kalerkantho


কৃমি

পুষ্টিহীনতার অন্যতম কারণ

শরীরেই বসবাস করে। আবার ক্ষতিও করে মানুষেরই। যেকোনো বয়সে এতে আক্রান্ত হতে পারে যে কেউ, তবে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত হলে বেশ কিছু লক্ষণ থাকে। রোগটি খুব হয়, আবার সচেতন থাকলে এর প্রতিরোধ ও চিকিৎসাও সহজ। লিখেছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. অমর বিশ্বাস

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পুষ্টিহীনতার অন্যতম কারণ

কৃমি বাংলাদেশে একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। এটি মানুষের শরীরে থাকা সবচেয়ে বড় পরজীবী।

যেকোনো বয়সের মানুষের কৃমি হতে পারে। তবে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয়। সারা পৃথিবীতেই শিশুদের পেটে বিভিন্ন ধরনের কৃমির প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশের বেশির ভাগ শিশু-কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে কৃমির প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যায়। গ্রামে বসবাসকারীদের বেশি হয়। শিশুদের বেশি হলেও একেবারে ছোট শিশু যেমন : পাঁচ-ছয় মাস বয়স পর্যন্ত, যখন সে শুধু মায়ের বুকের দুধই পান করে, তখন সাধারণত কৃমি হয় না।

কৃমি কিন্তু এক ধরনের নয়। মানুষ আক্রান্ত হয় বহু ধরনের কৃমি দিয়ে। বিভিন্ন প্রকার কৃমির মধ্যে কেঁচো বা লম্বা কৃমি (এসকারিস লুমব্রিকয়েডস), বক্র কৃমি বা হুক ওয়ার্ম, সুতা কৃমি, ট্রইচুরিস ট্রাইচুরা (টিটি), স্ট্রংগিলয়েড স্টারকোনালিস ও ফিতা কৃমির প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে বেশি।

ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার মতো সংস্পর্শে এলেই কৃমির সংক্রমণ ঘটে না। সাধারণত কৃমির সংক্রমণ হয় খাবার ও পানির মাধ্যমে। কৃমির ডিম কোনোভাবে মানুষের পেটে ঢুকলে সেই ডিম থেকে পেটের মধ্যেই কৃমি জন্ম নেয়। তবে সব কৃমির সংক্রমণ এভাবে হয় না।   যেমন—হুক ওয়ার্ম বা বক্র কৃমি। হুক ওয়ার্মের লার্ভা (ডিম থেকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত শিশু কৃমি) পায়ের চামড়া ভেদ করে রক্তনালিতে ঢোকে। সাধারণত যারা খালি পায়ে মাটির ওপর হাঁটে তারা এ কৃমিতে আক্রান্ত হয়। এ ধরনের লার্ভার দৈর্ঘ্য এক সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। লম্বা কৃমি বা এসকারিস লুমব্রিকয়েডসের প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে বেশি। এখানে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের ও শহরের শিশুদের মধ্যে যথাক্রমে ৯২ ও ২৮ শতাংশ এই কৃমি দিয়ে আক্রান্ত হয়। এই কৃমি পেটে থাকলে রোগীর পেটব্যথা, ক্ষুধামান্দ্য, পেটফাঁপা, অজীর্ণ, বমি, এমনকি ক্ষুদ্রান্ত্রকে বন্ধ করে দেওয়া, অন্ত্রনালিকে ছিদ্র করা, পিত্তনালিতে ঢুকে তা বন্ধ করে দিয়ে জন্ডিসের সৃষ্টি করার মতো মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। এটি মানুষের দেহে বাস করে এবং শরীর থেকে খাবার গ্রহণ করে বেঁচে থাকে ও বংশ বৃদ্ধি করে। দেশে কেঁচো কৃমি, বক্র কৃমি ও সুতা কৃমিতে আক্রান্তের ঘটনাও অনেক। এসব কৃমি সাধারণত মানুষের অন্ত্রে বসবাস করে।

 

কৃমির ধরন

কৃমি কয়েক ধরনের হয় : যেমন—

গোল কৃমি : এগুলো সাধারণত গোল, পাতলা, সাদা বা গোলাপি রঙের হয় এবং পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় ১০-১২ ইঞ্চি লম্বা হয়।

শিশুদের অপুষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ গোল কৃমির সংক্রমণ। এটি অপরিষ্কার খাবার ও পানির মাধ্যমে মানুষের মুখে ঢোকে। গোল কৃমিতে আক্রান্তে অস্বস্তিভাব, পেটফাঁপা, পেট ফুলে ওঠা, বদহজম, ক্ষুধামান্দ্য বা অরুচি, বমি বমি ভাব, ওজন কমে যাওয়া, পাতলা পায়খানা, আমমিশ্রিত মল, শুকনা কাশি, শ্বাস-প্রশ্বাসে দুর্গন্ধ, যকৃৎ প্রদাহ ইত্যাদি হতে পারে। কখনো কখনো পিত্তনালিতে গিয়ে নালি বন্ধ করে দেয়। ফলে জন্ডিস হয়। অগ্ন্যাশয় নালিতে গিয়ে নালি বন্ধ প্যানক্রিয়াটাইটিস, অ্যাপেন্ডিসে গিয়ে আটকে অ্যাপেন্ডিসাইটিসের সৃষ্টি করতে পারে।

সুতা কৃমি : এগুলো দেখতে সুতার মতো, ছোট, পাতলা ও সাদা রঙের হয়।

পৃথিবীর সব দেশেই সুতা কৃমির সংক্রমণ দেখা যায়। এরা সাধারণত মানুষের ক্ষুদ্রান্ত্রে অবস্থান করে কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হলে তা সেখান থেকে সরে গিয়ে বৃহদান্ত্রে আশ্রয় নেয়। তাই পূর্ণ আকৃতির সুতা কৃমি বৃহদন্ত্রের কোলনেই বেশি পাওয়া যায়। সাধারণত সুতা কৃমিতে আক্রান্ত হলে অপুষ্টি ও রক্তস্বল্পতা হতে পারে। কারো কারো খাবারে রুচি চলে যায়।

বক্র কৃমি : এগুলো আকারে খুবই ছোট, গাঢ় গোলাপি রঙের হয়। এত ছোট যে খালি চোখে দেখা যায় না। বক্র কৃমি ক্ষুদ্রান্ত্রে তার হুকের সাহায্যে রক্ত চোষে এবং রক্ত খেয়েই বেঁচে থাকে। বক্র কৃমির সংক্রমণের লক্ষণ প্রধানত রক্তক্ষয়জনিত দুর্বলতা হিসেবে প্রকাশ পায়। বুক ও পেটের ব্যথা, বমি, অনেকটা পেপটিক আলসার রোগের মতো মনে হয়। এ ছাড়া রক্তমিশ্রিত কাশি, প্রায়ই পাতলা পায়খানা, রক্তশূন্যতা, আমিষস্বল্পতা, এমনকি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। বক্র কৃমি পায়ের তালুর চামড়া ফুটো করে বলে, পায়ের তালুর ত্বকে সংক্রমণ

দেখা দেয় এবং তালুতে ছোট ছোট গর্তের সৃষ্টি হয়।

ফিতা কৃমি : এগুলো পূর্ণ বয়সে ২-৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয় বলে লম্বা কৃমি নামেও পরিচিত।

সাধারণত পেটে একটিমাত্র ফিতা কৃমি থাকে। তবে বেশিও থাকতে পারে। ফিতা কৃমি প্রাথমিকভাবে গরুর মাংসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ঢোকে। গরুর মাংস অসিদ্ধ বা অর্ধসিদ্ধ খেলে মানুষ সংক্রমিত হতে পারে। অন্ত্রে ফিতা কৃমি থাকলে তা মলের সঙ্গে বেরিয়ে আসতে পারে।

 

চিকিৎসা 

♦   সাধারণত শিশুদের এক বছর বয়স হওয়ার পরে কৃমির ওষুধ সেবন করানো উচিত।

♦   শিশুকে সেবনের পাশাপাশি বাড়ির সবাইকে কৃমিনাশক ওষুধ দিতে হবে।

♦   চিকিৎসকের পরামর্শ মতো বয়স অনুযায়ী আলাদা আলাদা মাত্রায় ওষুধ সেবন করতে হবে।

♦   কারো কারো কৃমির ওষুধ সেবন ঠিক নয়। যেমন—গর্ভবতী, জ্বর ও ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী।

♦   সাধারণত অ্যালবানডাজল গ্রুপের ওষুধ সেবন করতে হয়। তবে আরো কিছু ওষুধও আছে। কার জন্য কী ডোজ প্রযোজ্য, তা চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক করে নেওয়া উচিত।

 

প্রতিরোধ 

♦   জন্মের পর প্রথম ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো ছাড়া অন্য কিছু দেওয়া যাবে না। এ সময়ে অন্য কোনো খাবার বা পানীয়ের আদৌ প্রয়োজন নেই। ছয় মাস বয়স হলে মায়ের দুধের পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য খাবার স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে তৈরি করে খেতে দিতে হবে। তখন লক্ষ রাখতে হবে শিশুর খাবার যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে তৈরি হয়।

♦   পরিষ্কার ও নিরাপদ পানির ব্যবহার করতে হবে। পানের পানি তো বটেই—ধোয়ামোছা, রান্না ইত্যাদি কাজেও বিশুদ্ধ পানির

    ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে কখনোই দূষিত বা অসিদ্ধ পানি ব্যবহার করা যাবে না।

♦   পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে খাবার তৈরি ও পরিবেশনের আগে এবং খাবার গ্রহণের আগে ও মল ত্যাগের পর ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।

♦   স্যানিটারি ল্যাট্রিনের ব্যবহার করতে হবে।

♦   নিয়মিত গোসল করতে হবে। পরিষ্কার জামা-কাপড় পরা এবং নখ বড় হওয়ার আগে অবশ্যই কেটে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুদের নখও পরিষ্কার করতে হবে। নখ বড় হলে কেটে দিতে হবে।

♦   অর্ধসিদ্ধ মাংস খাওয়া যাবে না।

♦   খালি পায়ে হাঁটার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।

♦   প্রতি চার মাস পর পর পরিবারের সবাইকে বয়স অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাত্রার কৃমির ওষুধ সেবন করাতে হবে। বাড়ির একজনের কৃমি থাকলে সবারই সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে বাড়ির সবাইকে কৃমির ওষুধ সেবন করাতে হবে।


মন্তব্য