kalerkantho


রহস্য গল্প

অ্যাপয়েন্টমেন্ট

মাহবুবুর রহমান শিশির

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



অ্যাপয়েন্টমেন্ট

অঙ্কন : মাসুম

জেলারের রুমে ঢুকে তাঁকে সালাম জানাল বিল্লা।    

‘বিল্লা’ বললেন, জেলার। ‘মনে হচ্ছে এ সপ্তায় প্যারোলে যাবার জন্য তুমি একেবারে পাগলপারা হয়ে উঠেছ!’

‘জি স্যার, ঠিকই ধরেছেন।’

‘শুনলাম বাইরে কার সঙ্গে নাকি অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে তোমার?’ জেলার জানতে চাইলেন। 

‘জি, স্যার।’

‘একটু স্পষ্ট করে বলবে, কী ধরনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট?’

‘আহামরি কিছু না। নেহাতই ব্যক্তিগত।’ 

‘আমি জানি বাইরে বেরিয়ে কী করতে চাও তুমি’ জেলার বললেন। কণ্ঠে বিদ্বেষ চাপা রইল না। টেলিফোনের দিকে এগিয়ে গেলেন। 

‘কোনো প্যারোল-ফ্যারোল হবে না আজ। আগামী ২০ বছরেও না। কথাটা ভালো করে মগজে গেঁথে রাখো।’

‘এর মধ্যেই গেঁথে ফেলেছি স্যার,’ বিল্লা বলল। ‘জানেনই তো ভেতরে যখন আছি, বাইরের খুব সামান্যই কানে ঢোকে।’ 

‘ওই চেয়ারটায় বসো’ চাঁছাছোলা সুর জেলারের কণ্ঠে।

রাত ৯টা বাজে। জানালা গলে একটুকরো চাঁদের কোমল আলো ভেতরে এসে মায়া ছড়াচ্ছে ঘরটায়। দুর্বল হাসি ফুটল বিল্লার মুখে, পরক্ষণেই কুঁচকে উঠল। ঠিক ৯টায়ই তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট। চেয়ারের হাতলটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল সে। ভাবে-সাবে মনে হলো—প্রার্থনা ধরেছে। আর এর পর পরই জেলার খেয়াল করলেন, বিল্লা ঝুঁকে তার কপালটা হাতের ওপর ঠেকাল।      

অবশেষে ফোনে কাঙ্ক্ষিত সংযোগটা পেলেন জেলার।

‘ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি লাইনে, স্যার,’ অপারেটর জানাল। 

শত মাইল দূর থেকে বন্ধুর গলা ভেসে এলো। ‘হ্যালো।’ 

‘হ্যালো, মারুফ,’ জেলার বললেন। ‘এমদাদ বলছি।’  

ও প্রান্তের কণ্ঠ নার্ভাস। জানতে চাইল, ‘কিছু করতে পারলে?’ 

‘তোমার বিয়ের ব্যাপারে তো?’ 

‘হ্যাঁ, ও কী প্যারোল পেয়েছে?’ 

‘দেখ, বোর্ড কিন্তু সম্মতি দিয়েছে। ওর সদাচরণ দেখে। তবে সামলাব আমিই, তাই না?  ছোটখাটো কিছু নিয়মকানুন আছে, হেহ হে।’   

‘তাহলে তো ভালোই। কিন্তু এমদাদ, মন যে কুডাক দিচ্ছে। শুধু মনে হচ্ছে এদিকেই ধেয়ে আসছে সে। আমাকে একটা চিঠিও দিয়েছে, জানো?’

‘চিঠি? তোমাকে? কই, জানি না তো! অন্তত বিল্লা নিজে জানায়নি।’    

‘লিখেছে সময়মতোই অ্যাপয়েন্টমেন্ট রক্ষা করবে। তবে সে নাকি রিনার কাছে না গিয়ে সরাসরি আমার কাছে আসবে। আমার মাথায় আদৌ ঢোকে না। এমদাদ, এই লোকের মধ্যে আহামরি কী দেখেছে রিনা? আমরা যদি তাকে সেদিন না রুখতাম, মেয়েটা ওকেই বিয়ে করে ফেলত, আমাকে না। এমদাদ, আমার ভয় করছে। সে কসম কেটে বলেছে জেল কিংবা নরক কিছুই তাকে আটকে রাখতে পারবে না। আজ রাত ৯টায় পাঁচ বছর পুরো হবে। আর এখন ঠিক ৯টাই বাজে। ওই যে বললাম, খালি মনে হচ্ছে ফিরে আসছে সে...।’

‘বেকুবের মতো কথা বোলো না তো বন্ধু! আমি জানি না সে কিভাবে তোমাকে চিঠি দিতে পারল। তার মানে এই নয় যে হারামজাদা আমার কবজা থেকে বেরুতে পারবে। এই তো, এখনো আমার সামনে বসে আছে। ১০ ফুটও হবে না মাঝের দূরত্ব।’

‘এমদাদ!’ ভয়ানক আর্তনাদ উঠল ও প্রান্তে। ‘এমদাদ! কী বললে? ১০ ফুটও হবে না মানে!’

‘কেন, বিল্লার কথা বলছি, অবশ্যই সে...’ কানের পাশে যেন বোমা খেয়ে থেমে গেলেন জেলার।  

‘এমদাদ! বিল্লা...।’   

অক্ করে শব্দ হলো হঠাত্। যেন কেউ চেপে ধরেছে মি. মারুফের গলা।

জেলার বলে চলছেন, ‘বিল্লা আমার সামনেই মারুফ। একদম ভেড়ার মতো বসে আছে। ওর ওপর শক্ত নজর রাখি আমরা। এমন কী যখন ঘুমোয়, তখনো।

‘হ্যালো! হ্যালো! হ্যালো, মারুফ, শুনতে পাচ্ছ? হ্যালো, মারুফ! হ্যালো! হ্যালো!’ 

অপর প্রান্তে নীরবতা। অকস্মাত্ কার যেন গভীর শ্বাস ফেলার শব্দ। কেউ একজন সজোরে ছুড়ে ফেলে দিল টেলিফোন সেটটা। তীক্ষ একটা চিত্কার। এরপর আবার নেমে এলো জমাট নিস্তব্ধতা।

পাগলের মতো রিসিভারের হুক ধরে টানাটানি করছেন জেলার। অপরিচিত একটা গলা কানে এলো তাঁর। ফোঁপাচ্ছে। 

‘হ্যালো!’ জেলার চিত্কার করে উঠলেন। ‘জেলার এমদাদ বলছি। মারুফ...মি. মারুফ আহমেদের কী হয়েছে?’  

অনেকক্ষণ পর কেউ একজন উত্তর দিল, ‘ঠিক বলতে পারছি না, স্যার। উনি পড়ে আছেন। মনে হচ্ছে বেঁচে নেই। কেউ বোধ হয় তাঁর গলা টিপে ধরেছিল...আশপাশে কাউকে দেখছিও না।’

জেলার ঘরের নাক বরাবর তাকালেন। প্রাণহীন বিল্লার নিঃসার হাতের মুঠোয় তখনো শক্ত করে ধরা ছোট্ট কাচের শিশিটা। গায়ে আঠায় সাঁটা সাদা কাগজের লেবেল। তাতে লেখা— ‘বিষ’।

কে জানে কোন ফাঁকে জেলখানার হাসপাতাল থেকে ওটা চুরি করেছিল সে!

  (বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে)



মন্তব্য