kalerkantho


ইউএনও’র উদ্যোগে ভিক্ষাবৃত্তির অবসান ঘটল গোলাপের জীবনে

দোহার-নবাবগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি   

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ১৫:০৪



ইউএনও’র উদ্যোগে ভিক্ষাবৃত্তির অবসান ঘটল গোলাপের জীবনে

কে এম আল-আমিন, পেশায় প্রশাসনিক কর্মকর্তা হলেও সমাজমুখী একজন উদ্যোগী চিন্তাচেতনার মানুষ। ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে আছেন প্রায় দুই বছর ধরে। প্রশাসনিক দায়িত্বের বাইরেও তাঁর উদ্যোগী জনবান্ধব বেশকিছু কর্মকাণ্ড নাড়া দিয়েছে সাধারণ মানুষের মনকে। উজ্জ্বল হয়েছে সরকার ও প্রশাসনের ভাবমূর্তি। ইতিমধ্যেই এই ইউএনও’র উদ্যোগে পাল্টে গেছে দোহার উপজেলার স্কুলছাত্রী সুস্মিতা, আনোয়ারা, প্রতিবন্ধী রুনা, মাদকসেবী রমজান ও প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে শিল্পীসহ বেশ কয়েকজনের জীবনের হতাশার গল্প। কাউকে দিয়েছেন আশ্রয়ের ঠিকানা, কাউকে চাকরি, কাউকে ভ্যান আবার কাউকে নিজ পকেট থেকে টাকা দিয়ে পরীক্ষা দেবার সুযোগ করে দিয়েছেন তিনি। ইউএনও’র সহায়তায় অন্ধকার থেকে এখন আলোর পথযাত্রী ওরা। 

এবার সেই ইউএনও’র উদ্যোগেই নতুন করে জীবন শুরু করল প্রতিবন্ধী গোলাপ মিয়া। দীর্ঘদিন ধরে দোহারের মৈনট পদ্মা পারের ট্রলার ও স্পীডবোট ঘাটে ভিক্ষা করা প্রতিবন্ধী গোলাপ পেল বসবাসের জন্য ঘর ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য নগদ টাকা। 

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে দোহারে সদ্য যোগদানকৃত উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সালমা খাতুন ও ইউপি চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেনকে সাথে নিয়ে মাহমুদপুর আশ্রয়ন প্রকল্পে গোলাপের পরিবারকে একটি ঘর বুঝিয়ে দেন ইউএনও কে এম আল-আমীন। আর দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই প্রশাসনের ভাল একটি কাজের সঙ্গী হতে পেরে গর্বিত ভূমি কর্মকর্তা সালমা খাতুনও। অন্যদিকে ইউএনও’র উদ্যোগে ঘর ও টাকা পেয়ে আবেগে কেঁদে ফেলেন গোলাপের পুরো পরিবার।

প্রতিবন্ধী গোলাপ মিয়া জানান, অভাব-অনটনের সংসারে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পেরেছিলাম। নিজের আশ্রয়ের ঠিকানা বলতে কিছু ছিল না। যখন সুস্থ ছিলাম বাসের হেলপার হিসেবে কাজ করতাম। যা আয় হতো তা দিয়ে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে কোনোভাবে দিন কাটাতাম। কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় জীবনের সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকার পর একটি ‘পা’ কেটে ফেলতে হয় শরীর থেকে। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে যখন কোনো কাজ পাচ্ছিলাম না তখনই বাধ্য হয়ে ‘ভিক্ষাবৃত্তি’ বেছে নেই। মৈনট ঘাটে ভিক্ষা করে কোনোমতে প্রতিদিনের খরচ জোগাড় করতে পারতাম। ঘরে এক মেয়ে ও এক ছেলে। মেয়েটা বেশ আপত্তি করতে শুরু করে, যেন আমি ভিক্ষা না করি। কিন্তু কোনো দিশা খুঁজে পাচ্ছিলাম না যে কি করব। এরই মধ্যে গত কয়েকদিন আগে এক ভদ্রলোক মৈনট ঘাটে এসে আমার সাথে কথা বলে আমাকে অফিসে যেতে বলে। তখন জানতে পারি ওনি দোহারের ইউএনও স্যার।

মাহমুদপুর আশ্রয়ন প্রকল্পে বসবাসের জন্য একটি ঘর বুঝে পাবার পর গোলাপ মিয়া আবেগে কেঁদে ফেলেন। বলেন, ইউএনও স্যার আমারে নতুন কইরা বাঁচবার পথ দেখাইয়া দিল। আমার মেয়েটা অনেক কইরা বলত ‘বাবা তুমি ভিক্ষা কইরো না তো, সবাই আমারে ভিক্ষুকের মাইয়া কয়’। মেয়েটার কথা শুইন্যা কান্দা আইসা পড়ত, কিন্তু অভাবের কারণে অর কথা রাখবার পারতাম না। কিন্তু এহন যেহেতু বাঁচার একটা রাস্তা পাইলাম, আমি আর ভিক্ষা করুম না। 

গোলাপ বলেন, স্যারের কাছে একটা অটোরিকশা চাইছি। ওই রিকশা নাকি প্রতিবন্ধীরা চালাইব্যার পারে। হেইড্যা পাইলে আমার পরিবারে আর কষ্ট থাকবে না। স্যারে আমারে নতুন কইরা বাঁচবার শিখাইলো, আল্লায় হেরে ভাল রাখুক।

এ প্রসঙ্গে দোহার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সালমা খাতুন বলেন, আমি দোহারে কয়েকদিন হয় এসেছি। ইউএনও স্যার যখন বিষযটি নিয়ে আমার সাথে কথা বলল তখনই আমি বেশ আগ্রহী ছিলাম এমন একটি ভাল উদ্যোগে আমি অংশীদার হব। দোহারে দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই জনবান্ধব একটি কাজে সম্পৃক্ত থাকতে পেরে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে বেশ গর্বিত মনে হচ্ছে। আমরা ভূমি অফিসের পক্ষ থেকে প্রতিবন্ধী গোলাপ মিয়াকে অল্প দিনের মধ্যে ঘরের দলিল বুঝিয়ে দেব।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম আল-আমিন বলেন, ভাল কাজ করতে পারলে নিজের মধ্যেই একটা প্রেরণা সৃষ্টি হয়। ওই ধরনের কাজগুলোর প্রতি কেমন যেন একটা নেশা হয়ে যায়। প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে এ ধরনের কাজগুলো করতে গেলে আর্থিক সমস্যায় ভুগতে হয়। যে কাজগুলোই আমি দোহারে এসে করেছি সেগুলোতে উদ্যোগ আমারই ছিল কিন্তু অনেকেরই সহযোগিতা ছিল বলেই তা পুরোপুরি সম্ভব হয়েছে। এটা দেখে অনেকেই ভাল কাজে প্রেরণা পাচ্ছে। 

তিনি বলেন, গোলাপ মিয়ার মধ্যে আমি আত্মপ্রত্যয়ী মনোভাবটা দেখেছি। সে আমাকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে যে আর ভিক্ষাবৃত্তি করতে চান না সে। কারণ হিসেবে বলেছেন, ছেলে-মেয়েটা বড় হচ্ছে, সমাজ তাদের ছোট চোখে দেখেন।  গোলাপ মিয়ার এমন কথার কারণে আমি এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। প্রথমে আমি তাঁকে একটি চা-বিস্কিট বিক্রির জন্য টিন-কাঠের একটি দোকান করে দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু সে বলেছে একটি রিকশার কথা। ভূমি অফিসের সহযোগিতায় তাঁকে আশ্রয়নে একটি ঘর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য কিছু নগদ টাকা দেওয়া হয়েছে।


মন্তব্য