kalerkantho


ডায়াবেটিসে আক্রান্ত পা বাঁচাতে দেশের প্রথম উদ্যোগ মিরপুরে

পা বাঁচানোর ভাবনা, আর না আর না

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১২:০৭



পা বাঁচানোর ভাবনা, আর না আর না

কুমিল্লার দাউদকান্দির এরশাদ মিয়া সরকার। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে পায়ে পচন ধরে যায়। কথা বলার শক্তি হারান। চোখেও স্পষ্ট দেখতে পারেন না। অবস্থা এমন যে দেশের অনেকগুলো বিশেষায়িত হাসপাতালে ধর্ণা দিয়েও কাজ হয়নি। অনেক হাসপাতাল তো তাঁর অবস্থা দেখে চিকিৎসা করতেই রাজি হয়নি। শেষপর্যন্ত এরশাদ খোঁজ পান রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতালের। এখান থেকেই ‘নাজুক’ এরশাদের বদলে যাওয়ার গল্পটা শুরু।

এ হাসপাতালের ফুটকেয়ার ইউনিটে ভর্তি হন এরশাদ মিয়া। প্রায় সাত মাস হলো তিনি এই ইউনিটের পর্যবেক্ষণে। এতদিনের চিকিৎসা এবং থেরাপিতে তাঁর পায়ের পচন ৯৫ ভাগই সেরে গেছে। কথা বলতে পারছেন; চোখেও দেখছেন। 

বাকি গল্পটা তার মুখ থেকেই, ‘আমি যে অবস্থায় ছিলাম কেউ বিশ্বাস করেনি যে আমি বাঁচবো। তারপর ১৯ দিন পর আমার সেন্স ফিরে এলো। এখানে ট্রিটমেন্ট করার পর দিন দিন সুস্থ হয়ে উঠছি। প্রায় সাত মাস ধরে এখানে আছি। আল্লাহ রহমতে ডাক্তার বলেছে এখন প্রায় ৯৫ ভাগ ঠিক হয়েছে। এখানে নার্সরা নিয়মিত এসে খোঁজখবর এবং যত্ন নিচ্ছে। দেশে ডায়াবেটিস রোগীদের পা বাঁচানোর জন্য এমন একটি ইউনিট আছে এখনো মানুষ ভালো করে জানেন না। তবে বারডেম হসপিটালে না আসলে আমি এর খোঁজ পেতাম না।’

আরেক রোগী পলাশডাঙ্গার সত্তরোর্ধ্ব আফাজ উদ্দিন। চার মাসে ধরে এই ইউনিটে ডাক্তারদের পর্যবেক্ষণে আছেন তিনি। পায়ের ক্ষত নিয়ে তিনি এখানে এসেছেন। তার পায়ের মাংস খসে যায় অবস্থা। ফুটকেয়ারে আসার পর এখন তিনি বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়।

শুধু আফাজ উদ্দিন বা এরশাদ মিয়া সরকার নন, এখানে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত পায়ের পচন নিয়ে গত এক বছরে অসংখ্য রোগী চিকিৎসা নিয়ে নিজের পা বাঁচিয়েছে। আবার অনেকে বিষয়টি জানে না বলে এমন বিশেষায়িত চিকিৎসা নিতে পারছে না।

ডায়াবেটিস রোগীদের পা বাঁচানোর তাগিদে মিরপুর দারুস সালামে অবস্থিত বারডেম-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতাল বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ফুটকেয়ার ইউনিট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। এই ইউনিটে জেনারেল সার্জন, নিউরোসার্জন, ভাসকুলার সার্জন, নিউরোমেডিসিন, ফুটিয়েটিক বিশেষজ্ঞ সব মিলে গঠিত টিম স্টেট অব দ্য আর্থ সর্বোচ্চ মানের ডায়াবেটিক ফুটকেয়ার সেবা নিশ্চিত করে।

ডায়াবেটিস রোগীদের অনেকের পায়ে ঘা বা পচনজনিত সমস্যা তৈরি হয়। ফলে রোগীরা অনেক সময় হাতুড়ে চিকিৎসক বা কবিরাজের শরণাপন্ন হয় শুধুমাত্র সচেতনতার অভাবে। যারা ডায়াবেটিকস নিয়ে কাজ করছেন তাদের মতে, যেসব রোগীদের পায়ে বেশিরভাগ ঘা হয় বা পচন ধরে, তারা অধিকাংশই মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত। এদের  পায়ে ঘা হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে অজ্ঞতা। এর কারণেই তারা সঠিক জায়গায় চিকিৎসা নিতে ব্যর্থ হয়। এ কারণে ঘা বা পচন বিস্তার লাভ করে একপর্যায়ে তাদের পা কেটে ফেলতে হয়। এরা অনেকেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এদের যদি পা কেটে ফেলতে হয় তাহলে তাদের উপার্জন বন্ধ হয়ে যায়, পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে যাদের এমনটা হয় তারা জানে না, কিভাবে চিকিৎসা নিতে হবে, কোথায় যেতে হয়।

সরেজমিনে জানা যায়, ডায়াবেটিসজনিত পায়ে ঘা বা পচন ধরার একমাত্র বিশেষায়িত চিকিৎসা হয় এই ফুটকেয়ার ইউনিটে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই সুযোগটি এখানে আছে। যারা নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত তাদের পা রক্ষা করার জন্য এই উদ্যোগটি নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। যাদের পায়ে পচন ধরছে তাদেরকে এখানে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ফুটকেয়ার একটি বিশেষায়িত ইউনিট। এখানে যারা ফুটকেয়ার সার্জন তাদেরকে সার্জারির ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। একজন রোগী ঘা থেকে শুরু করে কিভাবে কখন কি করতে হবে পুরো পদ্ধতিটা বিশেষভাবে তাদের জানা আছে। বিশেষ টেকনোলজির মাধ্যমে রোগীদের সেবাটা দেয়া হয়। যেটা বাংলাদেশে এই প্রথম। এখানে সার্বক্ষণিক তদারকিতে যেসব নার্সরা আছেন, তাদেরকেও বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে শুধুমাত্র এই ইউনিটের জন্য। ২৪ ঘণ্টা মেডিকেল অফিসার তো আছেই। সবাই পদ্ধতিটার ওপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এখানে চার সদস্য বিশিষ্ট কাউন্সিলিং টিম গঠন করা আছে, যারা নিয়মিত রোগীদের মোটিভেশন দেন এবং রোগীদের কোন অভিযোগ থাকলে কাউন্সিলিংয়ের সদস্যরা সরাসরি পরিচালকের কাছে প্রতিবেদন দিতে হয়।

কথা হয় ফুটকেয়ার ইউনিটে দায়িত্বরত সহকারী অধ্যাপক ডাক্তার শাহানা আক্তারের সাথে। তিনি তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, মূলত ডায়াবেটিস রোগীরা বেশিরভাগ সময় থাকে অবহেলিত এবং ওরা হাসপাতালে আসে বেশ দেরিতে। তখন আসলে আমাদের জন্য বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। অনেক সময় বিলম্বের কারণে অনেকের পা রক্ষা করতে পারি না। দেখা যায়, সঠিক সময়ে আসলে পা’টা আমরা রক্ষা করতে পারি। রোগীদের মধ্যে যদি একটু সচেতনতা বাড়ে এবং পরিবার যদি রোগীকে সার্পোট দেয় তাহলে পা কাটা থেকে অনেক রোগী বেঁচে যাবে। আমাদের এখানে বেশিরভাগ রোগী আসে নিম্নবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত। দেখা যায়, পরিবারের উপর্জনক্ষম ব্যক্তিটাই পায়ে এমন সমস্যা নিয়ে আসেন। তাদের জন্য পা’টা খুবই গুরত্বপূর্ণ। এই ধরনের রোগীই বেশি আমাদের। এরা বুঝতেও পারে না, তাদের কি ক্ষতিটা হয়েছে। যখন প্রথম আসে তখন সবারই একটাই কথা পা’টা যে করে হোক বাঁচাতে হবে। তবে আমরা আমাদের সাধ্য মতো চেষ্টা করি। ভালো লাগে যখন দেখি যারা চিকিৎসা নিয়ে ফিরে যায় তারা হাসি মুখেই ফিরে যায়। তবে এখানে অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জের বিষয় হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা। যেমন অনেক রোগী পাঁচ সাত মাসও থাকা লাগে। কারণ ড্রেসিংয়ের একটা ব্যাপার থাকে।

হাসপাতালের পরিচালক (অব.) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল মজিদ ভূঁইয়া

বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক অব. ব্রিগেডিয়ার জেনারেল প্রফেসর ডা. মো. আব্দুল মজিদ ভুঁইয়া জানান, ফুটকেয়ার ইউনিটের স্বপ্নদ্রষ্টা বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি প্রফেসর একে আজাদ খান (স্বাধীনতা পদক প্রাপ্ত)। তিনিই এই ইউনিটটি করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এই ইউনিটের নামকরণ করা হয়েছে “ডাঃ আবদুল আলীম খান ফুট কেয়ার ইউনিট” কেননা তার অর্থায়নে ইউনিটটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে মূলত রোগীরা পা হারানোর হাত থেকে রক্ষা পেতেই আসেন। ফুটকেয়ার ইউনিটে রোগীর পা বাঁচানোর জন্য ডাক্তার, নার্স বা সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া আছে। কারণ এটি বিশেষায়িত একটি ইউনিট। এখানে মেডিকেল ট্রিটমেন্ট থেকে শুরু করে সার্জিকাল ট্রিটম্যান্ট অপরারেশন সবই আছে।

ফুটকেয়ার নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এই ইউনিটটি শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য। কারণ পায়ে এমন সমস্যা ৮৫ ভাগই পুরষ আর ১৫ ভাগ নারী। নারীদের জন্যও আলাদা ইউনিট করার পরিকল্পনা আছে আমাদের। তবে অনেক সময় আমরা রোগীদের জায়গা দিতে পারি না। কিন্তু তখন আমরা অন্য ইউনিটে তাদেরকে রেখে চিকিৎসা দেই। যেমনটা করি নারী রোগীরা আসলে। এবং বেড সংখ্যা বাড়াবো। এখন আমাদের বেড আছে ২২টি। ক্যাবিন আছে চারটি।



মন্তব্য