সদ্যঘোষিত চট্টগ্রামের নতুন উপজেলা ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলার সদর স্থাপন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। যৌক্তিক স্থানে ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা সদর দপ্তর স্থাপনের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
শনিবার (১১ জুলাই) ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার সদরদপ্তর নারায়ণহাট-দাঁতমারার মধ্যবর্তী স্থানে সদরদপ্তর স্থাপনের দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করেন এলাকাবাসী।
মানববন্ধনের আগে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলার সদর নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। এসময় যৌক্তিক স্থানে ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা সদর দপ্তর স্থাপনের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাড. মিজানুর রহমান চৌধুরী।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি জানান, উত্তর ফটিকছড়ি উপজেলার দাবি দীর্ঘদিনের। দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর সরকারের ১২১তম নিকার সভায় দেশের ৫০১তম উপজেলা হিসেবে উত্তর ফটিকছড়ির অনুমোদন উত্তরাঞ্চলের মানুষের ন্যায্য দাবির স্বীকৃতি। এজন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।
এসময় আরো বক্তব্য দেন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব শওকত আকবর, বিএনপি নেতা ও বিজিএমইএ পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী, বিএনপি নেতা ও হেয়াকো বনানী ডিগ্রি কলেজের সভাপতি মোজাম্মেল হায়দার বাবু, বিএনপি নেতা অ্যাড. ইউসুফ আলম মাসুদ, গণ অধিকার পরিষদের নেতা রবিউল হাসান তানজিম, ছাত্রদলের ঢাকা মহা নগর উত্তর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, গাজী গিয়াস উদ্দিন, ইসলামী ছাত্রশিবির সহকারী দাওয়াহ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম শাফী প্রমুখ।
মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন নিয়ে নতুন ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা গঠন করা হয়েছে। নতুন উপজেলার অন্তর্ভুক্ত ইউনিয়ন গুলো হলো বাগানবাজার, দাঁতমারা, নারায়ণহাট, ভূজপুর, হারুয়ালছড়ি ও সুয়াবিল ইউনিয়ন। এতে নতুন উপজেলার সদর দপ্তর ভূজপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ভূজপুর মৌজায় স্থাপনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তারা জানান, শুরু থেকেই একটি মহল ভুজপুর থানাকে উপজেলায় রূপান্তরের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আন্দোলনের কারণে নতুন উপজেলার নাম রাখা হয় ‘উত্তর ফটিকছড়ি’। এখন একই মহল নতুন করে সদর দপ্তর ভুজপুরে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
বক্তারা বলেন, ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী সুয়াবিল ইউনিয়নের জনসংখ্যা মাত্র ১৮ হাজার ৮৮৪ জন। এই ইউনিয়নকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্দেশ্য ছিল মানচিত্রে ভুজপুরকে উত্তরাঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থানে দেখানো। অথচ উত্তরাঞ্চলের তিন ইউনিয়নের ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও জনসংখ্যা অনেক বেশি। তাদের ভাষ্য, শুধু একটি ইউনিয়নের আয়তনই প্রায় ১৯১ বর্গকিলোমিটার।
তারা অভিযোগ করেন, উপজেলা প্রশাসন চারটি ইউনিয়নের জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক বাস্তবতার ভিত্তিতে যে প্রতিবেদন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল, পরবর্তীতে তা পরিবর্তন করা হয়েছে। কারা এবং কী কারণে সেই পরিবর্তন করেছে, তা তদন্ত করে প্রকাশ করার দাবি জানান তারা।
বক্তারা বলেন, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া। সদর দপ্তর যদি উত্তরাঞ্চলের পরিবর্তে দক্ষিণাংশের কাছাকাছি নির্ধারণ করা হয়, তাহলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য উপজেলা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।
তারা আরো বলেন, উত্তর ফটিকছড়ি এলাকায় দেশের বৃহত্তম রাবার বাগান, সাতটি চা বাগান, শিলুয়া গ্যাসক্ষেত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ রয়েছে। এসব এলাকার মানুষ রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও প্রশাসনিক সুবিধা থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত। সীমান্তবর্তী হওয়ায় এলাকাটির কৌশলগত গুরুত্বও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা দাবি করেন, উত্তর ফটিকছড়ির তিন ইউনিয়নে ফটিকছড়ি উপজেলার মোট ভোটারের প্রায় ২৩ শতাংশ বাস করেন। অতীতে এবং সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে এসব এলাকা থেকে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী বড় ব্যবধানে ভোট পেয়েছেন। এরপরও ওই জনগোষ্ঠীর যৌক্তিক দাবি উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
বক্তারা আরো বলেন, ২০০৬ সালে ভুজপুর থানা প্রতিষ্ঠার সময়ও তারা এর অবস্থান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং আন্দোলন করেছিলেন। তাদের দাবি, সেই সময়ের প্রশাসনিক বৈষম্য এখন নতুন উপজেলা গঠনের ক্ষেত্রেও বহাল রাখার চেষ্টা চলছে।
তারা অভিযোগ করেন, ফ্যাসিবাদী আমলের কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তির প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। নতুন উপজেলা গঠনের প্রস্তাবে সেই প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান।
বক্তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, উত্তর ফটিকছড়ির শুরু থেকে বাগানবাজার পর্যন্ত পুরো এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করে ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক সুবিধার বিষয় বিবেচনা করে সদর দপ্তরের স্থান পুনর্নির্ধারণ করা হোক।
তারা বলেন, আমাদের দাবি কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা নির্দিষ্ট এলাকার স্বার্থে নয়; বরং উত্তরাঞ্চলের মানুষের ন্যায্য অধিকার ও প্রশাসনিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য।
যৌক্তিক স্থানে ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা সদর দপ্তর স্থাপনের দাবিতে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ঢাকা-খাগড়াছড়ি ও খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে স্থানে সড়ক অবরোধ, টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ এবং মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনের নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ন্যায্য স্থানে উত্তর ফটিকছড়ি উপজেলার সদর দপ্তর নির্ধারণ না করা পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে। নতুন প্রজন্ম কোনো ধরনের আশ্বাসে আন্দোলন থেকে সরে আসবে না।
এসময় তারা প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতি দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।