kalerkantho


রক্তের ক্যান্সার

ডা. মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ব্লাড ক্যান্সার বা রক্তের ক্যান্সার নির্দিষ্ট একটি রোগ নয়। কয়েক ধরনের রক্তের অসুখ সম্মিলিতভাবে রক্তের ক্যান্সার নামে পরিচিত।

এ ধরনের রক্তের অসুখের মধ্যে আছে লিউকেমিয়া, অ্যাপ্লাস্টিক এনিমিয়া, মায়েলোডিস প্লাস্টিক সিনড্রোম, লিম্ফোমা, মায়োলোমা ইত্যাদি।

লিউকেমিয়া : সবচেয়ে বেশি হয় রক্তের এই ক্যান্সারটি। লিউকেমিয়ার নিজের আবার কয়েকটি আলাদা ধরন আছে। এগুলো হচ্ছে—অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া, অ্যাকিউট মায়েলয়েড লিউকেমিয়া, ক্রনিক লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া, ক্রনিক মায়েলয়েড লিউকেমিয়া। সবগুলোর সম্মিলিত নাম লিউকেমিয়া। এই ক্যান্সার শুরু হয় বোনম্যারো বা অস্থিমজ্জায়। এতে অস্থিমজ্জায় রক্তের শ্বেতকণিকা অস্বাভাবিক হয়। সংখ্যায়ও উৎপন্ন হয় বেশি। এগুলো সাধারণ সুস্থ শ্বেতকণিকার মতো কাজ করে না।

এরা দ্রুত বড় হতে থাকে। একটি পর্যায়ে গিয়ে এই বৃদ্ধি থামার কথা থাকলেও তা থামে না। এ কণিকাগুলো অস্থিমজ্জায় অন্যান্য রক্তকণিকা তৈরিতে বাধা দেয়। চিকিৎসা নির্ভর করে কোন ধরনের লিউকেমিয়া এবং রোগটি কোন স্টেজে রয়েছে তার ওপর। সাধারণত কেমোথেরাপি প্রয়োগ করা হয়। এতে ক্ষতিকর ক্যান্সার কোষগুলো ধ্বংস হয়। অনেক সময় কেমোথেরাপির সঙ্গে রেডিয়েশন থেরাপি দেওয়া হয়। অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন বা বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট সার্জারি করা গেলে আরোগ্যের সম্ভাবনা বেশি থাকে।

অ্যাপ্লাস্টিক এনিমিয়া : সুস্থ অস্থিমজ্জায় একই সঙ্গে লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেতরক্তকণিকা, অনুচক্রিকা তৈরি হতে থাকে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। অ্যাপ্লাস্টিক এনিমিয়ায় এই অস্থিমজ্জা ফ্যাট বা চর্বি কোষ দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়ে যায়। রোগটি খুব বেশি হয়, তা নয়। যখন হয় তখন অস্থিমজ্জা আর যথেষ্ট সংখ্যক রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে সব ধরনের রক্তকণিকার সংখ্যাই কমে যায়। এ রোগটি কেন হয় তার যথাযথ কারণ এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে রোগটি যেকোনো বয়সে যে কারো হতে পারে। চিকিৎসার দুটি ভাগ আছে। একটিকে বলা হয় সাপোর্টিভ থেরাপি। এতে রোগটির কারণে শরীরে যেসব লক্ষণ প্রকাশ পায়, তার চিকিৎসা করা হয়। বাইরে থেকে নিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালন করতে হয়। ইনফেকশন প্রতিরোধের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ দীর্ঘদিন প্রয়োগ করতে হয়। অন্য চিকিৎসাটি হচ্ছে ডেফিনিটিভ ট্রিটমেন্ট। এতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে রাখা হয় বা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন সার্জারি করা হয়।

মায়েলোডিসপ্লাস্টিক সিনড্রোম : এটাও বোনম্যারো বা অস্থিমজ্জার সমস্যা। এখানেও অ্যাপ্লাস্টিক এনিমিয়ার মতো যথেষ্ট সংখ্যক রক্তকণিকা তৈরি হতে পারে না। আবার এমন কিছু কণিকা তৈরি হয়, যা সুস্থ নয়। এরা নিজ নিজ কাজও করতে পারে না। অনেক সময় রক্তকণিকাগুলোর অতিদ্রুত সংখ্যা বৃদ্ধিও ঘটে। এ রোগটি তুলনামূলকভাবে কম হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ রোগ পরবর্তী সময় লিউকেমিয়ায় রূপান্তরিত হয়। এ রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। সাধারণত লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। উন্নত দেশে স্টেম সেল প্রতিস্থাপন সার্জারি করা হয়।

লিম্ফোমা : শরীরে রক্তনালির মতো আরেকটি নালিতন্ত্র আছে, যা লসিকাতন্ত্র বা লিম্ফেটিক সিস্টেম নামে পরিচিত। এ তন্ত্র শরীরে রোগ প্রতিরোধ ও ইনফেকশন প্রতিরোধে কাজ করে। লিম্ফোমা হলে শরীরে অতিরিক্ত সংখ্যক লিম্ফোসাইট তৈরি হয়। লিম্ফোসাইটটি নিজেও এক ধরনের রক্ত কোষ। এগুলো রক্তে অতিরিক্ত সময়ের জন্য থাকে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় প্রভাব ফেলে। লিম্ফোমা শরীরের যেকোনো অংশে হতে পারে। সাধারণত লিম্ফ নোড, রক্ত, অস্থিমজ্জায় বেশি হয়। লিম্ফোমার প্রধান দুটি ধরন হচ্ছে নন-হজকিন লিম্ফোমা ও হজকিন লিম্ফোমা। চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের ধরন ও স্টেজের ওপর। কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি দেওয়া লাগতে পারে। অনেক সময় অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন সার্জারির মাধ্যমে ভালো ফল পাওয়া যায়।

মায়েলোমা : আরেকটি নাম মাল্টিপল মায়েলোমা। এ ক্যান্সারে রক্তের প্লাজমা কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্লাজমা কোষ রক্তেই থাকে। এর প্রধান কাজ রক্তে অ্যান্টিবডি তৈরির মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করা। মায়েলোমায় অতিরিক্ত প্লাজমা কোষ তৈরি হয়, যা সুস্থ নয়। এগুলো রোগ প্রতিরোধে কাজ করতে পারে না। এরা এত বেশি সংখ্যায় তৈরি হয় যে, রক্তে অন্যান্য কণিকার স্থান দখল করে ফেলে। এ কারণে অস্থিমজ্জা বা বোনম্যারো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসা করা হয় লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে। পাশাপাশি অতিরিক্ত সংখ্যক প্লাজমা কোষ যাতে তৈরি না হয়, সে জন্য কিছু ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। এ ছাড়া কেমোথেরাপিও দিতে হয়।

 

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল

 


মন্তব্য