গবেষণা। এমন কিছু গবেষণা ও বুদ্ধিমান প্রাণীর গল্প শোনাচ্ছেন কাজী ফারহান পূর্ব

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



ওদের ভাষা

কোকো ও প্যাটারসন

পোষা কুকুর বা বিড়ালের ভাষা জানলে কী মজাই না হতো! গল্প করার নতুন নতুন সঙ্গী পাওয়া যেত। পাওয়া যেত বিচিত্র সব খবরও। বিবর্তনের বিভিন্ন অমীমাংসিত রহস্য পেত নতুন মাত্রা। সাধারণের কাছে এটা অসম্ভব মনে হলেও যুগে যুগে বিজ্ঞানীরা কিন্তু থেমে থাকেননি।

 

তারকা গরিলা কোকো

১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক পেনি প্যাটারসন কোকো নামের ওয়েস্টার্ন লোল্যান্ড জাতের একটি গরিলাকে নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেন। এই মেয়ে গরিলা কিন্তু সাধারণ ছিল না। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনে তাকে নিয়ে দুই দফা প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। কারণ গরিলাটিকে তার প্রশিক্ষক রীতিমতো সাংকেতিক ভাষা এবং একই সঙ্গে গলার স্বরও চিনতে শিখিয়েছিলেন। সাইকোলজিস্ট ওয়ার্ল্ড ডটকম থেকে জানা যায়, বুদ্ধিমান গরিলাটি মাত্র দুই সপ্তাহে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বস্তু পানি এবং খাবারের সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহারে ওস্তাদ হয়ে ওঠে। প্রতি মাসে নতুন নতুন চিহ্ন শিখে নিত কোকো। চার মাসে ২০০টি সংকেত শেখে ও। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের তথ্য মতে, এই সেলিব্রিটি গরিলাটি তার জীবনকালে প্রায় এক হাজার সাংকেতিক চিহ্ন এবং ইংরেজি ভাষার দুই হাজারের বেশি শব্দ শুনে বোঝার ক্ষমতা অর্জন করে। উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি কলেজের নৃতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক বারবারা কিং বলেন, ‘কোকো আমাদের দেখাতে পেরেছে, অন্য গরিলারাও সাংকেতিক ভাষায় যুক্তি দিয়ে বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ এবং প্রিয়জনের প্রতি ভালোবাসা-অনুভূতি দেখাতে পারবে।’ গত বছরের ১৯ জুন ক্যালিফোর্নিয়ার গরিলা ফাউন্ডেশন প্রিসার্ভে মারা যায় কোকো। তবে শেষের দিকে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা লিওনার্দো ডিকাপ্রিও, রবিন উইলিয়ামসেরও। এমনকি কোকোর আবার একটা পোষা বিড়ালও ছিল। এত কিছুর পরে নিশ্চয়ই তার সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহারের দক্ষতা এবং কর্মকাণ্ড দেখার ইচ্ছা জাগছে তোমাদের। তবে দেখে নাও এই ভিডিও

www.youtube.com/watch?v=SNuZ4OE6vCk&t=208s

 

লেক্সিগ্রাম কি-বোর্ড চালাচ্ছে লানা

কি-বোর্ড চালানো শিম্পাঞ্জি

যুক্তরাষ্ট্রের ইমরি ইউনিভার্সিটিতে জন্ম নেওয়া লানা নামের শিম্পাঞ্জিটি কি-বোর্ড ব্যবহার করে তার মনের ভাব প্রকাশ করতে পারত। ১৯৭১ সালে ডুয়ান ও আর্নসট নামের দুই বিজ্ঞানী লানাকে নিয়ে এক অবিস্মরণীয় অ্যাডভেঞ্চার শুরু করেন। রিসার্চগেট ডটনেট থেকে জানা যায়, ওই দুজন লানার জন্য একটি বিশেষ ভাষা তৈরি করেন, যার নাম ‘লেক্সিগ্রাম’। এ ভাষায় একটা চিহ্ন দিয়ে একটা শব্দ বোঝায়। বিজ্ঞানীরা প্রথমে ১২০টা লেক্সিগ্রাম তৈরি করেন। কিন্তু শব্দের ব্যবহারের জন্য তো ব্যাকরণও চাই। তাই দুই বিজ্ঞানী অনেক সময় দিয়ে একটা ব্যাকরণও তৈরি করেন। তাঁরা ওই চিহ্নভাষার নাম দেন ইয়ের্কিশ। ভাষা তৈরির পর শুরু হয় সেটি প্রয়োগের যন্ত্র তৈরির কাজ। জর্জিয়ার এক পরীক্ষাগারে তিন প্যানেলের চার শ লেক্সিগ্রাম-বিশিষ্ট একটি বিশেষ কি-বোর্ড তৈরি করেন বিজ্ঞানী ডুয়ান। এরপর চলে লানার প্রশিক্ষণ। লানা যখনই কি-বোর্ডের কোনো কি-তে চাপ দিত, সঙ্গে সঙ্গে তা মনিটরে গবেষকরা দেখতে পেতেন। তাঁরাও পাল্টা লেক্সিগ্রাম কি-বোর্ড চেপে লানার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। এভাবেই ধীরে ধীরে লানা রপ্ত করে ইয়ের্কিশ ভাষা। খিদে পেলে লানা কি-বোর্ড ব্যবহার করে গবেষণা সহকারীদের কাছে খাবারের অর্ডারও দিত এবং কিছু না থাকলে তা আনার অনুরোধও করত। লানার সঙ্গে লেক্সিগ্রাম ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা কী করে কথাবার্তা চালাতেন, সেটা দেখতে পাবে এই লিংকে- www.youtube.com/watch?v=HiWDKXRzSmU

 

ওয়াশুর ইশারা

১৯৬৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব নেভাদায় শিম্পাঞ্জির ভাষা নিয়ে একটি পরীক্ষা শুরু হয়। শিম্পাঞ্জিটির নামে প্রজেক্টটির নাম হয় ওয়াশু প্রজেক্ট। ওয়াশুকে প্রথমে সরাসরি মানুষের ভাষা শেখানোর চেষ্টা করা হতো। কিন্তু একসময় বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, শিম্পাঞ্জিদের কথা বলার মতো শারীরিক ক্ষমতা নেই। তাই কথা বলানোর চেষ্টায় ইতি টেনে ওয়াশুকে ইশারা ভাষার প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়। এ জন্য বিজ্ঞানীরা যুক্তরাষ্ট্রের মূক ও বধিরদের সাংকেতিক ভাষা এএসএল বা আমেরিকান সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বেছে নেন। এরপর চলে কঠোর পরিশ্রম। কাতুকুতু ছিল ওয়াশুর প্রিয়। তাই প্রথমেই বিজ্ঞানীরা ওয়াশুকে শেখান কিভাবে আরো বেশি সুড়সুড়ি চাইতে হয়। তারা শিম্পাঞ্জিটিকে বোঝাতে সক্ষম হন যে দুই হাত কাছে এনে আঙুলের ডগাগুলো একত্রিত করার মানেই হলো ‘আরো চাই’। ব্যস, ওয়াশুকে কেউ সুড়সুড়ি দিলেই সে দুই হাত এক করে বলে, ‘আরো চাই।’ যখন সে বিরক্ত হতো, তখন দুই হাত দূরে সরিয়ে দিত। এভাবেই আমেরিকান ইশারা ভাষা শিখে ফেলে ওয়াশু।

প্রায়ই ক্যামেরায় ধরা পড়ে প্রেইরি ডগদের মজার সব ছবি

প্রেইরি ডগের ভাষা

আমেরিকার বিশাল চারণভূমিগুলোকে প্রেইরি বলা হয়। এখানেই আজব প্রাণী প্রেইরি ডগদের আস্তানা। নামে ডগ কথাটা থাকলেও, কুকুরের সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক নেই। অনেকটা কাঠবিড়ালির মতো দেখতে এরা।

তো এই প্রেইরি ডগদের ভাষা নিয়ে নর্দার্ন আরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক স্লোবডচিকফের প্রবল আগ্রহ। লাইভ সায়েন্স থেকে জানা যায়, তিনি গানিসনস প্রজাতির প্রেইরি ডগদের ভাষা নিয়ে গবেষণায় প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় দিয়েছেন। মজার বিষয় হলো, একটা প্রেইরি ডগ যখন কোনো শিকারি দেখতে পায়, তখন তীক্ষ একটা শব্দ করে বাকিদের সতর্ক করে নিজেও লুকিয়ে পড়ে। তোমার-আমার কানে ওদের ডাক একই রকম মনে হলেও বিশেষজ্ঞদের কানে ডাকগুলোর ভিন্নতা স্পষ্ট ধরা পড়ে। স্লোবডচিকফ প্রেইরি ডগদের সতর্কবার্তা এবং লুকানোর ভঙ্গি রেকর্ড করেন। মজার বিষয়, স্লোবডচিকফ তাঁর গবেষণার স্বার্থে প্রেইরি ডগদের সঙ্গে রাখাল বালকের ‘বাঘ এলো রে’ খেলায় মেতে ওঠেন। প্রকৃতপক্ষে কোনো শিকারি না থাকলেও রেকর্ড করা সতর্কবার্তা বাজিয়ে ওই গবেষক দেখেন যে একেক ধরনের বার্তায় প্রেইরি ডগরা একেক রকম প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারেন যে প্রেইরি ডগরা নির্দিষ্ট শিকারির জন্য নির্দিষ্ট সতর্কতা সংকেত ব্যবহার করে। আরো চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, প্রেইরি ডগরা মোটা মানুষ দেখলে যেভাবে ডেকে ওঠে, চিকন মানুষ দেখলে সেভাবে ডাকে না।

 

আরো যত কথা বলা প্রাণী

এলেক্স নামের একটি আফ্রিকান তোতা প্রায় ১৫০টি ইংরেজি শব্দ বলতে পারত। পাখিটি বিভিন্ন রং ও আকৃতির মধ্যে পার্থক্য বের করে তা প্রকাশও করতে পারত। বিভিন্ন ওয়েবসাইটের খবরে জানা যায়, মারা যাওয়ার সময় মনিবের প্রতি পাখিটির শেষ কথা ছিল—‘ভালো থেকো, কাল দেখা হবে। ভালোবাসি তোমায়।’

ব্রিটানিয়া ডটকম থেকে জানা যায়, সারা নামের একটি শিম্পাঞ্জিকে প্লাস্টিক টোকেন দিয়ে শব্দ শেখানো হয়। অনেকটা লেক্সিগ্রাম চিহ্নের মতোই। শেখার পর সারা অনেকগুলো প্রয়োজনীয় বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের ব্যবহার শেখে। কাঞ্জি নামের একটি পিগমি শিম্পাঞ্জিও লানার মতো কি-বোর্ড ব্যবহার করে ভাব প্রকাশ করতে জানত। কারো মতে, কাঞ্জির ভাব প্রকাশের গভীরতা লানার চেয়ে বেশি ছিল।



মন্তব্য