kalerkantho


ধারাবাহিক উপন্যাস

বান্দরবানের জঙ্গলে

মোস্তফা কামাল

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



বান্দরবানের জঙ্গলে

অঙ্কন : মানব

চার.

বান্দরবানের জেলা সদরের অদূরে বিশাল পাহাড়। পাহাড়জুড়ে জঙ্গল আর জঙ্গল। বড় গাছগুলো যেন আকাশ ছুঁই ছুঁই করছে। সাদাকালো মেঘমালা যেন গাছগুলোর সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে। দারুণ দৃশ্য; কিন্তু মনের মধ্যে শঙ্কা। এই বুঝি কোনো বন্য প্রাণী হামলে পড়ে। কোথাও খচখচানির শব্দ পেলেও হরিণের মতো থমকে দাঁড়ায় ওরা। অপু সবার সামনে।

বনের ভেতরে অনেকটা পথ এগিয়ে যাওয়ার পর হঠাত্ অপু থমকে দাঁড়াল। রাজন ওর পাশেই ছিল। সে বিস্ময়ের সঙ্গে বলল, কী রে! কোনো সমস্যা?

অপু বলল, ওই দেখ, কুচকুচে কালো বিশাল একটা সাপ!

ওরে বাবা! এত বড় সাপ!

রনি বলল, মারব নাকি সাপটাকে?

মুহিত বলল, কেন? তোর কোনো ক্ষতি করেছে?

না।

তাহলে কেন মারবি? ও দেখবি এমনিতেই চলে যাবে।

রুবেল বলল, যদি আমাদের দিকে তেড়ে আসে?

অপু বলল, না না। আসবে না।

ওরা সবাই স্থির দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর দেখল, সাপটা অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। ওরা আবার হাঁটতে শুরু করল। কিছু দূর যাওয়ার পর ওরা দেখে, দুটি খেঁকশিয়াল আর মেছোবাঘ মারামারি করছে। শিয়াল মেছোবাঘকে ধরার চেষ্টা করছে। আর মেছোবাঘটি ঝেড়ে দৌড়াচ্ছে। সে এক দেখার মতো দৃশ্য। ওরা দাঁড়িয়ে গেল। কী করবে ঠিক বুঝতে পারছিল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই উধাও হয়ে গেল শিয়াল আর মেছোবাঘ। ওরা আবার সামনের দিকে আগাতে থাকল। হঠাত্ উঁচু গাছের ডাল থেকে ধপাস করে পড়ল কয়েকটা বানর। তারপর দুটি বানর লাফ দিয়ে দুজনের কাঁধের ওপর গিয়ে বসল। ওরা তো ভয়ে অস্থির! পাঁচজনই একেবারে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওরা যতই ভয় পাচ্ছে, বানরগুলো ততই ওদের পেয়ে বসছে। ওদের সঙ্গে দুষ্টুমি করছে। কোনোটি ব্যাগ ধরে টানাটানি করছে। কোনোটি দৌড়ে গাছের মগডালে বসে মরা ডাল ভেঙে ভেঙে ওদের দিকে ছুড়ে মারছে। স্রেফ ভয় দেখানোর জন্য বানরগুলো এসব করছে। কিছুক্ষণ পর বানরগুলোও গাছে উঠে নিজেদের মধ্যে খেলতে শুরু করে। 

অপু তখন আবার ওদের নিয়ে সামনের দিকে আগায়। কিছু দূর যাওয়ার পর মুহিত বলে, অপু দাঁড়া।

অপু দাঁড়িয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে রাজন, রুবেল ও রনি দাঁড়ায়। তারপর ওরা একসঙ্গে বলে, আমরা এসে গেছি!

অপু ইতিবাচক মাথা নাড়ে। তারপর বলে, ওই যে, সামনের দিকে তাকিয়ে দেখ। দেখতে পাচ্ছিস? বিশাল একটা সুড়ঙ্গ! রাজন, মুহিত, রুবেল, রনি সবাই দেখ!

মুহিত বলল, ও মাই গড! এই জঙ্গলে এত বড় সুড়ঙ্গ!

অপু বলল, হুম। চল সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকি।

সবাই কিছু একটা ভাবল; কিন্তু কেউ দ্বিমত করল না। অপুর সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। কিছুটা পথ যাওয়ার পর অপু বলল, তোদের কারো কাছে টর্চ আছে?

রাজন বলল, টর্চ থাকবে কোত্থেকে? মোবাইল আছে।

মুহিত বলল, আমার কাছেও মোবাইল আছে।

অপু কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে বলল, রুবেল, রনি তোদের কাছে আছে?

ওরা দুজনেই না সূচক জবাব দিল। অপু বলল, ওকে। আর লাগবে না। রাজন, তোর মোবাইলটা দে।

রাজন ওর মোবাইলটা অপুর হাতে দিল। অপু সবার সামনে আর মুহিত থাকল পেছনে। ওরা মোবাইলের লাইট অন করে সুড়ঙ্গের ভেতরের দিকে যেতে লাগল। উঁচু-নিচু পথে হাঁটতে গিয়ে ওরা পড়ে যাচ্ছিল। একজন আরেকজনের হাত ধরে এগোতে থাকে। যেন নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশায় ওরা ছুটে চলেছে। ওরা যতই ভেতরে ঢুকছে, ততই যেন গাঢ় হচ্ছে অন্ধকার।

অপু সবাইকে সাবধান করল। নিজেও সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলছে। মনের মধ্যে ভয়। তার পরও সাহস হারায়নি সে। অপু রনিকে ডেকে বলল, রনি, তোর মোবাইলটা আমার হাতে দে তো!

রনি অপুর হাতে মোবাইলটা দিল। তারপর অপু সবার সামনে এগিয়ে গিয়ে বলল, তোরা আমার সঙ্গে আয়। পুরো ঘরটা ভালো করে দেখতে হবে। অপু মোবাইলটা মাথার ওপর উঁচু করে ঘরের ভেতরের দিকে ধরল। ঘরটা মনে হচ্ছে পিতলের তৈরি। ছোট্ট একটা দরজা। দরজায় ছোট একটা তালা ঝুলছে। দেখে মনে হয়, কেউ সার্বক্ষণিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখছে ঘরটি। চারদিকে ঘুরে ঘুরে ওরা দেখে। ভেতরে ঢোকার কোনো উপায় আছে কি না তা-ও বোঝার চেষ্টা করে। অপু রাজনকে বলে, রাজন, বুদ্ধি দে তো!

কোন ব্যাপারে?

ঢুকব কী করে?

রুবেল বলল, অপু, আমি বলি?

বল।

দরজাটা ভেঙে ফেলি।

সেটা তো আমিও বুঝতে পারছি; কিন্তু ঘরের মধ্যে কী আছে তা তো বুঝতে পারছি না।

তা দেখার জন্যই তো তালা ভাঙতে হবে।

হঠাত্ মুহিত চিত্কার দিয়ে উঠল। সে উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, অপু, অপু! এই দেখ! ঘরে একটা জানালাও আছে!

তাই নাকি? অপু বলল।

এই দেখ না! তুই মোবাইলের টর্চ দিয়ে ঘরের ভেতরে আলো দে। দেখ, কিছু দেখা যায় কি না।

দেখি দেখি!

অপু ঘরের ভেতরে টর্চ মারল। কিছু একটা দেখতে পাচ্ছে সে। সে-ও উত্তেজিত কণ্ঠে বলে, এই রাজন, মুহিত! তোরা দেখ! কিছু একটা আছে মনে হচ্ছে!

রাজন এগিয়ে গেল জানালার পাশে। সে-ও ঘরের ভেতরে মোবাইলের টর্চের আলো ফেলল।

অপু বলল, কিছু দেখতে পাচ্ছিস?

হুম, পাচ্ছি।

কী দেখতে পাচ্ছিস?

আমার মনে হয় স্বর্ণালংকার।

তাই! সত্যি বলছিস!

মুহিত বলল, আমার মনে হয়, স্বর্ণের বারজাতীয় কিছু হবে।

কই দেখি তো! জনি বলল।

মুহিত বলল, দেখ, ভালো করে দেখ।

অপু মোবাইলটা দে তো!

অপু রনির হাতে মোবাইলটা দিল। জনিও ঘরের ভেতরে টর্চটা ধরে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

অপু বলল, কী রে, কী দেখছিস?

আমি তো দেখছি বড় পিতলের একটা বল। তার ভেতরে কিছু একটা রাখা। সোনার বারের মতোই মনে হয়।

সত্যি? অপু জানতে চাইল।

আমার তো তা-ই মনে হয়।

অপু বলল, তাহলে তো ভেতরে ঢুকতে হয়। রাজন, তুই কী বলিস?

রাজন ইতিবাচক সায় দিয়ে বলল, কিন্তু কিভাবে ঢুকব।

তালাটা ভেঙে ফেলি। অপু বলল।

মুহিত, রনি এবং রুবেলও সায় দিল।

রাজন বলল, ভাঙার উপায় কী? পাথরটাথর থাকলে ভালো হতো।

অপু বলল, এই সুড়ঙ্গের ভেতরে পাথর পাওয়া যাবে না?

খুঁজলে হয়তো পাওয়া যাবে। রাজন বলল।

ওরা সবাই পাথর খোঁজার জন্য মোবাইল দুটি নিচের দিকে ধরল। আর ওমনি বাঘের গর্জনের মতো চারদিক থেকে বিকট শব্দ ভেসে এলো। ক্রমেই সেই শব্দ বাড়তে লাগল। মনে হচ্ছে, ওদের দিকে তেড়ে আসছে বাঘ! ভয়ে ওরা সবাই ঝেড়ে দৌড় শুরু করল।

(চলবে)



মন্তব্য