kalerkantho


অন্য চোখে

ঢাকা বিষয়ে আমার দ্বিমুখী ভাবনা

ইয়োহান ইয়ক্কে   

১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ঢাকা বিষয়ে আমার দ্বিমুখী ভাবনা

পাঠক যদি আশা করে থাকেন, ঢাকাকে আমি কি রকম ভালোবাসি, কেন ঢাকা আমার অতি প্রিয় সেই বয়ান দেওয়ার জন্য আমি কলম ধরেছি, তাহলে আপনাকে হতাশ করার জন্য আগেভাগেই দুঃখ প্রকাশ করে রাখছি। সব অর্থেই একজন সুবিধাভোগী হওয়া সত্ত্বেও ঢাকা আমাকে ভীষণ পীড়া দেয়। বলে রাখা ভালো, আমি আবার এতটা সুবিধাভোগীও নই যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ির পেছনের সিটে বসে বসে নিজের স্মার্টফোন নিয়ে খেলায় মগ্ন থেকে এই শহরের বেশির ভাগ অধিবাসীকে ভুলে যেতে পারব। গত ২০ বছর যাবৎ আমার ঢাকায় আসা-যাওয়া এবং মাঝেমধ্যে থাকার পরও আমি এই শহরকে খুব কমই জানি। কাজেই এখানে যা লেখা হচ্ছে, তাকে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার একটা এলোমেলো নির্যাস বলে ধরে নিতে পারেন।

আমি এমন এক দেশ থেকে এসেছি, যেখানে সবচেয়ে বড় শহরের জনসংখ্যা পাঁচ লাখ। ঢাকা ছিল আমার প্রথম, যাকে নরম করে বললেও একটা মেগাসিটি বলা যায়—সে রকম শহর দর্শন। প্রথম যখন ঢাকায় আসি, তখন আমার অনুভূতি ছিল একটা ধাক্কা ও বিচ্ছিন্নতাবোধের, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল একটা হতাশার অনুভূতি। এখানে আপনারা দেশি বড়লোক বা বিদেশিদের সাধারণ সব অভিযোগ যোগ করে নিতে পারেন। এই যেমন প্রচণ্ড ভিড়ভাট্টা, অনিয়ন্ত্রিত দমবন্ধ দূষণ, যানজট, দুর্নীতি ইত্যাদি। সহজ কথায় বলতে গেলে তখন আমি ভেবেছিলাম ঢাকার কোনো কিছুই ভালো না। এখন এত বছরের আসা-যাওয়া ও থাকার সুবাদে এখন অনুভূতিটা বদলে রাগ ও হাল ছেড়ে দেওয়ার অনুভূতিতে পরিণত হয়েছে।

কিভাবে সেটি হলো? একজন সাধারণ পাঠক প্রশ্নটা করতেই পারেন। এই যে এত এত উন্নয়ন হচ্ছে! পশ্চিমা দেশ থেকে আসা একজনের জন্য এর চেয়ে ভালো সুযোগ-সুবিধা তো ঢাকায় আগে কখনো ছিল না। এসব উন্নয়নের কথা ভাবুন, যদি সন্দেহ থেকে থাকে তো সরকারের জ্ঞানচক্ষু উন্মোচন করা বিজ্ঞাপনগুলো পড়ুন, ভাবুন ঢাকার ক্রমবর্ধমান সুন্দর সুন্দর ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট, চকচকে গাড়ি, বিরাট বিরাট শপিং মল আর সুন্দর আবাসিক এলাকাগুলোর কথা। সত্যি কথা, অনেক লোক আছেন, যাঁরা বাংলাদেশের অন্য কোথাও না থেকে ঢাকাতেই থাকতে চাইবে এবং এখন দুনিয়ার যেকোনো ভোগ্যপণ্য আপনি ঢাকায় পেতে পারেন, এমনকি যে ব্র্যান্ডের কফি আপনার পছন্দ তা-ও। ঢাকার বেশির ভাগ লোকের যে এই ভোগের আয়োজনে প্রবেশাধিকার নেই, সে কথা ভুলে যান। ভুলে যান যে মোটাদাগে তাদের শ্রম শোষণ আর সাধারণের সম্পত্তি দখলের মাধ্যমেই এই শানশওকত। আসলে তারা ধনী আর সম্পদশালীদের সার্বক্ষণিক রক্তদাতা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। এমনিতেই কেনাকাটায় আমার তেমন আগ্রহ ছিল না, এই ২০ বছর পরে এসে আরো নাই। কিন্তু কেনাকাটার উৎসবের কারণে আমি হতাশ ও রাগান্বিত নই।

আমার ক্রুদ্ধ ও হাল ছেড়ে দেওয়া মনোভাবের কারণ আমি এত দিনে বুঝতে পেরেছি ইচ্ছাকৃতভাবে এই নগরীকে তাঁর বেশির ভাগ অধিবাসীর জন্য পরভূমি বানিয়ে রাখা হয়েছে। প্রিয় পাঠক, এটা বলা বন্ধ করুন যে এটা হয়েছে অধিক জনসংখ্যার (গরিব লোক) কারণে, যখন আসল কারণ হলো কতিপয় এলিটের স্বার্থগত কারণে এবং তাদের কল্পনাশক্তিহীন অবিবেচক ভূমিকার কারণে। যখন তাঁরা ও তাদের আশপাশে ঘিরে থাকা জি-হুজুররা দেশি-বিদেশি কতিপয় সুবিধাভোগীর স্বার্থে পরিকল্পনা করে তখন প্রতিটি দিন ঢাকা তার সাধারণ অধিবাসীদের জন্য আরো শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। তাদের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার যাচ্ছেতাই অবস্থা, পুলিশ তাদের জন্য শত্রুশিবির, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি তাদের মাথাপিছু হিসাবে ধরলে বড়লোকদের চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনে নিতে হয়। ঢাকায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধির কোনো সীমা-পরিসীমা নেই, তার সংখ্যা বা চলাচলের সময়েরও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, আর তা যানজট বৃদ্ধি করে একটা দমবন্ধ পরিবেশে মানুষকে ধীরে ধীরে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু গাড়ির কম্পানি, আমদানিকারক, মালিকদের স্বার্থে চলছে সব কিছু, এই শহরের নিয়ন্ত্রকদের কাছে তারাই গণ্য আর অন্যরা অগুনতি সংখ্যা।

কিন্তু তার পরও এই ঢাকার অধিবাসীদের বেশির ভাগই যে একটা তাদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন নগরে টিকে থাকে, সেটাই অবিশ্বাস্য। এটাই বোধ হয় ঢাকার জাদু। তবে তা একটা শূন্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা জাদু। চিন্তা করুন, এই নগরীর অধিবাসীদের কর্মক্ষমতা, টিকে থাকার শক্তি, কল্পনাশক্তি—এগুলো যদি তার পক্ষে ব্যবহার করা হতো তার বিপক্ষে না ব্যবহার করে, তাহলে এই নগর কী হতে পারত! আমি মনে করি, বেশির ভাগের ওপর ভর করেই ঢাকাকে বেশির ভাগের জন্য উপযোগী নগরীতে পরিণত করা যেত। তার পরও ঢাকা। তার পরও নভেম্বর মাস এলেই ছটফট করতে থাকি ঢাকা যাওয়ার জন্য। রাস্তার ভাপা, চিতই পিঠা। বন্ধুদের সঙ্গে সজীব আড্ডা। এ বছর আসা হচ্ছে না বলে মন কাঁদছে।

লেখক : ফিনল্যান্ডের গবেষক।

বাংলার দুর্ভিক্ষের ইতিহাসের ওপর পিএইচডি করছেন



মন্তব্য