kalerkantho


আমরা ক্রমেই নিজেদের বন্দি করে ফেলছি!

জনপ্রিয় অভিনেত্রী অহনা। এই ঢাকায়ই তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ঢাকার যাপিত জীবনের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। লিখেছেন মীর রাকিব হাসান

৩১ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



আমরা ক্রমেই নিজেদের বন্দি করে ফেলছি!

এ সময়ের অন্যতম দর্শকপ্রিয় অভিনেত্রী অহনা। তাঁকে নিয়ে কিছু ভুল তথ্যও রয়েছে! বরিশাল ও নোয়াখালীর মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করে পেয়েছেন বেশ জনপ্রিয়তা। সেসব অঞ্চলের ভাষায় তিনি এতটাই সাবলীল যে অনেকেই তাঁকে সেসব অঞ্চলের মানুষ মনে করে ভুল করেন। বাস্তবিক তেমনটা নয়। মূলত তিনি ঢাকার মেয়ে। ঢাকার মিরপুরে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা করেছেন মিরপুর গার্লস হাই স্কুল ও কমার্স কলেজে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আসলে বলতে পারেন এটা এক দিক থেকে আমার জন্য সুখেরও। কারণ আমার চরিত্রগুলো মানুষের কাছে বাস্তবিকভাবে এতটাই ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি যে মানুষ আমাকে সেসব অঞ্চলের ভাবে। একটা সময় যেমন আমরা মনে করতাম সিনেমার খল চরিত্রে অভিনয় করা রিনা খানরা মনে হয় বাস্তবেই এমন শয়তান; কিন্তু তা নয়। আমার ক্ষেত্রেও এমন কিছু হয়েছে; বিশেষ করে আমার ‘নোয়াখালী বনাম বরিশাল’ সিরিয়ালটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়। যেখানে আমি বরিশালের মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করি। যেটা আমাকে অনেক বেশি জনপ্রিয়তা দিয়েছে।’’

শৈশবের দিনগুলোর কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার জন্ম মিরপুরে। সে সময়ে মিরপুরের প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশটা ছিল গ্রামীণ আবহাওয়ার মতো, যা বিশেষ করে গত দুই দশকের মধ্যে অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। এই যে সবুজের জন্য আমাদের হাহাকার। যাকে আমরা সচেতনভাবেই গলা টিপে হত্যা করেছি। এই সবুজটা কিন্তু ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মিরপুরেই ছিল। আমরা খোলামেলা পরিবেশে বড় হয়েছি, যা এখনকার মিরপুর দেখে কল্পনাই করা যায় না। লোকে লোকারণ্য, জ্যাম, যানজট—ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট। পানির অভাব, গ্যাসের অভাব, পর্যাপ্ত খোলা স্থান ও খেলার মাঠের অভাব তো রয়েছেই। আর এগুলো আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার জন্য সবচেয়ে বড় অন্তরায়। দেখবেন মুষলধারে বৃষ্টি হলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিছুটা জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হলেও মিরপুর এলাকায় জলাবদ্ধতা অনেক বেশি দেখা যায়। এ সময়ে মানুষ কাজে বের হলে ব্যাপক দুর্ভোগে পড়তে হয়, বিশেষ করে মিরপুরের কাজীপাড়া-শেওড়াপাড়া এলাকায় সৃষ্টি হয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার; যা মিরপুরবাসীর জন্য একটি বড় দুঃখ। আবার ফুটপাত দিয়েও চলাচল করা যায় না। ফুটপাতগুলো হকারদের দখলে অথবা নানা ধরনের অবৈধ দখলদারদের কবলে।’

শৈশবের মিরপুরের আর কী বিশেষত্ব ছিল? ‘না। তখন তো এত ঘিঞ্জি ভবন ছিল না। পানি জমতো না। তখন অনেকটা খোলামেলা পরিবেশ ছিল। আমাদের মিরপুরে কিন্তু এমনিতে অনেক কিছু আছে; বিশেষ করে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে রয়েছে—ক্রিকেট স্টেডিয়াম, চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেনের মতো জায়গা। শৈশবে আমরা সময় পেলেই মা-বাবার সঙ্গে সেসব জায়গায় চলে যেতাম। দেখতাম অনেকে দূর-দূরান্ত থেকে এসব জায়গা দর্শনে এসেছে। আমাদের মনে হতো এটা তো আমাদের বাড়ি; কিন্তু এসব দর্শনীয় স্থানও যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে আকর্ষণীয় থাকছে না। নিরাপদ পরিবেশ না থাকায় এখন এসব জায়গায় অনেকে যেতে চান না।’

মিরপুর নিয়ে অনেক কথা হলো। ঢাকার অন্যান্য জায়গা নিয়ে কী বলবেন? ‘মিরপুরের পর আমার সবচেয়ে বেশি সময় কাটে উত্তরায়। কারণ উত্তরায়ই আমাদের সবচেয়ে বেশি শুটিং হয়। উত্তরাও মিরপুরের মতো আমূল পাল্টে যাচ্ছে। খোলামেলা উত্তরাও এখন জ্যামে জর্জরিত। ফুটপাতগুলো বেদখলে। ক্রমেই পুরো রাজধানীর নাগরিক সুবিধাগুলো কমছে। পরিবর্তন তো হবেই, এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতাটা ক্রমাবনতির—না উন্নতির, এটাই বড় বিষয়। একসময় আমরা রাস্তায় খেলাধুলা করতাম, ছোটাছুটি করতাম। সেই পরিবেশটা ছিল। এখনকার ছেলে-মেয়েরা তো সেটা পাচ্ছে না। এখন আসলে শিশুরাও যেমন বন্দি, বড়রাও তেমনি বন্দি। টেলিভিশন নামক একটা বোকা বাক্সে বন্দি হয়ে পড়েছি। ছেলে-মেয়েদের অতিরিক্ত শিক্ষার চাপ, সেই চাপ সামলে একটু ফুরসতের জন্য, খেলাধুলার নিরাপদ কোনো পরিবেশ পাচ্ছে না। ফলে বাসায়ই বন্দি হয়ে সেলফোন, কম্পিউটার অথবা টেলিভিশনের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। আবার মা-বাবাও অফিস-বাসার ঝক্কি-ঝামেলা সামলে নিজের ও সন্তানের জন্য অবকাশ পাচ্ছেন না। সব মিলিয়ে এই ‘অত্যাধুনিক’ সময়টাই যেন এক বন্দি সময়। রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে নিজেদের অসচেতনতায় একটি বসবাসের অনুপোযোগী শহর হিসেবে গড়ে তুলেছি ঢাকাকে। ক্রমেই আমরা নিজেরাই নিজেদের বন্দি করে ফেলছি! এখন নিজেকে ছাড়া আর কাউকে নিয়ে ভাবার সময় নেই। আমার ভালো থাকতে হবে। এটাই যেন বড় কথা!



মন্তব্য