kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ধীরে ধীরে কিডনি বিকল!

কিডনি রোগ কোনো লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াই বছরের পর বছর থাকতে পারে এবং রোগীর অজান্তেই বিকল হয়ে যেতে পারে। লিখেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কিডনি রোগ বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ডা. মো. শহিদুল ইসলাম সেলিম

৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ধীরে ধীরে কিডনি বিকল!

কিডনির বা অন্য অঙ্গের কোনো রোগের কারণে কিডনি আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে যদি দুটো কিডনির কার্যকারিতাই নষ্ট করে দিতে থাকে—তখন তাকে ক্রনিক কিডনি ফেইলিওর বা দীর্ঘমেয়াদি কিডনি বিকল রোগ বলা হয়। একটি কিডনি সম্পূর্ণ সুস্থ থাকলে এবং অন্যটির কার্যকারিতা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেলেও কোনো লক্ষণ প্রকাশ বা অসুবিধা ছাড়াই সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব।

এমনকি দুটো কিডনির ৫০ শতাংশ বিনষ্ট হলেও শরীর সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকতে পারে। কেবল দুটো কিডনির ৫০ শতাংশের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিডনি বিকল হওয়ার প্রবণতা শুরু হয় এবং ৭৫ শতাংশ নষ্ট হলে শরীরে লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে থাকে, আর ৯৫ শতাংশের ওপর নষ্ট হলে (ডায়ালিসিস বা কিডনি সংযোজন) ছাড়া রোগীকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয় না, যাকে বলে এন্ড স্টেজ রেনাল ফেইলিওর।

কিডনি নষ্ট হওয়ার কারণ

►   গ্লোমেরুলো নেফ্রাইটিস বা কিডনির ছাঁকনি প্রদাহ রোগ (৫০-৫৫ শতাংশই এ কারণে)।

►   ডায়াবেটিসজনিত কিডনি রোগ (১৫-২০ শতাংশ)

►   উচ্চরক্তচাপজনিত কিডনি রোগ (১০-১৫ শতাংশ)

►   কিডনি বা প্রস্রাবের রাস্তায় পাথর ও অন্য কোনো রোগ (৭-১৯ শতাংশ)

►   কিডনি বা প্রস্রাবজনিত রোগ

►   বংশানুক্রমিক কিডনি রোগ

►   ওষুধজনিত কিডনি রোগ

►   অজানা কারণ ও অন্যান্য।

উপসর্গ

সাধারণত দুটো কিডনির ৭৫ শতাংশ কার্যকারিতা নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কিডনি বিকলের উপসর্গ দেখা যায় না। ৭৫ শতাংশের ওপর কিডনি অকেজো হয়ে গেলে রোগীর ক্ষুধামন্দা, আহারে অনীহা, বমি বমি ভাগ, বমি হওয়া, শরীর ক্রমান্বয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, শারীরিক দুর্বলতা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। এ ছাড়া প্রস্রাবের পরিমাণের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়, রাতে প্রস্রাব করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। কোনো রকম চর্মরোগের উপসর্গ ছাড়াই শরীর চুলকায়, অতিরিক্ত হেঁচকি ওঠে এবং অনেক ক্ষেত্রে খিঁচুনি হতে পারে। কিডনি বিকলে শেষ পর্যায়ে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট, অতি ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস হয়, ঝিমানো ভাব হয়, এমনকি রোগী জ্ঞানও হারিয়ে ফেলতে পারে।

অধিকাংশ রোগীর উচ্চরক্তচাপও ধরা পড়ে। এ ছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীর শরীরে পানি দেখা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে চামড়া শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। কিছু কিছু রোগীর হূদপিণ্ডের আবরণে পানি এবং হার্ট ফেইলিওরের চিহ্ন দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে হাত-পায়ের মাংসপেশি শুকিয়ে যায়, যার দরুন রোগী সাধারণত চলাফেরার শক্তি হারিয়ে ফেলে।

রোগ নির্ণয়

ক্রনিক রেনাল ফেইলিওর রোগ নির্ণয়ের জন্য রোগের ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা ছাড়াও প্রাথমিকভাবে রক্তের ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন এবং ইলেকট্রোলাইট পরীক্ষা করা হয়। কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্তের ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন বেড়ে যায়। পটাশিয়ামের পরিমাণও বাড়তে থাকে ও বাইকার্বোনেট কমে যায়। এ ছাড়া ফসফেট শরীরে জমতে শুরু করে, যার ফলে ক্যালসিয়াম কমে যেতে বাধ্য হয় এবং অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও শুরু হতে থাকে। প্রসপ্রোটিনের পরিমাণও দেখা হয়। প্রস্রাবে অ্যালবুমিন ২৪ ঘণ্টায় এক গ্রামের বেশি হলে প্রাথমিকভাবে কিডনি ফেইলিওরের কারণ হিসেবে গ্লোমারুলোনেফ্রাইটিস ধরে নেওয়া হয়।

কিডনির আলট্রাসনোগ্রাম এবং পেটের এক্সরে করা হয়ে থাকে। কিডনির কার্যকারিতা শেষ পর্যায়ে গেলে দুটো কিডনির আকৃতি স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট হয়ে যায়। যার কারণ গ্রোমারুলোনেফ্রাইটিস বা জীবাণুজনিত হতে পারে। কিডনির আকৃতি ছোট না হয়ে যদি বড় হয়ে যায় এবং ভেতরের ক্যালিসেস বা শাখা-প্রশাখা নালিগুলো ফুলে যায় তাহলে অবস্ট্রাকটিভ ইউরোপ্যাথিকে কিডনি বিকলের কারণ হিসেবে ধরা হয়।

দুটো কিডনিতে যদি অনেক সিস্ট থাকে তাহলে বংশানুক্রমিক কিডনি রোগ বা পলিসিসটিক কিডনি ডিজিজ ভাবা হয়। এ ছাড়া পাথরজনিত বা প্রস্টেটজনিত জটিলতায় কিডনি বিকল হলো কি না তাও আলট্রাসনোগ্রাম ও এক্সরের মাধ্যমে ধরা যেতে পারে।

এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াও কিডনি বিকল রোগীদের হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস, সি-ভাইরাস, এইডস রয়েছে কি না তাও দেখা হয়। বিশেষ ক্ষেত্রে চেস্ট এক্সরে, ইসিজি, রক্তের হিমোগ্লোবিন, ব্লাড গ্রুপ, এইচএলএ টিস্যু অ্যান্টিজেন এসব পরীক্ষাও প্রয়োজন হয়।

চিকিৎসা ও প্রতিকার

কিডনি অকেজো রোগীর চিকিৎসা নির্ভর করে কী কারণে এবং কিডনির কার্যকারিতা কতটুকু নষ্ট হয়েছে তার ওপর। অনেক কারণ রয়েছে যেগুলো চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো হতে পারে, যেমন বাধাজনিত কিডনি রোগ। আবার কিছু কারণ আছে যা ভালো করা না গেলেও কিডনির ক্ষতি যাতে কম হয়, সেটা করা যায়। যেমন উচ্চরক্তচাপ। তবে যেকোনো কারণেই হোক না কেন দুটো কিডনির  ৯৫ শতাংশের ওপরে যদি নষ্ট হয়ে যায় তখন কোনোভাবেই কিডনির কার্যকারিতা ফেরানো সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন পড়ে ডায়ালিসিস বা কিডনি সংযোজনের ব্যবস্থা করা। উল্লিখিত দুই ধরনের চিকিৎসা ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই প্রয়োজন সঠিক সময়ে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে কিডনি রোগের চিকিৎসা করানো। এর জন্য প্রয়োজন কিডনি রোগ সম্পর্কে সমাজ সচেতনতা, প্রাথমিক জ্ঞানার্জন ও চিকিৎসা সেবার মান বৃদ্ধি করা। মনে রাখা দরকার, প্রতিবছর দেশে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার কিডনি রোগী কিডনি অকেজো হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।


মন্তব্য