kalerkantho


পোশাকের শিল্পী শারমিন মোস্তাফি

২৪ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



পোশাকের শিল্পী শারমিন মোস্তাফি

‘লামিয়া ফ্যাশন’-এর স্বত্বাধিকারী শারমিন মোস্তাফি কনি। পুরোদস্তুর সংসারী হয়েও একজন সফল উদ্যোক্তা। মসলিন শাড়িসহ নিজের আউটলেটে গড়ে তুলেছেন পোশাকের বিশাল সমারোহ। নিজেই ডিজাইন ও বিপণন করেন। গত আট বছরের ব্যাবসায়িক জীবনে অনেক সুনামও অর্জন করেছেন। তাঁর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প শোনাচ্ছেন কবীর আলমগীর

 

শারমিন মোস্তাফি কনি পড়ালেখা করেছেন পটুয়াখালীর একটি কলেজ থেকে। এরপর মাস্টার্স করেছেন বরিশালের ব্রজমোহন কলেজের দর্শন বিভাগ থেকে। লেখাপড়া শেষ করে একসময় চাকরিও করতেন; কিন্তু পরিবার সামলাতে গিয়ে ছাড়তে হয় চাকরি। এর পর শুরু করলেন উদ্যোক্তা জীবন। নিজের উদ্যোক্তা হওয়ার স্মৃতি উল্লেখ করতে গিয়ে শারমিন বলেন, ‘চাকরিটা করার ইচ্ছা ছিল কিন্তু করতে পারিনি; বিশেষ করে সে সময়ে আমার স্বামী দেশের বাইরে ছিলেন। আমিও তাঁর সঙ্গে বেশ কয়েক বছর ছিলাম। এ ছাড়া পরিবারকেও সময় দেওয়ার ব্যাপার ছিল। সব মিলিয়ে চাকরিটা করতে পারিনি।’

কিভাবে ব্যবসা শুরু জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে ক্রিয়েটিভ কিছু করার ইচ্ছা ছিল। ঝোঁক ছিল নিজস্ব কিছু করার, স্বাবলম্বী হওয়ার। অস্ট্রেলিয়ায় শাওন নামে আমার এক বন্ধু থাকে। আমার ব্যবহৃত পোশাক দেখে আগ্রহ দেখায়—আমি যেন তাকে ওই রকম ডিজাইনের পোশাক বানিয়ে দিই। ওই সময় সে আমাকে প্রায় ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিল। সেই টাকা দিয়ে বেশ কিছু পোশাক বানাই এবং তাদের পার্সেল করে পাঠিয়ে দিই। তারা পোশাক দেখে খুবই পছন্দ করে। যেটা আমার কাছে অনেক বড় অনুপ্রেরণা ছিল। ভাবলাম বাহ! আমি তো পোশাকের ব্যবসাটাই করতে পারি।’

শারমিন মোস্তাফি কনির ব্যবসার বয়স আট বছর। উত্তরার আলাউদ্দিন টাওয়ারে শোরুম নিয়েছেন বছর দুয়েক হলো। ‘দেশের বাইরেও যাচ্ছে আমার পোশাক। অস্ট্রেলিয়া, লন্ডনেও আমার ক্রেতা রয়েছে। তাঁদের এই নিত্যনতুন চাহিদাই আমাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে’ বলেন এই উদ্যোক্তা। ব্যবসাটি কনির নিছক ব্যবসা নয়, এখানে কর্মসংস্থান হয়েছে বেশ কয়েকজনের। কনির ফ্যাক্টরিতে কাজ করছেন ৮-১০ জন কর্মী। যাঁরা ক্রেতাদের চাহিদামতো পোশাক সরবরাহ করতে কনিকে সহায়তা করেন। তবে এ ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর অভাব রয়েছে বলে মনে করেন এই নারী উদ্যোক্তা। তিনি বলেন, ‘এ খাতে কাজ জানা লোক পাওয়া খুব দুষ্কর। আবার দক্ষ যাঁরা আছেন, তাঁদের পারিশ্রমিক অনেক বেশি। আর পারিশ্রমিক বেশি হওয়ায় প্রডাকশন খরচও বেশি পড়ে যায়; যা ব্যবসা প্রসারের ক্ষেত্রে এক ধরনের বাধা। তবে এ ক্ষেত্রে এক্সট্রা-অর্ডিনারি ডিজাইন ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে সংকট কাটানোর চেষ্টা করি। পোশাকের বিশেষ নকশা বা অত্যাধুনিকতা ও তুলনামূলক কম মূল্যের মাধ্যমে ক্রেতার চাহিদা ধরে রাখতে হয়। আর এ ব্যাপারে অবশ্যই ব্যবসায়ীর দক্ষতা থাকতে হবে। ব্যবসা করার জন্য প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কারণ নিজে আগে দক্ষতা অর্জন করা জরুরি।’ এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘আমি বিজিএমআই থেকে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে কোর্স করেছি। এ ছাড়া এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে বিজনেস ম্যানেজমেন্টে কোর্স করেছি। এমব্র্রয়ডারি কোর্সও করেছি। এখনকার সময়ে আপনার শুধু অনেক পুঁজি থাকলেই হবে না, তা বিনিয়োগের দক্ষতা দেখাতে হবে। নয় তো লোকসান গুনতে হতে পারে। সে জন্য ব্যবসার ধরন অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করা যেতে পারে।’

এবার কথা হয় ব্যবসার ধরন সম্পর্কে। শারমিন জানান, তাঁর এখানে নারীদের ক্যাজুয়াল পোশাকের পাশাপাশি রয়েছে মসলিনের বিশাল কালেকশন। ফ্যাব্রিক কিনে তার ওপর মোটিভ অনুযায়ী ডিজাইন করেন শারমিন। ফ্যাব্রিক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান দোয়েল, ঊষা, সপুরা থেকে এগুলো সংগ্রহ করেন তিনি। ডিজাইনে পছন্দের মোটিভ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জ্যামিতিক মোটিভ আমার পছন্দের। কারণ অন্যান্য মোটিভের চেয়ে জ্যামিতিক মোটিভ আনকমন। এটি সহজেই ক্রেতাদের পছন্দ হয়।’

সময় শুধু ব্যবসার জন্য নয়, পরিবারের জন্যও বরাদ্দ রাখতে হয়—উল্লেখ করে এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘‘আমার মেয়ে শ্রেয়ানা হাবিবা ইংরেজি মাধ্যমের একটি স্কুলে ‘এ লেভেল’ পড়ছে। আর ছেলে সিয়ান আহবাব খান ক্লাস এইটে পড়ছে।’’ শারমিন আরো বলেন, ‘আমি একজন উদ্যোক্তার পাশাপাশি আমার আরেকটি পরিচয় হলো আমি একজন মা। সুতরাং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মতো সংসারটাকেও আগলে রাখি, ছেলে-মেয়েদের সময় দিতে হয়।’ তবে এগিয়ে চলার পথ এতটা সহজ ছিল বলে মনে করেন না শারমিন মোস্তাফি কনি। তিনি বলেন, ‘৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে সরকারিভাবে আমি দুটি প্লট পেয়েছিলাম। ব্যবসার প্রয়োজনে একটি প্লট বিক্রি করি চার লাখ টাকায়। ওই টাকা দিয়েই ব্যবসা শুরু করি।’

উত্তরার পাশাপাশি বনানীতে আরেকটি শোরুম নেওয়ার চিন্তা করছেন তিনি। কনি বলেন, ‘ব্যবসার যে অবস্থা তাতে আমি খুশি। নিজের অবস্থান থেকে নিজে ভালো আছি। উত্তরার শোরুমে আমি সময় দিই, দোকানে লোক রাখা আছে, তারাও বসে। চিন্তা আছে বনানী এলাকায় একটি আউটলেট দেওয়ার। সেটা খুব তাড়াতাড়ি দিতে চাই।’

শুধু একজন উদ্যোক্তা হিসেবে নয়, শারমিন মোস্তাফি কনির পরিচিতি রয়েছে বেতারের একজন উপস্থাপক হিসেবেও। ২০০৬ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী। জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘উত্তরণ’সহ উপস্থাপন করছেন একাধিক অনুষ্ঠান। এ ছাড়া তিনি সংবাদ পাঠও করেন। নিজের ব্যবসার পাশাপাশি এই কাজটি জোগায় মনের খোরাক। বাংলাদেশ বেতারের কাজ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই কাজটি শিল্পের খোরাক। আমি এতে আনন্দ পাই। এ ছাড়া বাংলাদেশ বেতারের মতো কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পাওয়া সৌভাগ্যের বিষয়।’ বাংলাদেশ বেতারের ৭৫তম বার্ষিকী উদ্‌যাপন অনুষ্ঠানে ১০০টির মতো শাড়ির ডিজাইন করেছিলেন তিনি, তা উল্লেখ করে শারমিন মোস্তাফি কনি বলেন, ‘বাংলাদেশ বেতারে পোশাক ডিজাইনের কাজটি আমি পেয়েছিলাম। এই কাজটি ছিল আনন্দের। এখানেও বেশ প্রশংসা পেয়েছি।’

একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে উদ্যোক্তাদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব উইমেন এন্টারপ্রেনারের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কনি। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি নারী উদ্যোক্তাদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। নারী নেত্রী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। উদ্যোক্তা হিসেবে নারীদের প্রতিষ্ঠা পেতে হলে নানা রকম সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে যেতে হয়। খারাপ সময় আসবে, তা একসময় থাকবে না। বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ করতে পারলে আর কোনো সমস্যা দেখা দেবে না।’

তবে নারীর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পথে আর্থিক জোগান নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। শারমিন বলেন, ‘আমাদের মতো উদ্যোক্তাদের কোথাও ঋণ পাওয়া যায় না। ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলেও নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। পরিবার থেকেও অনেক সময় আর্থিক সহায়তা পাওয়া যায় না। নারী উদ্যোক্তার জন্য আর্থিক সহযোগিতার পথ সুগম করা গেলে নারীরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে।’ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে শারমিন মোস্তাফি কনি বলেন, ‘আমি চাই, আমার এখানে অনেক বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হোক। এ ছাড়া দেশের বাইরে একটি আউটলেট করতে চাই। যার মাধ্যমে আমি চাই, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আমার এই উদ্যোগ পা রাখুক আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও।’



মন্তব্য