kalerkantho


‘প্রতিটি বাধাই এগিয়ে যাওয়ার একেকটি ধাপ’

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



‘প্রতিটি বাধাই এগিয়ে যাওয়ার একেকটি ধাপ’

‘কইন্যা’র স্বত্বাধিকারী তাসমিনা তাবাসউম নিশাত। শুরুটা ছিল ছাত্র অবস্থায়, যখন স্বপ্ন আর সাহসই ছিল একমাত্র পুঁজি। তাইতো মাত্র এক হাজার ২০০ টাকায় শুরু করেন ব্যবসা। গুটি গুটি পায়ে বাড়িয়েছেন ব্যবসার পরিধি, করেছেন অনেকের কর্মসংস্থানও। তাঁর সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প শুনেছেন ফরিদা শেলী

 

আমাদের দেশে একজন নারীকে পথ চলতে হলে সেই পথটা মোটেই মসৃণ থাকে না। শত বাধা হয়ে তাকে তার জায়গা করে নিতে হয়। আমি যদি আমার শুরুর গল্পটা বলতে চাই, তাহলে বলতে হবে, গল্পটা দুই বন্ধুর গল্প। আমি আর আমার বন্ধু আল মাহমুদ বাধন। যখন আমরা শিক্ষার্থী, তখন থেকেই নিজেদের কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিল। সেটি পড়াশোনা করার পাশাপাশি কিছুটা আমাদের মনে খোরাক জোগাবে, আবার কিছুটা পকেটের। দুই বন্ধুর একসঙ্গে কিছু করার ইচ্ছা থেকে জন্ম নেয় দ্বৈত। দুইয়ে মিলে দ্বৈত।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দিনগুলোতে, স্বপ্ন আর সাহসই ছিল আমাদের একমাত্র পুঁজি। এই বয়সের একটা সুবিধা আছে, যা ইচ্ছা হঠাৎ করেই শুরু করা যায়, দুশ্চিন্তা, দোটানা কম কাজ করে। এই সুবিধাটা আমরা পুরোপুরি নিয়েছি। মোট এক হাজার ২০০ টাকার বিনিয়োগে আমাদের কাজের শুরু। সেটি ছিল ২০১৪ সাল। লেইস আর কাপড় কিনেছিলাম এক হাজার টাকায়, আর ২০০ টাকা মজুরি দিয়ে আমাদের বানানো প্রথম খাদি জমিন আর কাতান আঁচলের শাড়িটি হাতে পাই আমরা। এরপর ছবি তুলে পেজে আপলোড করি। এক বন্ধু কিনে নেয় সঙ্গে সঙ্গে, এই টাকা থেকে আমরা পরের সপ্তাহেই দুটি শাড়ি বানিয়েছিলাম। সে দুটি শাড়ি এক বড় ভাই তাঁর বিয়ে উপলক্ষে কিনে নিয়েছিলেন। সেই টাকায় আমরা করেছিলাম পাঁচটি শাড়ি। এভাবেই শুরু হয়, আর বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের কল্যাণে আমাদের আরম্ভটা অনেকটাই সহজ হয়েছিল। একেবারে শুরুর দিকে পরিচিতরাই ক্রেতা ছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে পরিচিত গণ্ডি পেরিয়ে কাজের পরিসর বাড়তে থাকে।

পড়াশোনা যখন শেষের দিকে, তখন আমাদের কাজের পরিধি অনেকটাই বেড়েছে। চারপাশ থেকে বন্ধু ও ক্রেতাদের উৎসাহে আমরা আরো সাহসী হই এবং সিদ্ধান্ত নিই, ব্যবসাটাই করব। এক বন্ধুর উৎসাহে এরই মধ্যে আমরা গয়না বানানো শুরু করেছি। সে সময় আমরা বিভিন্ন দেশের কয়েন (মুদ্রা) সংগ্রহ করে, সেগুলো দিয়ে গয়না তৈরি করতাম। গয়না তৈরির শুরুর সময়ই গয়নাগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অর্ডার আসতে শুরু করে। কাছাকাছি সময়ে আমরা দেশি তাঁতের কাপড় নিয়েও কাজ শুরু করি। আর দেশি তাঁত নিয়ে কাজ করতে গিয়েই ‘কইন্যা’র জন্ম ২০১৫ সালে। শুরু থেকেই আমাদের চেষ্টা ছিল আমাদের প্রচলিত ধারার কাপড়কেই একটু ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার। সে চেষ্টা আমরা করেছি এবং বেশির ভাগ সফলও হয়েছি। এটা ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেই আমরা বুঝতে পারি।

কাজ করার ক্ষেত্রে সব সময় আমরা লোকজ বিষয়, মোটিফগুলোকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছি। আর এ বিষয়টিই হয়তো আমাদের কিছুটা আলাদা করেছে। কাজটা শুরু করেছিলাম আমরা দুই বন্ধু মিলে, এখন আমরা স্বামী-স্ত্রী। শুরু থেকেই আমরা দুজন দুজনকে কাজের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সহায়তা করার চেষ্টা করেছি। এ ছাড়া বন্ধুদের এবং ক্রেতাবন্ধুদের উৎসাহই মূলত কাজটাকে বেশি এগিয়ে নিয়ে গেছে। আর একজনের কথা বলতেই হবে, তিনি আমার মা। আমার মা একেবারে শুরু থেকেই আমার কাজে ভীষণ উৎসাহ জুগিয়েছেন। বাড়িতে বুটিকের কাজ একসময় আমার মা-ও করতেন। তিনি হয়তো তাঁর স্বপ্ন আমার মধ্য দিয়ে পূরণ করার কোনো আশা শুরুতেই খুঁজে পেয়েছিলেন। পরে বাসার সবাই যখন কাজের অগ্রগতি দেখেছে, দেখেছে আমাদের কাজের পরিসর বাড়ছে, তখন সাহস দিয়েছে যার যার জায়গা থেকেই।

প্রতিটি কাজেরই ধারাবাহিকতা আছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কাজের ক্ষেত্র অথবা জায়গার ওপর ভিত্তি করেই একটা ধারাবাহিক অগ্রগতি তৈরি হয়। আর এটাই বোধ হয় কাজের ধর্ম। আমরা শুরু করেছিলাম দুজন মিলে, এখন একজন, দুজন করে বাড়তে বাড়তে ১১ জন পার্মানেন্ট কর্মীর প্রতিষ্ঠান এটি। উৎসবগুলোর সময় কর্মীসংখ্যা বেড়ে ১৫-১৬ জনও হয়ে থাকে। ধারাবাহিকভাবেই এই প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি হচ্ছে। আর কাজের ক্ষেত্রে শুরুতে মূলত শাড়ি নিয়ে কাজ করলেও এখন আমরা তৈরি পোশাকও তৈরি করছি দৈনন্দিন ব্যহারের জন্য। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে ব্যাগ এবং গৃহস্থালির অন্যান্য নান্দনিক পণ্য। কাজের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আরো অন্যান্য ক্ষেত্রও আশা করি আমাদের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে তৈরি হবে অল্পদিনের মধ্যে।

উদ্যোক্তা নারী নয়, আমি নিজেকে উদ্যোক্তাই ভাবতে পছন্দ করি। যদিও শব্দটির অনেক ওজন এবং শব্দটি ধারণ করার ক্ষমতা আমার এখনো হয়নি। তবুও ভাবতে ক্ষতি কী? স্বপ্ন তো সেটাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে আমরা অনেক দুশ্চিন্তা করেছি, নিজেদের কাজের ক্ষেত্র কী হবে, তা নিয়ে। সেটি পছন্দমতো হবে তো? টিকে থাকতে পারব তো? দুশ্চিন্তাগুলোর অবসান ঘটিয়ে আমাদের সেই এক হাজার ২০০ টাকা চার বছরে ১১ জন মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। বিনিয়োগের দিক থেকে এই এক হাজার ২০০ টাকাই আমাদের একমাত্র বিনিয়োগ, সেটি বৃদ্ধি করেই আমাদের বর্তমান কলেবর। এখন এই বৃদ্ধির গতি বৃদ্ধি করাটাই শুধু কাজ এবং আমাদের পুরো নজর এখন সেখানেই।

কাজ করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হতে হয় প্রায় প্রতিদিনই। কারণ প্রতিদিনই আমরা নতুন কিছু না কিছু করছি। প্রতিদিনই শিখতে হচ্ছে আমাদের। সেটি কাঁচামাল কেনা থেকে শুরু করে উৎপাদন হয়ে সেলসের যে চক্র, তার পুরোটায়ই। আর কাজের ক্ষেত্রে শুরুর দিকে একটা সমস্যা খুবই বোধ করেছি, সেটি দক্ষ কর্মীর অভাব। নিজেদের চেষ্টায়, নিজেদের মতো একটি দলও আমরা এর মধ্যে তৈরি করে ফেলেছি, যার ফলে এ সমস্যাটাও অনেকটাই উতরে গিয়েছি। তাই বাধাটাকে আমরা বাধা হিসেবে দেখি না একেবারেই। বরং প্রতিটি বাধাই এগিয়ে যাওয়ার একেকটি ধাপ, যাকে অতিক্রম করলেই কাজ পরের ধাপে এগিয়ে যায় এবং এই অতিক্রম করাতে আনন্দও আছে।

‘কইন্যা’র শাড়ি

 



মন্তব্য