kalerkantho


চাইলেই কি বন্ধ হবে ঢাকার লেগুনা?

কবীর আলমগীর   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



চাইলেই কি বন্ধ হবে ঢাকার লেগুনা?

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে সম্প্রতি ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, রাজধানীর ভেতরে কোনো লেগুনা চলাচল করতে পারবে না। বলা হয়েছে, ‘এটি সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।’ তবে যাত্রী ও লেগুনাচালকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ঢাকায় গণপরিবহনের সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেক কর্মজীবী লেগুনায় যাতায়াতের ওপর নির্ভরশীল। লেগুনা চলাচল বন্ধ হলে ভোগান্তিতে পড়বে নগরের অনেক মানুষ।

লেগুনা চালক-মালিক সমিতি বলছে, ঢাকায় ১৫৯টি রুটে লেগুনা চলাচলের রুট পারমিট দিয়েছে বিআরটিএ। এসব রুটে পাঁচ হাজার হিউম্যান হলারের অনুমোদন আছে। মূলত পরিবেশদূষণকারী টেম্পো রাজধানীতে নিষিদ্ধ করার পর এসব লেগুনা ও হিউম্যান হলারের অনুমোদন দেওয়া হয়।

কাগজ-কলমে পাঁচ হাজার লেগুনা থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবতা হলো, ঢাকার বিভিন্ন রুটে অন্তত ১৫ হাজার লেগুনা চলাচল করে। পুরনো এ লেগুনাগুলোর বেশির ভাগেরই নেই কাগজপত্র। এমনকি ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই অনেক চালকের। কোনো কাগজপত্র না থাকলেও পুলিশ ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অবৈধ লেগুনাগুলো দিনের পর দিন চলছে এবং অবৈধ লেগুনার পেছনে হাত রয়েছে প্রভাবশালীদের। গত ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার (ডিএমপি) আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, ‘সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার কারণ লেগুনা। তাই এখন থেকে শহরের কোথাও এই গাড়িগুলো চলতে দেওয়া হবে না। এত দিন যেসব লেগুনা চলছে, তার কোনো রুট পারমিট নেই। সব অবৈধভাবে চলছে, কারো কোনো অনুমতি নেই।’

পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিআরটিএ অনুমোদিত এ পরিবহনটি কোনো পরিকল্পনা ছাড়া হঠাৎ করে বন্ধ করে দেওয়া আইনসিদ্ধ হবে না। অপর দিকে বিআরটিএ বলছে, ডিএমপি কমিশনার কিসের ভিত্তিতে এমন ঘোষণা দিয়েছেন, তা তারা জানেন না। বিষয়টি তাদের জানা নেই।

ডিএমপির এমন ঘোষণার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অটোরিকশা-অটোটেম্পো পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘লেগুনার কারণে ঢাকায় দুর্ঘটনা ঘটেছে বা বিশৃঙ্খলা হয়েছে, এর নজির অনেক কম। ঢাকা শহরে চলাচলরত লেগুনা (হিউম্যান হলার) কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই বন্ধের বিষয়ে ডিএমপি কমিশনারের ফরমান জারি আইনসংগত নয়। এভাবে চাইলেই তো লেগুনা চলাচল বন্ধ করে দেওয়া যায় না।’

বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে, পরিবেশদূষণের কারণে ২০০২ সালে তিন চাকা অটোটেম্পো ঢাকা মহানগর থেকে উচ্ছেদ করা হয়। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পরিবেশবান্ধব লেগুনা (হিউম্যান হলার) চলাচলের অনুমোদন দেওয়া হয়। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় পাঁচ হাজার ১৫৬টি হিউম্যান হলারের রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। ঢাকা শহরে আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি (আরটিসি) প্রায় ১৫৯টি রুটে এসব গাড়ি চলছে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার লেগুনা চলাচল করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চলে ফার্মগেট থেকে মোহাম্মদপুর, জিগাতলা ও নীলক্ষেত, গাবতলী থেকে মহাখালী, উত্তরার হাউস বিল্ডিং থেকে দিয়াবাড়ী, গুলিস্তান থেকে চকবাজার, লালবাগ, নীলক্ষেত ও বাসাবো, জুরাইন থেকে গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী থেকে তাঁতীবাজার, পোস্তগোলা থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, মতিঝিল থেকে মুগদা, কারওয়ান বাজার থেকে রামপুরা ও ডেমরা থেকে যাত্রাবাড়ী এলাকায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হিউম্যান হলার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. গোলাম ফারুক বলেন, ‘বিআরটিএ লেগুনাগুলোর চলার পারমিশন দিয়েছে। নির্ধারিত রুটেই এগুলো চলাচল করে। পারমিশন থাকার পরও এগুলো চলাচল করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া যুক্তিসংগত নয়।’

কথা হয় জুরাইন এলাকায় কর্মরত একজন ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘জুরাইন টু গুলিস্তান সড়কে প্রায় ৭০০ লেগুনা চলাচল করে। আগে এসব গাড়ির ৯০ শতাংশের কাগজপত্র ছিল না। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর ট্রাফিক সপ্তাহ চালায় পুলিশ। ওই অভিযানের পর ৫০ শতাংশ গাড়ির কাগজপত্র তারা ঠিক করেছে। আগে ৭০ শতাংশ লেগুনাচালকের লাইসেন্স ছিল না। এখন সেটি ৪০ শতাংশে নেমেছে।’ কিভাবে চলে এসব লেগুনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ট্রাফিকের ডিসি থেকে শুরু করে এসি, টিআই, সার্জেন্ট—সবাইকে ম্যানেজ করেই লেগুনাগুলো চলাচল করে।’ একই অভিযোগ রয়েছে কারওয়ান বাজার থেকে রামপুরা রোডে চলাচলকারী লেগুনাগুলোর ক্ষেত্রেও। এ রোডে চলাচলকারী ৯০ শতাংশ গাড়ির কাগজপত্র নেই।

কারওয়ান বাজারে মোস্তাফিজুর রহমান নামে একজন লাইনম্যান বলেন, ‘কারওয়ান বাজার কিচেন মার্কেটের সভাপতি লোকমান হোসেন এ এলাকার লেগুনাগুলো চলাচলে দেনদরবার করেন। লেগুনাপ্রতি তাঁর লাইনম্যানের কাছে জমা দিতে হয় ৪০০ টাকা। এরপর সেই টাকা বিভিন্ন জায়গায় ভাগাভাগি হয়।’ এ বিষয়ে লোকমান হোসেন বলেন, ‘কারওয়ান বাজার এলাকার লেগুনাগুলো আমি দেখাশোনা করি। যদিও আমার নিজের কোনো লেগুনা নেই। লেগুনা থেকে যে টাকা আয় হয়, তা নানা জায়গায় ভাগাভাগি হয়।’ লেগুনার পেছনে রয়েছে প্রভাবশালীদের ইন্ধন। লেগুনা থেকে বিরাট উপার্জন ভাগাভাগি হয় নানা স্তরে। চাইলেই কি রাজধানী থেকে এসব লেগুনা বন্ধ করা সম্ভব? এমন প্রশ্নের উত্তরে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মীর রেজাউল আলম বলেন, ‘ডিএমপির সব ডিসি-এসিকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো অবস্থায়ই লেগুনা চলাচল করতে দেওয়া হবে না। আশা করি, অবিলম্বে সব রুটে লেগুনা চলাচল বন্ধ করা সম্ভব হবে।’ এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘আমরা শক্তভাবে বিষয়টি দেখছি। লেগুনা কে চালায়, কার রাজনৈতিক পরিচয় কী, সেটি দেখার বিষয় নয়। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্যই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোনোভাবেই লেগুনা চলতে দেওয়া হবে না।’

 



মন্তব্য