kalerkantho


তথ্যভাণ্ডারের আওতায় আসছে পরিবহন শ্রমিকরা

রাতিব রিয়ান   

১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



তথ্যভাণ্ডারের আওতায় আসছে পরিবহন শ্রমিকরা

রাজধানী ঢাকায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ। ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার জন্য সেখানকার সড়কে অপেক্ষা করছিল বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। কিন্তু দুই বাসের রেষারেষি চলাকালে একটি বাস শিক্ষার্থীদের ওপর উঠে গেলে ঘটনাস্থলে রাজিব ও দিয়া নামে দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। আহত হয় বেশ কয়েকজন। এ ঘটনায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলনে নামে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। নীতিনির্ধারণী মহল থেকে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের ওপর বাস তুলে দেওয়ার ঘটনায় দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন জাবালে নূর পরিবহনের বাসচালক মাসুম বিল্লাহ।

মাসুম সে সময় জবানবন্দিতে জানিয়েছিলেন, জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভারের নিচে রাস্তার পাশে শহীদ রমিজ উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১৪-১৫ জন শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে ছিল। বেশি ভাড়া পাওয়ার আশায় তিনি অন্য বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর গাড়ি উঠিয়ে দেন। পরে গাড়ি থেকে নেমে দেখেন ১০-১২ জন আহত হয়েছে এবং দুজনের মৃত্যু হয়েছে। জনরোষের ভয়ে তিনি পালিয়ে যান।

রাজধানী ঢাকায় এ রকম দুর্ঘটনা কিংবা সড়কে প্রাণহানির ঘটনা কম নয়। কোনো ঘটনায় দোষ চালক-সহকারীর। আবার কোনো কোনো ঘটনায় দোষ পথচারীরও। বেশির ভাগ দুর্ঘটনার সময় পালিয়ে যান বাসের চালক ও সহকারীরা। কারণ প্রাণভয়। কোনো দুর্ঘটনার তদন্ত শেষে যদি দেখা যায় চালক অপরাধী, তখন তাঁদের ঠিকানা না থাকায় অনেক সময় আইনের আওতায় আনা যায় না। তাই রাজধানী ঢাকার পরিবহন চালক ও হেলপারদের অপরাধ রোধ এবং দ্রুত তাঁদের আইনের আওতায় আনতে ডাটা বেইস তৈরির কাজ হাতে নিয়েছে পুলিশ। ওই ডাটা বেইসে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের তথ্য ও তাঁদের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য থাকবে। ফলে কোনো অঘটন ঘটলে তাঁদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। জঙ্গিবাদসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে এর আগে পুলিশ ‘সিটিজেন ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিআইএমএস)’ নামে একটি ডিজিটাল ডাটা বেইস তৈরি করে। যেখানে দেশের সব নাগরিকের তথ্যই থাকবে। সেই ডাটা বেইসের আওতায় গণপরিবহনের চালক ও হেলপারদের আলাদা ফরম্যাটে তথ্য সংরক্ষণ করা হবে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুর ও উত্তরা রুটে চলাচলকারী ভূঁইয়া পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. বিপ্লব মিয়া বলেন, ‘এ ধরনের উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। পরিবহন সেক্টরে যাঁরা কাজ করেন, অনেক সময় তাঁদের আসল তথ্যও হয়তো আমরা জানি না। তাঁরা ডাটা বেইসের আওতায় এলে যেকোনো বিষয়েই তাঁদের আইনের আওতায় আনা সহজ হবে।’ এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন বলেন, ‘গণপরিবহনের চালক, কন্ডাক্টর, সুপারভাইজার ও হেলপারদের তথ্য সংরক্ষণে পরিবহন মালিক সমিতি, বিআরটিএ ও পুলিশ কাজ শুরু করেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘জঙ্গি ও সন্ত্রাসীরা নির্দিষ্ট টার্গেট নিয়ে ভুয়া নাম-ঠিকানা, বাসাবাড়ি, ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিল। ভাড়া বাসাবাড়িকে তারা নিজেদের আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছিল। বর্তমানে বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংরক্ষণ থাকায় যেকোনো ধরনের সন্ত্রাসী ও জঙ্গি কর্মকাণ্ডের পর সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত ও তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হচ্ছে।’

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘অনেক সময় অপরাধ সংঘটন করে পরিবহন চালকরা পালিয়ে যান। সে ক্ষেত্রে তাঁদের আইনি আওতায় আনতে অনেক বেগ পোহাতে হয়। এ ছাড়া কোনো দুর্ঘটনায় তাঁরা যখন ক্ষতিগ্রস্ত হন, তখন তাঁদের পরিচয় খুঁজে পেতেও পুলিশকে ভোগান্তি পোহাতে হয়। সে জন্য তাঁদের ডাটা বেইস তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘মালিক-শ্রমিক ও বিআরটিএর মাধ্যমে এ তথ্য নেওয়া হবে।’ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় ভালোভাবে ডাটা বেইস তৈরির কাজ সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

পুলিশ জানাচ্ছে, গণপরিবহনে যাঁরা চালক রয়েছেন, তাঁদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে হয়। সেই ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যুর আগে তাঁদের সঠিক নাম-ঠিকানা যাচাই করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সুপারভাইজারসহ বাসের চালকের সহকারী হিসেবে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরাও নিজ নিজ কম্পানির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়ে থাকেন। বিআরটিএর যান পরিদর্শক এম এ জলিল বলেন, ‘সাধারণত বিআরটিএর কাছে চালক-মালিকদের প্রাথমিক কিছু তথ্য সংরক্ষিত থাকে। তবে যাত্রীদের নিরাপত্তা বিঘ্ন যাতে করতে না পারে, সে জন্য তাঁদের আলাদা ডাটা বেইস তৈরি হওয়া জরুরি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এ তথ্য সংরক্ষিত থাকলে কোনো অভিযোগ এলে সহজে তারা বিষয়টির সুরাহা করতে পারবে।’

বাংলাদেশ শ্রমিক পরিবহন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক উসমান আলী বলেন, ‘কোনো কোনো সময় চালকদের দোষ থাকে না। তাঁরা পরিস্থিতির শিকার হন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তাঁরা যেন অহেতুক হয়রানির মধ্যে না পড়েন সে বিষয়টি ভাবতে হবে।’

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে চালক ও তাঁর সহকারীদের তথ্য জোগাড় শুরু করেছি। চালকদের লাইসেন্সের কপি ও নাগরিক সনদ নিয়ে নিচ্ছি। সুপারভাইজার ও হেলপার সবার ক্ষেত্রেই এটা করছি। কারণ হঠাৎ করে একটি দুর্ঘটনা ঘটলে তখন তাঁদের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। তাঁদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া গেলে অনেক বিষয় সহজ হয়ে যাবে।’ ট্রাফিক পুলিশের (পশ্চিম) উপকমিশনার রিফাত রহমান বলেন, ‘চালক-শ্রমিক-মালিকদের তথ্য যেন পর্যাপ্ত থাকে সে বিষয়ে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ট্রাফিক আইন মানতেও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সবার কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়েই তথ্য সংরক্ষণ করা হবে।’ পুলিশ সদর দপ্তরের ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এআইজি মোশাররফ হোসেন মিয়াজি বলেন, ‘চালকরা গাড়ি চালানোর জন্য লাইসেন্স নিয়ে থাকেন। এ জন্য বিআরটিএ থেকে তাঁদের তথ্য নিতে হয়। পুলিশ প্রয়োজনে ওখান থেকেও ডাটা সংরক্ষণ করবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘শুধু তথ্য সংগ্রহ করলে হবে না। সব জায়গায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত চালক যেন থাকে, সে বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। এ ছাড়া গণপরিবহনে অতিরিক্ত চালক যেন থাকে, তার নিশ্চয়তাও থাকবে। সড়কে দুর্ঘটনা কমানো এবং পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অপরাধ কমাতে ডাটা বেইস তৈরি করা হচ্ছে। যত কিছুই করা হোক না কেন, সবার আগে দরকার জনসচেতনতা ও সতর্কতা।’



মন্তব্য