kalerkantho


চিকুনগুনিয়া

ডেঙ্গুর মতোই একটি জ্বর

ভাইরাসজনিত চিকুনগুনিয়া ডেঙ্গুর মতোই এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। লক্ষণও ডেঙ্গু জ্বরের মতোই। তবে এ জ্বর সারলেও বহু ক্ষেত্রে অস্থিসন্ধিতে ব্যথাসহ আরো কিছু উপসর্গ থেকে যেতে পারে কয়েক মাস পর্যন্ত। লিখেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন ও মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ

১৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ডেঙ্গুর মতোই একটি জ্বর

ইদানীং অনেক রোগী প্রায়ই অভিযোগ করছেন যে তাঁদের জ্বর হয়েছিল, কিন্তু জ্বর সেরে গেলেও শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, দুর্বলতা কাটছে না। অনেক সময় রোগীর যে জ্বর হয়, তার সঙ্গে ডেঙ্গুর লক্ষণ মিলে যায়।

রোগীরা মনে করে, ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে। কিন্তু ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগী সাধারণত পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যান, অথচ দেখা যাচ্ছে, এই জ্বর চলে গেলেও রোগী আরো দীর্ঘ দিন অসুস্থ ও দুর্বল বোধ করছে,  শরীরের বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে বিভিন্ন গিটে ব্যথা কিছুতেই যাচ্ছে না। আসলে ডেঙ্গু হিসেবে ধরে নেওয়া হলেও এ রোগটি সম্ভবত ডেঙ্গু জ্বর নয়; বরং অন্য একটি ভাইরাসজনিত জ্বর, যাকে বলে চিকুনগুনিয়া।  

চিকুনগুনিয়াও ভাইরাসজনিত অসুখ। এই রোগটি আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রোগ হলেও আমাদের দেশের কিছু কিছু এলাকায় এই রোগ দেখা যাচ্ছে। ডেঙ্গু জ্বরের সঙ্গে এর অনেক মিল রয়েছে। ডেঙ্গু জ্বরের মতোই চিকুনগুনিয়া ভাইরাসও এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়।

উপসর্গ

চিকুনগুনিয়ার মূল উপসর্গ হলো জ্বর ও অস্থিসন্ধির ব্যথা। জ্বর অনেকটা ডেঙ্গুর মতোই।

দেহের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়, প্রায়ই ১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যায়, তবে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা বা ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে না। জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, চোখ জ্বালা করা, গায়ে লাল লাল দানার মতো র‌্যাশ, অবসাদ, অনিদ্রা, বমি বমি ভাব ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথার সঙ্গে তা ফুলেও যেতে পারে। জ্বর সাধারণত দুই থেকে পাঁচ দিন থাকে এবং এরপর নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। তবে তীব্র অবসাদ, পেশিতে ব্যথা, অস্থিসন্ধির ব্যথা ইত্যাদি জ্বর চলে যাওয়ার পরও কয়েক সপ্তাহ থাকতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাসের পর মাসও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা বা প্রদাহ থাকতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রেই রোগীকে স্বাভাবিক কাজ করতে অক্ষম করে তোলে। রোগী ব্যথায় এতই কাতর হন যে হাঁটতে কষ্ট হয়, সামনে বেঁকে হাঁটে। স্থানীয়ভাবে কোথাও কোথাও তাই একে ‘ল্যাংড়া জ্বর’ বলা হয়।

দেখা গেছে, রোগীর বয়স যত বেশি তার ক্ষেত্রে রোগের তীব্রতাও তত বেশি হয় এবং উপসর্গগুলো, বিশেষ করে শরীর ব্যথাও তত বেশি দিন ধরে থাকে। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সাধারণত এত দীর্ঘ সময় ধরে শরীর ব্যথা বা অন্য লক্ষণগুলো থাকে না। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর মূল সমস্যা হলো শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্তক্ষরণ, যা অনেক সময় খুব ভয়াবহ হতে পারে। কিন্তু চিকুনগুনিয়া জ্বরে ডেঙ্গুর মতো রক্তক্ষরণ হয় না এবং রক্তের প্লাটিলেট সাধারণত খুব বেশি কমে না। এই রোগে আক্রান্ত হলে সাধারণত কেউ মারা যায় না, তবে দীর্ঘ দিনের জন্য অনেকেই স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে। ডেঙ্গুতে কয়েকবার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, কিন্তু চিকুনগুনিয়া একবার হলে সাধারণত আর হয় না। চিকুনগুনিয়া সন্দেহ হলে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে তা নিশ্চিত হওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে রোগীর রক্তে ভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি দেখা হয়। এটা হতে দুই থেকে ১২ দিন লাগতে পারে। রোগীর আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে শুধু শুধু এই পরীক্ষা করার কোনো দরকার নেই, কেননা এতে চিকিৎসার ক্ষেত্রে আলাদা কোনো লাভ হয় না।

চিকিৎসা

চিকুনগুনিয়া জ্বরের কোনো প্রতিষেধক নেই। এর চিকিৎসা মূলত রোগের উপসর্গগুলোকে নিরাময় করা। রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে এবং প্রচুর পানি বা অন্যান্য তরল খেতে দিতে হবে। জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধই যথেষ্ট। জ্বর বেশি হলে পানি দিয়ে শরীর মুছিয়ে দিতে হবে। তীব্র ব্যথার জন্য ঘঝঅওউ জাতীয় ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে, তবে এসপিরিন না দেওয়াই ভালো। ক্লোরোকুইন এই রোগের উপশম করে বলে কেউ কেউ দাবি করছেন। রোগীকে আবার যেন মশা না কামড়ায় সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ আক্রান্ত রোগীকে কামড় দিয়ে কোনো সুস্থ লোককে সেই মশা কামড় দিলে ওই ব্যক্তিও এই রোগে আক্রান্ত হবেন।

চিকুনগুনিয়ার জন্য কোনো ভ্যাক্সিন বা টিকাও নেই। তাই প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশা প্রতিরোধ। এডিস মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করা এবং মশা নির্মূল করা। বাসাবাড়ির আশপাশে যেখানে পানি জমে থাকতে পারে, তা সরিয়ে ফেলতে হবে অথবা নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। ডাবের খোসা, কোমল পানীয়ের ক্যান, ফুলের টবে যাতে পানি না জমে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। মজা পুকুর বা ডোবা পরিষ্কার করতে হবে। ডেঙ্গু জ্বরের বেলায় স্বচ্ছ, পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে, কিন্তু চিকুনগুনিয়ায় মশা নোংরা-অপরিষ্কার পানিতেও ডিম পাড়তে পারে। তাই পানি জমে থাকে—এমন সব জায়গাই পরিষ্কার রাখতে হবে। এ ছাড়া মসকুইটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে, যাতে মশা কাছে না আসতে পারে। বাইরে যাওয়ার সময় শরীর ভালোভাবে ঢেকে রাখতে হবে, যাতে মশা কামড়াতে না পারে। ঘরে ঘরে মশার ওষুধ দেওয়া, দরজা-জানালায় নেট লাগানো, রাতে মশারি ব্যবহার ইত্যাদিও চলবে। তবে জেনে রাখা ভালো, এডিস মশা মূলত দিনের বেলা ও ঘরের বাইরেই বেশি কামড়ায়।  

চিকুনগুনিয়ার হলেও এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। একটু সচেতন হলেই এ রোগ মোকাবিলা করা সম্ভব।


মন্তব্য