kalerkantho

অতিপ্রাকৃত গল্প

কুবাস

নাসরীন মুস্তাফা

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



কুবাস

অঙ্কন : ধ্রুব নীল

মিটিংয়ের মাঝখানে, সবার সামনে, টেবিল ভাসিয়েই বমি করে দেয় আলমগীর।

মহাপরিচালক ত্রৈমাসিক কর্মপরিকল্পনার তিনটি ধাপ শেষ করেছেন। আর তখনই ঘটে গেল ঘটনা। আলমগীর ছুট দেয় ওয়াশরুমের দিকে। অনেক অনেক বমি করার পর খুব ক্লান্ত ভঙ্গিতে ঘেমে শ্বাস নিতে থাকে। চারিদিকে বমির গন্ধ টের পাচ্ছে। তা পাক। একটু আগে নাকে যে গন্ধ পেয়েছিল, তা সহ্য করা যায় না।

অফিস থেকে আধা বেলা ছুটি মিলে গেল। বেরিয়ে আসার সময় জেনারেল সার্ভিস বিভাগের মোহিত ভাইয়ের কাছে না গিয়ে পারল না। অফিসের গাড়ি, কার কী লাগবে, পুরো অফিস কিভাবে সাফ-সুতরো রাখতে হবে—এসব দেখভাল করে মোহিত। খুব নিচু স্বরে মোহিত ভাইকে বলল, বাজে গন্ধ লেগেছিল। বমি এসে যাওয়ার মতো বাজে গন্ধ।

যেকোনো মিটিংয়ের আগেই রুমটা আরেকবার ঝাড়পোছ করিয়ে সুগন্ধি এয়ারফ্রেশনার ছিটানোর নিয়ম আছে। মহাপরিচালক যদি মিটিংয়ে থাকেন, তবে নেওয়া হয় বাড়তি সতর্কতা। আজ সকালেও সে রকমটি করা হয়েছিল। মোহিত নাকি নিজে গিয়ে যাচাই করেছেন। লেমন সুবাসের ফ্রেশনারের গন্ধ উড়ছিল ডানা মেলে দেওয়া গাঙচিলের মতো। মোহিত ভাই আলমগীরের পিঠ চাপড়ে বলে, মিয়া তুমি ফাইজলামি করো? ওই সুবাস নিশ্চয়ই তোমার মোজা থেকে এসেছিল।

না, ভাই। ওটা মোজার না। অন্য কিছু।

অন্য কিছুটা কী?

জানি না। খুব বাজে।

মোহিত আবারও চাপড় মেরে গম্ভীর হয়ে বলল, রাতে ঘুম হয়নি নিশ্চয়ই। যাও, বাসায় গিয়ে ঘুমাও। ঘুমের ওপর ওষুধ নাই।

কথা সত্য। কিন্তু আলমগীর গাঢ় ঘুমের ভেতর আবার সেই গন্ধটা পেয়ে ছটফট করে জেগে উঠল। অবচেতন মন ওকে ছুটিয়ে নিয়ে গেল বেসিনের কাছে। ততক্ষণে বমি শুরু করেছে বলে মেঝে ভেসে গেল খানিক। তারপর বেসিন। কল ছেড়ে দিয়ে ও মাত্র ওয়াক ওয়াক করতে থাকল।

এভাবেই শুরু। আলমগীর যে সব সময় গন্ধটা পাচ্ছে, তা নয়। হঠাত্ ঘনিয়ে আসে, হালকা থেকে তীব্র হতে থাকে। নাক চেপে ধরে দেখেছে, গন্ধটা নাক ছাড়াই কেমন করে যেন মাথার ভেতর ঢুকে যায়। তারপর ছড়িয়ে পড়ে মাথার ভেতরেই। বমি করে ও আসলে মাথার ভেতর থেকে গন্ধটা টেনে বের করতে চায়। সেটা হয় না। পেট খালি হয় শুধু। গন্ধটা নিজে থেকেই একসময় ছেড়ে দেয় ওকে, হালকা হতে হতে মিলিয়ে যায়। তারপর চলে যায়। আলমগীর তখন কাঁদে।

সব শুনে আলমগীরকে নামকরা এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল মোহিত। বদহজম তো বটেই, গ্যাস্ট্রিক-আলসারের ভালো চিকিত্সক বলে খুব সুনাম নাকি তাঁর। সহজে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায় না। মোহিত ভাইয়ের বড় বোনের ভাশুর বলে বিনা অ্যাপয়েন্টমেন্টেই যাওয়া গেল।

এই ডাক্তার ওকে পাঠাল নাক-কান-গলার ডাক্তারের কাছে। নাকে সমস্যা আছে কি না দেখা হলো। কোনো সমস্যা নেই। অনেক সময় মাথায় টিউমার হলে নাকি রোগী এমন গন্ধ পায়, যা আদতে নেই, এমন তথ্য জানিয়ে এই ডাক্তার রেফার করলেন মাথার ডাক্তারের কাছে। মাথা ব্যথা হয়? আর সব মানুষের মতো আলমগীরেরও মাঝে মাঝে মাথা ব্যথা হয়। তবে গন্ধটা এমনিই পায়, তখন মাথা ব্যথা হয় না।

মাথার ডাক্তার বলছিলেন, ফ্যান্টোসমিয়া নামে একটি সমস্যা আছে, যাতে মস্তিষ্ক ধারণা করায়, একটা গন্ধ পাচ্ছ তুমি। এই গন্ধের নাম ফ্যান্টম গন্ধ। যার পাওয়ার কথা, শুধু সে-ই পায়, সঙ্গে থাকা আর কেউ পায় না। অথচ এই গন্ধ যে পাচ্ছে, তার ধারে-কাছে নেই গন্ধের উত্স।

আলমগীরের পুরো মাথা স্ক্যান করেও কিছুই পাওয়া গেল না। এরপর পুরো শরীরও স্ক্যান করা হলো। কোথাও কোনো সমস্যা নেই। থাইরয়েড ক্যান্সারের রোগী নাকি সিগারেটের গন্ধ পায়। আলমগীরের থাইরয়েড ক্যান্সার আছে কি না, সেটাও খুঁজে দেখা হলো। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী রক্তে শর্করা বেড়ে গেলে নাকি পোড়া গন্ধ পায়। আলমগীরের রক্তে শর্করার পরিমাণও স্বাভাবিক।

এলোপ্যাথিতে কাজ হবে না বুঝে মোহিত ভাই ওকে হোমিওপ্যাথির ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। রিসিপশনিস্ট রীতার পরামর্শে কবিরাজিও বাদ যায়নি। নাহ, গন্ধটা রেহাই দেয়নি ওকে। শুকিয়ে হাড্ডি হয়ে যাওয়া আলমগীরের চোখ ঢুকে গেছে গর্তের ভেতর। চোখের নিচে কালি, চোয়াল তোবড়ানো। ওজন কমতে কমতে ও বোধ হয় একদিন হাত থেকে ছুটে যাওয়া বেলুনের মতো উড়ে যাবে আকাশে। উড়ে যাওয়ার আগে বাড়িতে খবর দেওয়া উচিত। মা মরে যাওয়ার পর বাপটা আবার বিয়ে করেছিল আলমগীরের দেখভাল করার যুক্তি দেখিয়ে। তবে সেই মা আলমগীরকে যে দেখভাল করত, তার যন্ত্রণায় আলমগীরকে বাধ্য হয়ে এতিমখানায় যেতে হয়। যেভাবেই হোক, বড় হয়েছে। একা জীবনে ভালোই ছিল। চাকরি পেয়ে ভাবছিল, বিয়ে করবে। সেই গানটাও শিখেছিল। বসন্ত বাতাসে সই গো, বসন্ত বাতাসে; বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে, সই গো!

ফুলের গন্ধ মানে ভালো গন্ধ। সুবাস। বাজে গন্ধটা তবে কুবাস। সেটার বর্ণনা দিতে গিয়ে ও কোনো কিছু নির্দিষ্ট করে বলতে পারে না। কখনো মনে হয়, পচা কমলার সঙ্গে বাসি-পচা কাঁচা মাংস, কখনো বিষ্ঠা আর ভিনেগার মেশানো গন্ধ। অচেনা গন্ধটাকে চেনার জন্য ও নানা গন্ধের কাছে যায়। ডাস্টবিনের ময়লা ঘাঁটে। ড্রেনের পচা পানির কাছে নেয় নাক। মাছ বাজারে পচা মাছের গন্ধ শুঁকতে গিয়েছিল। ওর কাণ্ড দেখে মাছওয়ালারা মাছের পানি ছুড়ে মেরেছিল গায়ে। একজন তো বলেই বসলো, পচা বাস ভাল্লাগলে মইরা ভূত হইয়া যাওয়া মড়ার কাছে যা ব্যাটা!

আলমগীর তা-ই করল। মোহিত ভাইয়ের বড় বোনের ভাশুরের প্রভাব খাটিয়ে হাসপাতালের মর্গে নেন। সঙ্গে ছিল আলমগীরের বাবা হানিফ মিয়া। ছেলের খবর শুনে ব্যবসাপাতি ছেড়ে আসা মানুষটার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে। লাভ খুব ভালো বোঝেন তিনি। লোকসানের ভেতর কখনো ছিলেন না। আজই বা কেন থাকবেন?

মর্গের দরজাটা বন্ধ। সেই বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়ানো আলমগীরের মাথার ভেতর কে যেন বলে ওঠে, এখানেই আছে কুবাসটা। মৃত্যুর গন্ধ। শরীরে পচন ধরার খানিক আগে যে গন্ধটা আঁকড়ে ধরে মরা মানুষের স্থির শরীরটাকে, আলমগীরের মাথার ভেতর সেই গন্ধটাই।

গন্ধটা চিনতে পেরেই আলমগীর টের পায়, মাথার ভেতরে শুরু হয়েছে পুরনো দিনের এক সাদা-কালো চলচ্চিত্র। মাটিতে পড়ে থাকা এক নারীর নিথর দেহের পাশে বসে থাকা এক শিশু, কেবল বসতে শেখা সেই শিশু তারস্বরে কাঁদতে কাঁদতে তাকায় আলমগীরের চোখের দিকে। স্পষ্ট বুঝতে পারছে আলমগীর, শিশুটি তিন দিন এভাবেই কাঁদছে। খিদের কষ্টে কাঁদছে। মা কেন ওকে কাছে টেনে নিচ্ছে না, সেই কষ্টে কাঁদছে। আলমগীর চোখ ফেটে বের হওয়া পানিতে হাহাকার মিশিয়ে নিজেকেই ধমকায়, মায়ের মরে যাওয়া শরীরের গন্ধ এভাবে ভুলে যায় কেউ?

ও ভুলে গেলেও মস্তিষ্কের স্মৃতিকোষের কোনো এক কোনায় ঠিকই লুকিয়ে ছিল গন্ধটা। ঠিকই ফিরে এসেছে পাজল মেলানোর দায়িত্ব নিয়ে।

ভাষা শেখার আগে অন্য মানুষের চোখের দৃষ্টি পড়তে শেখে শিশুরা। ওই শিশুটিও মায়ের চোখ চিনেছিল, চিনেছিল আরেকজন মানুষের চোখ। আলমগীর সেই মানুষটির চোখে চোখ রেখে পাজল মিলিয়ে নেয়। তখনই হানিফ মিয়াকে ছেঁকে ধরে অতিপ্রাকৃত ভয়। তীব্র ভয়। কোনো মতে সে বলতে চেয়েছিল, তর মার শ্বাসের দোষ ছিল। তাই মরছে।

পারা গেল না। হানিফ মিয়ার মগজও ভরে গেছে কুবাসে। শরীরের ডিফেন্স মেকানিজম তাকে বমি করতে ব্যস্ত রাখায় তার আর কিছু বলা হয়ে ওঠে না। সব কথা হয়ে যায় ওয়াক্ ওয়াক্!

আলমগীরের কিন্তু খুব মজা লাগছিল। কুবাস কেমন ওয়াক্ করায়, তা কি ওর জানা নেই?



মন্তব্য