kalerkantho


বাতিঘর

যিনি পাগলের বন্ধু

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



যিনি পাগলের বন্ধু

হাঁটতে, চলতে-ফিরতে কত পাগলই তো আমরা রাস্তায় দেখি। তাকে নিয়ে ভাবা তো দূরের কথা, অনেকে দ্বিতীয়বার তাকাতেই সংকোচ বোধ করি। অথচ একবারও ভাবি না, সে-ও একজন মানুষ। তার প্রতি কি এ সমাজের কোনো দায়িত্ব নেই? আমাদের কাছে হয়তো বা নেই; কিন্তু সমাজের দু-একজন মানুষ আছেন, যাঁরা এদের নিয়েও ভাবেন। তাঁদেরই একজন ব্যাংকার শামীম আহমেদ। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন মুহাম্মদ শরীফ হোসেন

 

ব্যাংকার শামীম আহমেদ। যিনি পাগল এনে চিকিৎসা করান এবং তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনে স্বজনদের হাতে তুলে দেন। এ পর্যন্ত আটজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছেন। যাদের ছয়জনই এরই মধ্যে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। পাঁচজনকে পরিবারের হাতেও তুলে দিতে পেরেছেন। যদিও তাদের পরিবার খুঁজে বের করতেও তাঁকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। শুরুটা কিভাবে হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে শামীম আহমেদ বলেন, ‘২০১৪ সালে অফিস সহকর্মীদের সঙ্গে বান্দরবান ঘুরতে গিয়েছিলাম। সেখানে থানচি বাজারে ঘুরতে ঘুরতেই চোখে পড়ল গাছের নিচে বসে থাকা চুলে জটবাঁধা এক পাগলির। নোংরা ও ছিন্ন জামা-কাপড়ে তার অসহায়ত্ব আমাকে কেন যেন পীড়া দিতে লাগল। ঢাকায় ফিরে এলেও ভুলতে পারিনি মেয়েটির কথা। কী করা যায় ভাবছিলাম, পরামর্শ করলাম ভাই, অফিস সহকর্মী, বন্ধু-বান্ধব ও কিছু আত্মীয়ের সঙ্গে। প্রথম দিকে কেউ কেউ আমার এই বিষয়টাকে পাগলামি বলছিল। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, যেভাবেই হোক থানচির সেই পাগলি মেয়েটাকে সাহায্য করব। সর্বপ্রথম সমর্থন পাই আমার স্ত্রী আফরিন জাহানের। পরবর্তী সময় আমার সঙ্গে সহযোগিতার হাত বাড়ালেন আমার অফিস সহকর্মী আলী সাব্বির। ঠিক করি, মেয়েটিকে ঢাকায় এনে চিকিৎসা করাব। ফলে আর দেরি না করে ঢাকা থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করে বান্দরবান ছুটে যাই। সঙ্গী আলী সাব্বির ও আলী সাব্বিরের বন্ধু ফরহাদ। প্রশাসন ও স্থানীয়দের সহায়তায় নানা প্রক্রিয়া শেষে মেয়েটিকে উদ্ধার করে ঢাকায় শেরেবাংলানগরে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করাই। মেয়েটির নাম জানা নাই বিধায় হাসপাতালে ভর্তির সময় বাধ্যবাধকতার কারণে আমি মেয়েটির নাম রাখি অন্তর।

হাসপাতালে তাকে সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করার জন্য আমরা জরিনা বেগম নামে একজন বয়স্ক মহিলাকে বেতনভিত্তিক নিয়োগ দিই। এক মাসের বেশি হাসপাতালে চিকিৎসার পর অন্তরকে আদাবরে আমার বাসার বিপরীতে জরিনা বেগমের বাসায় রাখি। সেখানে জরিনা বেগম তার সার্বিক দেখাশোনা করে। পাশাপাশি আমি ও আমার পরিবার মেয়েটির দেখভাল শুরু করি। কিছুদিন পর  আরেকটু সুস্থ হয়ে মেয়েটি কিছু তথ্য দিতে শুরু করে। জানায়, তার বাড়ি চান্দুরা বাজার ডাকবাংলো। সেই সূত্রেই খোঁজ নিয়ে আমরা নিশ্চিত হলাম, তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। তারপর বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে পোস্টারিং করে ও নানাভাবে খোঁজ নিয়ে একপর্যায়ে বিজয়নগর ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে আমরা মেয়েটির ঠিকানা বের করতে সক্ষম হই। তার নাম শিউলি রানী সরকার। বয়স ২৫ বছর। সরাইল উপজেলার শাহজাদপুর ইউনিয়নের দাউরিয়া গ্রামের সতীর্থ সরকারের মেয়ে। এই শিউলি পাঁচ বছর আগে স্বামী ফালান সরকার, ছেলে সাগর, হৃদয় ও মেয়ে লিপির কাছ থেকে হারিয়ে যায়। এরপর আমার অনুরোধে মেয়েটির পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় এসে তাকে শনাক্ত করে। পরবর্তী সময় সরাইল উপজেলা মিলনায়তনে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মেয়েটিকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে শিউলি রানী সরকারকে একটি সেলাই মেশিন, নগদ টাকা ও সোনার নাকফুল উপহার দিই। আমাদের উদ্ধার করা মানসিক ভারসাম্যহীন প্রত্যেকের ঘটনাগুলো কমবেশি এমনই।’

তিনি আরো বলেন, ‘এরপর রাজধানীর পল্টন মোড় থেকে আদুরী, মানিকগঞ্জ থেকে পারুলী, সিলেটের নবীগঞ্জ থেকে রানী, ফরিদপুর থেকে কহিনূর, মাদারীপুরের শিবচর থেকে বহুল আলোচিত পাগলি মা সালমাকে উদ্ধার করি। দুই মাস আগে নড়াইল থেকে চুমকি এবং সর্বশেষ গত মাসে রাজধানীর শনির আখড়া থেকে একজন গর্ভবতী পাগলিকে উদ্ধার করি। এ নারীর চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে আহছানিয়া মিশন। বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সন্তানসম্ভাবনা এ পাগলিকে চিকিৎসা করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এর মধ্যে মাদারীপুরের শিবচর থেকে নিয়ে আসা সালমার পরিবারকে ব্রাহ্মণবাডিয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলার তালশহরে খুঁজে পাওয়া গেলেও পরিবারের কেউ তাকে নিতে রাজি না হওয়ায় আমাদের উদ্যোগে তাকে একটি বৃদ্ধাশ্রমে দেওয়া হয়েছে।’

চিকিৎসা ব্যয় প্রসঙ্গে শামীম আহমেদ বলেন, ‘একেকজনকে চিকিৎসা করতে মোট ব্যয় হয় আনুমানিক ৭০-৮০ হাজার টাকা। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে রোগীর শারীরিক, মানসিক ও বিভিন্ন রকম রোগের কারণে টাকার পরিমাণটা অনেক গুণ বেড়ে যায়। প্রাথমিক অবস্থায় খরচ আমিই বহন করেছি। তবে প্রথম থেকেই বেশ কিছু প্রজেক্টে আমাকে সাহায্য করেছেন আমার সহকর্মী ও বন্ধু আলী সাব্বির। পরবর্তী সময় আমাদের মানবিক কাজগুলো দেখে উৎসাহী হয়ে বেশ কয়েকটি প্রজেক্টে আমার অফিস সহকর্মী শফিকুল ইসলাম, আরো কিছু সহকর্মীসহ বেশ কয়েকজন ফেসবুক বন্ধু সদিচ্ছায় সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন। আশার বিষয় হচ্ছে, এদের চিকিৎসায় মানুষ আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে। যেমন নড়াইল থেকে আমাদের উদ্ধার করা চুমকির খরচের দায়িত্ব নিয়েছে ‘হৃদয়ে নড়াইল’ নামে একটি সংগঠন। এ ছাড়া শনির আখড়া থেকে উদ্ধার করা গর্ভবতী মায়ের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে আহছানিয়া মিশন। আশা করছি, সামনে আরো অনেকেই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবেন। এ কাজটি আমি মনেপ্রাণে ধারণ করি। আমি আজীবন এ কাজটি করে যেতে চাই। সে কারণেই দীর্ঘদিন ধরে একটি মানসিক হাসপাতাল গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছি। যেখানে রাস্তায় পড়ে থাকা মানসিক ভারসাম্যহীনদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা করা হবে। তাদের পুনর্বাসনেরও ব্যবস্থা করা হবে। যদিও এটি আমার একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। এনজিও থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এগিয়ে এলে একটি হাসপাতাল করা খুব বেশি দুরূহ হবে না বলে আমি মনে করি। এ লক্ষ্যে আমরা একটি ফাউন্ডেশন বা ট্রাস্ট করতে চাই। যার অধীনে একটি তহবিল গঠন করে হাসপাতাল গড়ার কাজে এগিয়ে যাব। বর্তমানে আমরা Helping Hands BD নামে একটি ফেসবুক পেজ খুলে প্রচারণা চালাচ্ছি। এ নামেই ট্রাস্ট করার ইচ্ছা আছে। তা ছাড়া যোগাযোগের জন্য ই-মেইল আইডি helphandsbd@gmail.com.

তিনি আরো বলেন, ‘এ কাজে কিছু বাধা-বিপত্তিও আছে। যেমন কাউকে রাস্তা থেকে তুলে আনতে গেলে স্থানীয় মানুষ অনেক সময় সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে। নানা প্রশ্ন করে। যদিও এ কাজে আমরা প্রশাসনের পরিপূর্ণ সহায়তা পেয়েছি। এর পাশাপাশি মানসিক হাসপাতালও আমাদের অবারিত সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতাল থেকে একজন রোগীকে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ সুস্থ করে রিলিজ  দেওয়া হয়। এরপর তাকে সেবা দেয় আমাদের নিয়োগকৃত জরিনা বেগম। তিনিই একের পর এক মানসিক ভারসাম্যহীনকে মায়ের সেবা দিয়ে সারিয়ে তুলছেন। বর্তমানে নড়াইলের চুমকিকে নিয়ে জরিনা বেগম তাঁর গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইলে আছেন। চুমকি এখন অনেকটা সুস্থ, আরেকটু সেবা ও কাউন্সেলিং পেলে সে-ও পুরোপুরি সেরে উঠবে। এভাবে যখন একজন পুরোপুরি সেরে ওঠে, তখন এবার তার বাড়িঘরের খোঁজ শুরু করি এবং তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিই। তাদের ঠিকানা খুঁজতে গিয়েও আমাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। যদিও এর মধ্যেই আমরা অনেক পরিতৃপ্তি লাভ করি। বিশেষ করে একজন মানসিক ভারসাম্যহীনকে সুস্থ করে যখন তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারি, তখন কী যে আনন্দ পাই, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। হারানো মানুষটি যখন তার স্বজনদের সাক্ষাৎ পায়, তখন তাদের চোখের অশ্রু যেন আমাদেরও আবেগাপ্লুত করে দেয়। এ অশ্রু যে কত আনন্দের, তা বলে বোঝানো যায় না।’ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান শামীম আহমেদ যমুনা ব্যাংকের ঢাকা হেড অফিসে আছেন। তিনি আইসিটি ডিভিশনে ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মানসিক ভারসাম্যহীনদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার এমন মহৎ উদ্যোগের জন্য তিনি পেয়েছেন নানা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি ও সম্মাননা স্মারক। স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তান নিয়ে বর্তমানে তিনি ঢাকার আদাবরে বসবাস করছেন। তিনি জানান, ‘মানবিক ও সামাজিক কাজগুলো সরকারের একার নয়। সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এই কাজে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা সবাই এগিয়ে এলে আর একজন মানসিক ভারসাম্যহীনও রাস্তায় পড়ে থাকবে না।’

 

রাজধানীর পল্টন থেকে উদ্ধার করা মানসিক ভারসাম্যহীন আদুরি


 

বান্দরবান থেকে উদ্ধার করা অন্তরকে নিয়ে হাসপাতালে শামীম আহমেদ


 

সুস্থ হওয়ার পর আদুরিকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে

 



মন্তব্য