kalerkantho


এসিড খাইয়ে স্ত্রীকে হত্যা

তিন লাখ টাকায় রেহাই পাচ্ছেন কোটিপতি স্বামী!

হায়দার আলী   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ১৯:৫৬



তিন লাখ টাকায় রেহাই পাচ্ছেন কোটিপতি স্বামী!

মৃত্যুর তিন দিন পেরিয়ে গেলেও সেই কিশোরী প্রিয়া আক্তারের লাশটি পড়ে আছে মিরপুর সড়কের একপাশে। মামলা করতে চাইলেও প্রভাবশালী স্বামী মিলন রহমানের চাপের মুখে এখনও মামলা করতে পারেনি। স্বামীর পরিবার ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা প্রিয়ার পরিবারকে ৩ লাখ টাকা নগদ দেয়ার বিনিময়ে মামলা করতে বিরত থাকতে বলছেন। প্রিয়ার নিরীহ স্বজনরা নিরুপায় হয়ে মিলন রহমানের বন্ধু ও স্বজনদের চাপে শেষ পর্যন্ত মামলা না করেই প্রিয়ার লাশ দেশে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রিয়ার পরিবারের অভিযোগ- প্রিয়ার স্বামী মিলন রহমান ও তার আত্মীয় স্বজনরা মামলা না করতে বার বার হুমকি দিচ্ছেন। মামলা করলে আরো ভয়ংকর বিপদ হবে তাদের। মামলা না করলে তাদের নগদ তিন লাখ টাকা দেয়া হবে। এখন নিরুপায় হয়ে প্রিয়ার স্বজনরা মামলা না করেই প্রিয়ার লাশ নিয়ে পিরোজপুরের দিকে রওয়ানা দিবেন। প্রিয়ার মামা কবির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'থানায় মামলা করতে চেয়েছিলাম আমরা কিন্তু মামলা করতে দেয়নি। মিলনের মামা তারেক রহমান ও তাঁর বন্ধুরা বলেছেন, মামলা কইরা কি হইবো?  টাকার কাছে কিছুই না। মামলা না করে তিন লাখ টাকা নিয়ে যান। এখন আমরা গরীরব মানুষ, হেরা অনেক টাকা ওয়ালা লোক। মামলা করলে নাকি অনেক ভেজাল হইবো। শেষ মামলা না করেই দেশে লাশ নিয়ে যাচ্ছি। '

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার ধানিসাপা গ্রামের মৃত আব্দুস সালাম ও মানসিক প্রতিবন্ধী জাহানারা বেগমের কন্যা প্রিয়া আক্তার। জীবিকার জন্য ঢাকায় আসেন এবং গার্মেন্টস কারখানায় চাকরির সুবাদে মালিক মিলন রহমানের সঙ্গে পরিচয় এবং বিয়ে। এর তিন বছরের মধ্যে স্বামী মিলন রহমান অন্য মেয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পরে পরকীয়ায়। সেই অবৈধ পরকীয়ায় বাধা দেয়া প্রিয়ার উপর চলে নির্মম নির্যাতন। পরিণতিতে মেয়েটি লাশ হয়ে শহীদ সোহররাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে ঠাঁই নেয়। 


বান্ধবীর সঙ্গে ঘাতক মিলন

নিহত প্রিয়ার চাচাতো ভাই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রিয়ার স্বামী মিলনের বাবার নাম কি? তাদের ঠিকানা কি? কেউ কিছু বলছে না। একটি ফুটফুটে মেয়েকে এসিড খাওয়াইয়া এভাবে মেরে ফেললো? তিন লাখ টাকায় এভাবে আপোষ করে ফেলবে। একটি জীবনের মূল্য কি তিন লাখ টাকা? খুন করেও এভাবে পার পেয়ে যাবে। দেশে কি এদের বিচার হবে না? 

প্রিয়ার আরেক স্বজন বলেন, পরকীয়ায় বাধা হওয়ায় প্রিয়াকে কৌশলে এসিড জোর করে খাওয়াইয়া মেরে ফেলছে। ডাক্তাররা বলছে প্রিয়ার পেটের ভেতরে পুড়ে গেছে এসিডে। পরিকল্পিতভাবে প্রিয়াকে হত্যা করে এখন টাকার বিনিময়ে আপোষ করতে চাচ্ছে। আপোষ না করলে অনেক ক্ষতি হবে আমাদের। এখন আমরা গরিব মানুষ আপোষ না করে উপায় নেই।

প্রিয়ার এক আত্মীয় অভিযোগ করে বলেন, দারুস সালাম থানার পুলিশকে ম্যানেজ করেছে ঘাতক মিলন রহমান। মিলনের হয়ে তার মামা তারেক থানা পুলিশের সঙ্গে কথা বলে ম্যানেজ করেছে। শুনেছি মোটা অংকের টাকায় এটা করেছে। আর প্রিয়ার পরিবারের জন্য তিন লাখ টাকা দিচ্ছেন। যেন মিলনের বিরুদ্ধে হত্যার মামলা না কওে আত্মহত্যার মামলা করি। বিশেষ কওে ওরা প্রভাবশালী এবং অনেক টাকা পয়সার মালিক। তাই মামলায় যেতে ভয় পাচ্ছেন।

স্ত্রী প্রিয়াকে হত্যার পর থেকেই স্বামী মিলন রহমান পালিয়েছে। এমনকি তার আত্মীয়-স্বজনরাও কেউ আসেনি। প্রিয়া আক্তারের চাচাতো বোন আঁখি আক্তার বলেন, প্রিয়ার স্বামী একজন নারীলোভী। অনেক মেয়ের জীবন শেষ নষ্ট করছে। প্রিয়াকে বড় স্বপ্ন দেখিয়ে বিয়ে করলেও ভোগ করেছে কিন্তু সুখ দেয়নি। এখন তিন লাখ টাকায় আপোষ করে নিজেকে রক্ষা করতে চাচ্ছেন।

প্রিয়ার স্বজননদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছোট বোন সুফিয়া আক্তার ও প্রতিবন্ধী মাকে নিয়েই গ্রামেই বসবাস করেন। দরিদ্র পরিবারের বেড়ে ওঠা প্রিয়া তার প্রতিবন্ধী মা ও ছোট বোনের মুখে দু'মুঠো খাবারের জোগাড়েই ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে তার ফুপু লাকি বেগমের বাড়িতে ওঠেন এবং পরবর্তী সময়ে মিরপুরের একটি গার্মেন্টসে চাকরি নেন। আর সেখানেই মালিক মিলন রহমানের নজরে পড়েন।  

প্রিয়া আক্তারের সহকর্মীরা জানান, প্রিয়া সুন্দরী এবং অল্প বয়সী হওয়ায় কারখানার মালিক বিয়ে করেন তিন বছর আগে। মিরপুরের কয়েকটি বাসায় ভাড়া ছিলের প্রিয়া আর মিলন। কয়েক মাস ধরে শুনছি প্রিয়াকে রেখেই অন্য একটি মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ায় মালিক। সেই প্রেমে বাধা দেওয়ার কারণেই মিলন প্রিয়াকে মেরে ফেলছেন। 

প্রিয়ার স্বজনরা অভিযোগ করেন,  এর আগেও মিলন একাধিক অসহায় মেয়েকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সর্বনাশ করেছে। বিয়ের কথা বলে ভাড়া বাড়ি নিয়ে অনেকের সঙ্গে থেকেছে। পরিবারের সুখের জন্য ঢাকায় এসেছিল মেয়েটি, আর এখন লাশ হয়ে পিরোজপুর যাচ্ছে। ঘাতক মিলন রহমানের কঠিন শাস্তি দাবি করেন পরিবারের লোকজন। 



মন্তব্য