kalerkantho


খোঁজ

ছায়ানীড়ে মমতার ছায়া

৩১ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



ছায়ানীড়ে মমতার ছায়া

লুৎফুন্নাহার হোসেন নিলু, অধ্যক্ষ, ছায়ানীড় প্রি-স্কুল ও শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র

১৯৮৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে প্রতিষ্ঠিত হয় ছায়ানীড় প্রি-স্কুল ও শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক কিংবা অন্যান্য পদে কর্মরত মায়েদের কথা ভেবেই যাত্রা শুরু হয় প্রতিষ্ঠানটির। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত নয় এমন অভিভাবকরাও এখানে তাদের শিশুদের ভর্তি করাতে পারেন। অভিভাবকরা সকালে বাচ্চা এখানে রেখে নিশ্চিন্তে ক্লাস কিংবা অফিসে যান। ফেরার পথে আবার বাচ্চা নিয়ে ফেরেন। লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভেতরে ঢুকে হাতের বাঁ দিকে যেতেই শিশুদের হৈ-হুল্লোড় শোনা গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট ছোট শিশু আসবে কোত্থকে? তা-ও আবার একেবারে ক্লাসরুমের ভেতরে! একটু যেন খটকা লাগল মনে। ভুলটা ভাঙল কয়েক কদম সামনে গিয়ে। প্রায় ৪০ জনের মতো ছেলে-মেয়ে। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে মনের আনন্দে খেলছে তারা। একজন শিক্ষক তাদের দেখিয়ে দিচ্ছেন কিভাবে কী করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছায়ানীড় প্রি-স্কুল ও শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের দৃশ্য এটি। প্রতিষ্ঠানটির প্রিন্সিপাল লুৎফুন্নাহার হোসেন নিলু। বললেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র ও প্রি-স্কুল এটি। অভিভাবকদের অনুপস্থিতিতে বাচ্চাকে দেখভাল ও খেলার ছলে ওদের পাঠদানের জন্যই গড়ে উঠেছে ‘ছায়ানীড়’। এখানে খেলার ছলে শিখছে শিশুরা। গল্প, ছড়া, ছবি আঁকা, বর্ণ পরিচয় এবং ছবি দেখিয়ে হাতের লেখা—কোনোটিই বাদ যাচ্ছে না।” খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ১৯৮৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইআর) ছায়ানীড় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন আইআরের অধ্যাপক ও রোকেয়া হলের তৎকালীন প্রাধ্যক্ষ ড. নুরুন্নাহার ফয়জুননেসা। ছায়ানীড়ের বর্তমান পরিচালক শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আব্দুল হালিম। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুদান ও শিক্ষার্থীদের বেতনের টাকায় এর কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। 

প্রিন্সিপাল লুৎফুন্নাহার হোসেন নিলু বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক কিংবা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত মায়েদের কথা ভেবেই প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু। অভিভাবকরা বাচ্চাকে সকালে এখানে রেখে নিশ্চিন্তে ক্লাস কিংবা অফিসে যান। ফেরার পথে আবার বাচ্চাকে নিয়ে ফেরেন। এখানে দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি খেলাধুলা, আঁকা, গান শেখানো হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা এখানে একা নিঃসঙ্গ বোধ করে না। অন্য বাচ্চার সঙ্গে সারা দিন হাসি-খেলা, দুষ্টুমি আর পড়াশোনা করে দিন কাটে তাদের। এতে শিশুদের সামাজিকীকরণটা দ্রুত হয়।’ ছায়ানীড়ে বর্তমানে ৫০টি শিশুর যত্ন নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষক মোট চারজন। এর মধ্যে তিনজন পূর্ণকালীন এবং একজন খণ্ডকালীন। শিক্ষকদের একজন জাহানারা সালেহ। তিনি বললেন, ‘শিক্ষকরা মায়ের মতোই শিশুদের দেখভাল করেন। সপ্তাহের প্রতি রবি থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে শুক্র, শনিবার ও বিশ্ববিদ্যালয় ছুটির দিনে ছায়ানীড় বন্ধ থাকে। অভিভাবকরা চাইলে স্কুল চলাকালে যেকোনো সময় শিশুদের দিয়ে অথবা নিয়ে যেতে পারেন। শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে স্কুলে অবস্থানকালে অভিভাবকদের দেওয়া খাবারই শিশুদের খাওয়ানো হয়।’

 

খেলার ছলে লেখাপড়া

বই আর বর্ণিল উপকরণগুলো বলে দেয়, ছায়ানীড়ের পড়ার পুরোটাই হয় আনন্দের মাধ্যমে। শিক্ষকদের একজন জাহানারা সালেহ বলেন, ‘সোনামণিদের খেলাচ্ছলে শেখানোর চেষ্টা করি। শেখানোর কাজে ব্লক, কালার চার্ট, কাঠিসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হয়।’ শ্রেণিকক্ষের চেহারাও বর্ণিল। দেয়ালজোড়া ফুল, পাখি, লতা-পাতা আর কার্টুন ওদের দারুণ আকৃষ্ট করে। খোলামেলা পরিবেশও বাচ্চাদের সহজ হতে সাহায্য করে। ‘শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার উপযোগী করে গড়ে তুলি আমরা। কত রকমের খেলনা, দেয়ালজোড়া কার্টুন, ছবি আর অবশ্যই নতুন বন্ধু—সব মিলিয়ে বেশ মজার অভিজ্ঞতা। বাড়ির বাইরে একটা ছোট্ট নিজস্ব জগৎ, যেখানে মা-বাবা নেই ঠিকই, কিন্তু আছে উষ্ণতার ছোঁয়া। শুধু কিছু বর্ণমালা আর রং চিনিয়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ নয়; বরং ছোট শিশুদের সামাজিকীকরণের কাজটা করে থাকে ছায়ানীড়।’ বলছিলেন লুৎফুন্নাহার হোসেন নিলু। তিনি আরো বললেন, ‘শিশুর বিকাশ পর্বের গোড়ায় কাজ করে ছায়ানীড়। নিজে নিজে খাওয়া, জুতা পরা, ব্যাগ গুছিয়ে রাখা, মানুষের সঙ্গে কথা বলা, কাকে কী সম্বোধন করতে হবে, সেই শিক্ষাটা পর্যন্ত দেওয়া হয় এখানে। আমাদের এখানে সন্তান পাঠিয়ে অনেকটাই নিশ্চিন্তে থাকেন অভিভাবকরা। এখানে প্লে ও নার্সারি—এই দুই গ্রুপে ভাগ করে শিশুদের পড়ানো হয়।’ মকবুলা মনজুর বলেন, ‘শেখানোর মাধ্যম হিসেবে কবিতা, গল্প, ছড়া ও নানা ধরনের উপকরণ ব্যবহার করি। প্লে গ্রুপ পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক কোনো পড়াশোনা নেই। নেই কোনো বই। শুধু গল্প, ছড়া, কবিতা, গান ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের বস্তুর আকার ও রং চেনানো হয়। আঁকাআঁকি শেখানো হয়। নার্সারি পর্যায়ে তাদের হাতে-কলমে শেখানোর চেষ্টা চলে। শেখানো হয় পুরোপুরি খেলার মাধ্যমে। প্রতি মাসে কী পড়ানো হবে, তার একটা পরিকল্পনা থাকে। আনন্দদায়ক পরিবেশ পায় বলে এখানে আসার জন্য উদগ্রীব থাকে শিশুরা। একঘেয়েমি কাটানোর জন্য পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে খেলাধুলা চলে। খেলাধুলার সময় ওদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে দেওয়া হয়। প্রতি দলে একজন করে দলনেতা থাকে। এতে ওদের মধ্যে নেতৃত্বের দক্ষতা ও দলগত বন্ধন তৈরি হয়। খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি ম্যানারও শেখানো হয়।’

 

সমস্যাও আছে

নানা সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি ছায়ানীড়ে কিছু সমস্যাও আছে। বর্তমানে বড় একটি কক্ষকে তিনটি ভাগে ভাগ করে বিভিন্ন বয়সী শিশুদের রাখা হচ্ছে। তা ছাড়া এতগুলো বাচ্চার জন্য টয়লেটও মাত্র একটি। এ প্রসঙ্গে জাহানারা সালেহ বলেন, ‘এটি সত্যি, আমাদের পরিসরটা আরেকটু বড় হলে ভালো হতো। টয়লেট ও কক্ষ বরাদ্দের জন্য বহু দেনদরবার করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে লিখিত আকারেও জানানো হয়েছে; কিন্তু এখন পর্যন্ত আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি।’ 

 

ভর্তিপ্রক্রিয়া

এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের, বিশেষ করে কর্মজীবী মায়েদের সন্তানদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত নয় এমন অভিভাবকরাও শিশুদের ভর্তি করাতে পারেন। তাঁদের জন্য ২০ শতাংশ আসন বরাদ্দ থাকে। আড়াই থেকে পাঁচ বছর বয়সী বাচ্চারাই ছায়ানীড়ে ভর্তির সুযোগ পায়। শিশুর মাতা-পিতা দুজনকেই চাকরিজীবী হতে হবে। প্রতিবছর জানুয়ারিতে চলে ভর্তি কার্যক্রম। তবে আসন খালি থাকা সাপেক্ষে অভিভাবকরা চাইলে বছরের যেকোনো সময়ই ভর্তি করাতে পারেন। নির্দিষ্ট ফরমের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। আবেদন ফরম ৫০০ টাকা। ভর্তি ফি ১৫০০ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের শিশুদের জন্য মাসিক বেতন ১৫০০ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের শিশুদের জন্য মাসিক বেতন ৩০০০ টাকা। শিশুর পাসপোর্ট সাইজের দুই কপি ছবি আর জন্মনিবন্ধন সনদের কপি দেওয়া লাগে। শিশুদের সুতি পোশাক পরিধান করতে হয়। প্রত্যেক শিশুর সঙ্গে অতিরিক্ত পোশাক সরবরাহ করতে বলা হয়। এ ছাড়া ব্যাগ, রুমাল, রং বক্স, ড্রয়িং খাতা, প্রয়োজনীয় খাবার, পানি ইত্যাদি দিতে হয়। নার্সারির শিশুদের জন্য বুকলিস্ট ছায়ানীড় থেকে দেওয়া হয়। লিস্ট অনুযায়ী শিক্ষা উপকরণ কিনতে হয়। কোনো কারণে শিশুদের নাম প্রত্যাহারের প্রয়োজন হলে অন্তত ১৫ দিন আগে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হয়। এ ছাড়া যে মাসে প্রত্যাহার করা হবে, সে মাসের বেতন পরিশোধ করা লাগে। অভিভাবকরা যেকোনো সময় বাচ্চাদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন।



মন্তব্য