kalerkantho


নারীর ডায়াবেটিস ও সুস্থতায়...

মারুফা মিতু    

১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ১৫:২২



নারীর ডায়াবেটিস ও সুস্থতায়...

পরিবারে কেউ অসুস্থ হলে সেবা করবেন মা কিংবা স্ত্রী। দশভুজা নারী সংসারের সব দেখাশোনা করার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির সবার রোগ-শোকের দেখভালও তাঁকেই করতে হয়; কিন্তু সেই মা কিংবা স্ত্রী যখন অসুস্থ হন? তখন দেখা যায় তাঁর দিকে সচেতন হওয়ার কেউ থাকে না। তাই নারীর নিজের দেখভাল অনেকটা নিজেকেই করতে হয়। সচেতন হতে হয় নিজের ব্যাপারে।

১৪ নভেম্বর ডায়াবেটিস দিবস। এখন ঘরে ঘরেই দেখা যায় ডায়াবেটিক রোগী। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীর সংখ্যাও কম নয়। নারীর শরীরে ডায়াবেটিসের প্রতিক্রিয়া অনেক কঠিন হয়। কারণ এ রোগ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারী ও তাঁর গর্ভস্থ সন্তানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীর বারবার ফাঙ্গাস বা ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া মেনোপজ তুলনামূলক সময়ের আগেও হতে পারে। এ কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীর জননাঙ্গে কিছু উপসর্গ বেশি থাকায় রোগ বেশি হতে পারে। যেমন—জননাঙ্গে ছত্রাকজাতীয় ইনফেকশন, ব্যাকটেরিয়ার ইনফেকশন, মূত্রনালি বা মূত্রথলিতে প্রদাহ ইত্যাদি। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও নিয়মিতভাবে আক্রান্ত নারীর ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা উচিত। নারীর ডায়াবেটিস ও সুস্থতা নিয়ে কথা বলেছেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক ডা. ফারহাত হোসেন।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মায়েদের অনেক ধরনের ঝুঁকি থাকে। যেমন—গর্ভধারণের প্রথম দিকে সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি (অ্যাবরশন বা মিসক্যারেজ), সন্তান পরিপূর্ণতার আগেই জন্ম হওয়া (প্রিটার্ম লেবার), ওজন অত্যধিক বেড়ে যাওয়া, এমনকি সন্তান মায়ের পেটেই মরে যেতে পারে। জন্মের পর সন্তানের বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। ৯০ শতাংশ নারীর ক্ষেত্রে শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস বা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে ভুগে থাকা নারীর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকে চলে আসে। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দেখা উচিত। যদি তা স্বাভাবিক মাত্রায় নেমে আসে, তাহলে সন্তান জন্ম হওয়ার ছয় থেকে আট সপ্তাহ পর আবার রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করে দেখা উচিত। অন্য কোনো কারণে নিষেধ না থাকলে আগে থেকে ডায়াবেটিস আক্রান্ত বা গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস আক্রান্ত নারী—সবাই সন্তানকে বুকের দুধ পান করাতে পারবেন। সমীক্ষায় দেখা গেছে, যাঁরা গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন, তাঁদের মধ্যে ৬০ শতাংশ নারী পরে ১০-২০ বছরের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। মা-বাবার মধ্যে যেকোনো একজন ৫০ বছরের আগে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে তাঁদের সন্তানের ১৪ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। এ ছাড়া মা-বাবা দুজনেরই টাইপ-২ ডায়াবেটিস থাকলে সন্তানের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৪৫ শতাংশ।

শরীরে যদি সুগার বেশি থাকে, তাহলে একজন মানুষের চলতে-ফিরতে কোনো সমস্যা হবে না। রক্ত শরীরের প্রতিটি কণায় কণায় পৌঁছে। চোখ, মাথা, মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে সব জায়গায়। আর রক্তে সুগার থাকে। ডায়াবেটিস হলে, তার চোখে সমস্যা হবে, কিডনিতে সমস্যা হবে, হার্টে সমস্যা হবে, নার্ভে সমস্যা হবে। বহু রোগীকে আপনি বলতে শুনবেন, তাঁর শরীর জ্বালাপোড়া করে, বিশেষ করে হাতের পাতায়, পায়ের পাতায়। এই জ্বালাপোড়া রোগ তাঁর স্নায়ুর অস্বস্তির জন্য হচ্ছে। এর মূলে রয়েছে ডায়াবেটিস।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধের জন্য আমাদের এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমাদের মূল কিছু জিনিস রয়েছে। একে বলা হয় ডায়েট (খাদ্যাভ্যাস), ড্রাগ (ওষুধ) এবং ডিসিপ্লিন (নিয়মানুবর্তিতা); একসঙ্গে এই তিনটিকে বলা হয় ডিডিডি। ডায়েট মানে হলো খাবার, আপনি কোন জিনিসগুলো খাবেন আর কোন জিনিসগুলো খাবেন না—এটি। ১ নম্বর হলো, আপনি কখনো চিনিজাতীয় জিনিস খাবেন না। আর কিছু খাবার আমরা খেতে নিষেধ করি। এর মধ্যে একটি হলো শর্করা। শর্করাকে আমরা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দিয়ে থাকি। সবজিকে আমরা বাড়িয়ে খেতে বলি। শর্করা মানে ভাত, রুটি। এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে, যখন একটি মানুষের ডায়াবেটিস নির্ণয় হয়, তখন তার ওজন ও উচ্চতা কত তার ওপর। ওজন ও উচ্চতা দেখে একটি খাদ্যতালিকা করা হয়। পুষ্টিবিদরা আমাদের সাহায্য করেন। একেকজনের জন্য একেক রকম খাদ্যতালিকা হয়।

ডিসিপ্লিন হচ্ছে নিয়মিত হাঁটা। আপনি প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় হাঁটবেন। যে গ্লুকোজ আপনার শরীরে সংরক্ষিত অবস্থায় আছে, সেগুলোকে পোড়ানো।

এগুলো ডায়াবেটিক রোগীর জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁর তো জটিলতা বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডায়াবেটিস থেকে তাঁর তাৎক্ষণিক কিছু জটিলতা হয়, আবার দীর্ঘমেয়াদি কিছু জটিলতা হয়। যেহেতু তিনি একটি সমস্যা বহন করছেন, এটি যোগ হলে সমস্যা দ্রুত বাড়বে। ডায়াবেটিস যার আছে, যার সুগার বেশি, তার ওজন এমনিতেই বেড়ে যায়। আপনি যদি ইচ্ছামতো ক্যালরি গ্রহণ করেন, তাহলে তো জিনিসটি দিন দিন আরো খারাপ হতে থাকবে।

একজন রোগীর যখন রোগ নির্ণয় করা হয়, তার যদি অনেক সুগার থাকে, তখন এটাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে ইনসুলিন দিয়ে নিয়ে আসাটা সবচেয়ে নিরাপদ। কারণ আপনার শরীরে ইনসুলিন কম আছে। বাইরের থেকে ইনসুলিন দিয়ে সুগারকে স্বাভাবিক মাত্রায় নিয়ে আসা যায়। ইনসুলিন নিলেই যে সারা জীবন নিতে হবে—এমন কোনো কথা নেই। ইনসুলিন নেওয়ার পর ট্যাবলেটও খাওয়া যায়।

তবে মনে রাখতে হবে, ডায়াবেটিক রোগীর জন্য হাঁটা সবচেয়ে ভালো ব্যায়াম। সে হাঁটবে অন্তত ৪৫ মিনিটের কিছু বেশি। একটু গতি বেশি রাখতে হবে। যেকোনো সময়ই করতে হবে। তবে নির্দিষ্ট একটি সময়ে। কেউ যদি সকালে সুবিধা বোধ করে, সকালে করতে হবে। কেউ যদি সন্ধ্যায় মনে করে, তখন করতে হবে। আপনার সুবিধামতো একটি নির্দিষ্ট সময়ে হাঁটবেন। প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে হাঁটলে ভালো হয়। তবে যার অন্য ধরনের সমস্যা আছে, তাঁর হাঁটতে গিয়ে অন্য রোগ বাড়িয়ে ফেললে হবে না। তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পরিবারের সবার দেখভাল করার জন্য নারীকে সুস্থ থাকতে হবে। তাই নারীর নিজের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে সবার আগে।



মন্তব্য