kalerkantho


ঢাকার অতিথি

ভ্রমণে বাড়ে জ্ঞানের পরিধি

ফিলিপাইনের যুবক কেনেথ স্যালভিনো। টানা ১৮ মাস ভ্রমণ করেছেন। ভারত হয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশেও। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

১৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ভ্রমণে বাড়ে জ্ঞানের পরিধি

ক্যানেথ স্যালভিনোর ভ্রমণ অভিজ্ঞতার বেশির ভাগ জুড়েই আনন্দ। তবে আছে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও। একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করা যাক। সরাসরি জেনে নিন কেনেথের কাছ থেকেই। তিনি বলেন, ‘বেশ কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করেছি। কোথাও তেমন সমস্যা হয়নি। তবে মালয়েশিয়ায় গিয়ে বোকা বনে গেলাম। ওরা জানাল, আমার কাগজপত্র ঠিকঠাক নেই। আমাকে অবিশ্বাস করল। নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে কারাগারে ঢুকিয়ে দিল। ওখান থেকে বের হতে খুব বেগ পেতে হয়েছিল আমার। কারাগারে আতঙ্কে ছিলাম। শুধু তা-ই নয়, বিমান থেকেই আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু হয়েছিল। একদল যাত্রী আমার প্যান্টে পানি ছিটিয়ে দিয়েছিল। পরে সিট পরিবর্তন করতে বাধ্য হই। কয়েক ঘণ্টা পর ওই দলটির আরেক লোক এসে আমার মাথায় টোকা মেরে গেল, এমনকি ওই ফ্লাইটেই আমার লাগেজও খোয়া গিয়েছিল। লাগেজের ভেতর ছিল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। কুয়ালালামপুরের পুলিশ আমাকে বিশ্বাস করেনি। কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। সপ্তাহখানেক পর লাগেজ ফিরে পেয়ে কারাগার থেকে ছাড়া পাই।’

এক দমে ঘটনাটা বলে হাঁফ ছাড়লেন কেনেথ। তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, ১৮ মাসের ভ্রমণে এমন বাজে অভিজ্ঞতা আরো আছে কি না। তিনি বললেন, ‘আছে, ভারতে। দেশটির রাজধানী নয়াদিল্লিতে আমার টাকা চুরি গিয়েছিল। যে বাড়িতে উঠেছিলাম, সেখান থেকেই আমার টাকাগুলো চুরি যায়। আমার হোস্টেরও সম্ভবত আরো কোনো বাজে মতলব ছিল। এর পর থেকে ভারতের ব্যাপারে আমার আতঙ্ক কাজ করে।’

একজনের দোষে গোটা ভারতের ব্যাপারে আতঙ্ক কেন? ‘ওই কষ্টটায় আমি ভেঙে পড়েছিলাম। টাকা হারালে টাকা পাওয়া যায়, কিন্তু কষ্ট গেঁথে গেলে মুছে ফেলা যায় না। তাই সেটা ভুলতে পারছি না। ভারত নাম শুনলেই ভয় লাগে। এই লেখাটা যদি কোনো ভারতীয় পড়ে থাকেন, তাহলে দয়া করে আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি কিন্তু ভারতকে দোষ দিচ্ছি না। ভারতীয়দেরও খারাপ বলছি না। আশা করি বুঝতে পারবেন। আমি এখনো ভারতকে ভালোবাসি।’

ভ্রমণের আনন্দ কী? ‘সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো—পৃথিবী আমার বাড়ি। পৃথিবীর পথে পথে ঘুরতে আমি বড় ভালোবাসি। যা চেয়েছি, তার সবই ভ্রমণ থেকে পেয়েছি। ভ্রমণে বাড়ে জ্ঞানের পরিধি। ভালো সময়গুলো সব সময় মনে থাকবে। সেই সময়গুলোর গল্প অন্যদের সঙ্গে করতেও পছন্দ করি আমি। আমার মতো তরুণদের উচিত অভিজ্ঞতা দিয়ে জীবনকে অনুধাবন করা।’

আপনার শখ কি শুধু ভ্রমণ? ‘না, আরো আছে। ইয়োগা শেখার চেষ্টা করছি। মানবতার জন্য যেকোনো স্বেচ্ছাশ্রমও দিতে চাই। অন্যের কাছ থেকে শ্রম আশা করি।’

মালয়েশিয়া ও ভারতের ব্যাপারে আপনার অভিজ্ঞতা জানালেন। দু-এক কথায় আরো কয়েকটি দেশের ব্যাপারে জানানো যাবে?

কেনেথ উচ্ছ্বসিত হলেন। তারপর বললেন, ‘শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলাম। ওখানে বাইসাইকেল চালানোর পর মনে হয়েছিল, পৃথিবীতে আমার দ্বারা অসম্ভব বলতে কিছুই নেই! ইরানে গিয়ে নিজেকে পারস্যের যুবরাজ ভাবতে শুরু করেছিলাম। ত্রিপোলিতে গিয়ে আমাকে রাজপুত্র মনে হয়েছিল।’ কেন? ‘ত্রিপোলির লোকেরা আমাকে রাজপুত্রের সমাদরেই রেখেছিল। খেতে দিয়েছিল, কাপড় দিয়েছিল। বলতে গেলে সবই দিয়েছিল। নিজেরা বাইরে বিছানা পেতে আমাকে ভেতরে ঘুমাতে দিয়েছিল। যখন মেঝেতে বসতাম, ওরা মাদুর এগিয়ে দিত। ভাবতেও পারবেন না, ওরা আমাকে টাকাও সেধেছিল। ওই টাকা আমি নিইনি। কিন্তু ভেতর থেকে উষ্ণ আন্তরিকতাটুকু নিয়েছিলাম।’

ঢাকার ব্যাপারে তো কিছুই বললেন না?

কেনেথ এবার হাসলেন। ‘বলতাম, অবশ্যই বলতাম। তার আগেই আপনি জিজ্ঞেস করেছেন।’

এককথায় বলুন—“ঢাকায় এসে আমার নিজের বাড়ির মতো মনে হয়েছিল। আমার সঙ্গে ছিল ব্রিটেনের এক বন্ধু। তাকে নিয়ে কিছুটা সমস্যা হয়েছিল। ঢাকার লোকেরা তাকে চিড়িয়াখানার ‘চিড়িয়া’ বানিয়ে ছেড়েছিল। আমি উপভোগ করেছিলাম। দেশটা অনেক সুন্দর, বিশেষ করে রাজধানীর বাইরের পরিবেশ অনেক প্রকৃতিঘেরা, নিরিবিলি। তবে রাজধানীকেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে গুছিয়ে নেওয়া যেতে পারে, যাতে আগামী প্রজন্ম একটি সুস্থ-সুন্দর রাজধানী পায়। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আরো এগিয়ে যাবে বলে আমি আশা করি।”



মন্তব্য