kalerkantho


ঘুড়ির আকাশের গল্প বলি...

কাজী তানভীর আহমেদ   

১৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ২১:৩২



ঘুড়ির আকাশের গল্প বলি...

ছবি-টুইটার থেকে সংগৃহীত

ঐ ধর ধর, বাকাট্টা লট... এভাবেই ছেলে-মেয়েদের চিৎকার শুনতে পাবেন পুরান ঢাকায়। দেখবেন তাদের ছুটোছুটি। হাতে লগি নিয়ে একদল দৌঁড়াচ্ছে কেটে পরা ঘুড়ি ধরতে, আরেকদল বাসার ছাদে ব্যস্ত সদ্য মাঞ্জা দেয়া সুঁতোয় অন্যের ঘুড়ি কাটায়। এসবই দেখতে পাবেন পৌষ সংক্রান্তিতে পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে।

পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি কে ঢাকাইয়া ভাষায় সাকরাইন বলা হয়। এটি ভারতে পৌষ সংক্রান্তি, নেপালে মাঘী, থাইল্যান্ডে সংক্রান, মিয়ানমারে থিং ইয়ান এবং কম্বোডিয়ায় মহাসংক্রান নামে পরিচিত।

এটি পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী উৎসব। দিনে ঘুড়ি উড়ানো, সন্ধ্যার পর ফানুশ উড়ানো আর আতশবাজীর আলোয় ঝলমলিয়ে পালন করা হয় এই উৎসব। ছেলে-বুড়ো সকলের আনন্দের বাঁধ ভেঙে যায় এই উৎসবে।

পুরান ঢাকার সাকরাইন পালিত হয় পৌষের শেষ দিন, তবে শাঁখারিবাজারের আদি হিন্দু পরিবারগুলো লোকনাথ পঞ্জিকা অনুসারে পৌষের শেষ দিন মেনে এ উৎসব পালন করে।

চক্ষুদার, মালাদার, চারবুয়া, মাছলেঞ্জা- আরো কত নামের বাহারি রঙের ঘুড়ির মেলা বসে পুরান ঢাকার বাসার ছাদে ছাদে যার সীমা গিয়ে ঠেকে আকাশে।পৌষের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরেই শুরু হয়ে যায় ঘুড়ি উড়ানোর উন্মাদনা আর বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়ে তার জৌলুশ।শীতের এলিয়ে পড়া দুপুর আর বিকালের নরম রোদের মাঝে খোলা আকাশে গোত্তা খায় নানান রঙের ঘুড়ি। ঘুড়িতে ঘুড়িতে চলে কাটাকাটির খেলা।

এই উৎসবের পুরো সময়টা জুড়েই থাকে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেমে গানের আসর। মুখে কেরোসিন নিয়ে আগুনে ফুঁ দিয়ে অগ্নিকুণ্ড তৈরি করা এর অন্যতম আকর্ষণ। ফানুশ আর আতসবাজিতে মুখরিত থাকে আকাশ।

এই উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয় জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের পর থেকেই। সুঁতোয় কাঁচ আর আঠা দিয়ে মাঞ্জা দেয়া হয়। শিরিষ আর সাগুদানা জ্বাল দিয়ে ঘন আঠাল তরল তৈরি করা হয়। এর সঙ্গে মেশানো হয় পছন্দসই রং। সুতার রিল বেশ সময় নিয়ে তাতে ডুবিয়ে রাখা হয়। এরপর সুতা ধারালো করার জন্য কাঁচগুঁড়া করে বেটে পাউডারের মতো করা হয়, যাকে বলে চুর।

শাঁখারিবাজারের দোকান গুলোতে পাওয়া যায় রঙ বেরঙের ঘুড়ি।তবে অনেকেই নিজেরা বানিয়ে নেন ঢাউস আকৃতির ঘুড়ি, যা ‘ল্যাঞ্জার’ নামে পরিচিত।

উৎসবের আমেজ পুরান ঢাকার সর্বত্র বিরাজ করে। তবে মূল উৎসব গেন্ডারিয়া, সুত্রাপুর, তাঁতিবাজার, লক্ষীবাজার, চকবাজার এলাকা জুড়ে চলতে থাকে।

মজার বিষয় হচ্ছে, সাকরাইন এখন আর শুধু ঢাকাইয়াদের উৎসব নেই, এটি এখন পুরো ঢাকাবাসীর আনন্দের উৎসব।
মোঘল আমল থেকেই বাংলার এই উৎসব পালিত হলেও ঢাকাই নবাবরা এই উৎসবের প্রবর্তন করেন। সেই সময় খাজনা আদায় শেষে নবাবরা ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব আর খানাপিনার আয়োজন করতেন।  কালক্রমে এটি সাধারণ মানুষের উৎসবে পরিণত হয়।

গোধূলির আলোয় এই ঘুড়ি,ফানুস, আতসবাজী আর আগুনের কুণ্ডলি সব মিলিয়ে এক অপার্থিব পরিবেশের তৈরি করে।



মন্তব্য