kalerkantho


নিউ মার্কেট এলাকা আবারও হকারদের দখলে

জাহিদ সাদেক   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



নিউ মার্কেট এলাকা আবারও হকারদের দখলে

নিউ মার্কেট এলাকায় গাউছিয়ার সামনে ফুটপাত ও মূল সড়ক দখল করে হকাররা পসরা নিয়ে বসেছে

ঢাকার নিউ মার্কেট, চাঁদনী চক, গাউছিয়া, চন্দ্রিমা মার্কেট, হকার্স মার্কেট এলাকায় সারা বছরই লেগে থাকে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়।  এই ভিড়ে সবচেয়ে বেশি বাদ সাধে প্রায় পাঁচ হাজার হকার। হকারের দখলে থাকে ফুটপাত, মূল সড়কসহ ফুট ওভারব্রিজও। এসব দূর করতে বিভিন্ন সময় পুলিশের উচ্ছেদ অভিযান চললেও কার্যত তা স্থায়ী হচ্ছে না।

রবিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হকাররা সায়েন্স ল্যাব থেকে নীলক্ষেত মোড় পর্যন্ত উভয় পাশের ফুটপাত ও মূল সড়কের অর্ধেক দখলে রেখে ব্যবসা করছে। আবার কোথাও ফুটপাতের ওপর মূল দোকানের সামনেই ব্যবসা করছে ব্যবসায়ীরাও। এলাকার বহুল ব্যবহৃত ফুট ওভারব্রিজ দুটিতেও হকারের কারণে চলাচল করতে পারছে না পথচারীরা। দেখা যায়, নীলক্ষেত রোড, নিউ মার্কেট-পিলখানা রোড, মিরপুর রোড ও আশপাশের এলাকার প্রায় সব ফুটপাতে বসেছে অসংখ্য হকার। কোথাও ফাঁকা জায়গা নেই। পথচারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারছে না। গাউছিয়া মার্কেট ও চাঁদনী চকের সামনে দোকান বসিয়ে, দাঁড়িয়ে হাঁকডাক ছেড়ে পণ্য কেনার জন্য ডাকছে হকাররা। এতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে সাধারণ লোকজন। বিশেষ করে শিশু ও মহিলারা বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। নিউ মার্কেট-পিলখানা রোডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের’ ছাত্রী কান্তা রায়হান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিদিন নীলক্ষেতের রাস্তা ব্যবহার করতে হয়। যানজটের কারণে দ্বিগুণ রিকশাভাড়া দিয়েও বেশির ভাগ সময় সময়মতো ক্লাসে পৌঁছতে পারি না। হাঁটারও উপায় নেই। বছরের পর বছর ধরে এগুলো চলছে। এসব দেখভালের জন্য যে কেউ আছে, তা মনেই হয় না।’

নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘এর আগেও পুলিশ ও সিটি করপোরেশন বেশ কয়েকবার হকারদের উচ্ছেদ করেছিল; কিন্তু কোনো ফল হয়নি। হকাররা ফুটপাতসহ মূল সড়কেও দোকান দিয়ে বসেছে। ফলে সারা দিন মূল সড়কে জ্যাম লেগেই থাকে। এ কারণে ক্রেতারা এখন এদিকে আসতে ভয় পায়। অতিরিক্ত ভাড়ায়ও রিকশাওয়ালারা এদিকে আসতে চায় না।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছর কয়েক দিন ধরে মাইকিং করে নিউ মার্কেটের সামনের এলাকায় কোনো হকার না বসার আহ্বান জানানো হয়েছিল। পরে গত বছরের ২৬ এপ্রিল অভিযানে নিউ মার্কেট এক নম্বর গেট থেকে শুরু করে ঢাকা কলেজের গেট এবং ঢাকা কলেজের উল্টো পাশ থেকে শুরু করে নীলক্ষেত মোড় পর্যন্ত এলাকার ফুটপাতের অবৈধ দোকানপাট তুলে দেওয়া হয় এবং নিউ মার্কেটের ফুটপাত থেকে শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। গত প্রায় এক বছর তেমন হকার ছিল না নিউ মার্কেট এলাকায়। কিন্তু আবারও আগের অবস্থা ফিরে এসেছে। নিউ মার্কেটের সামনের অংশে সানগ্লাস বিক্রেতা হকার মোতালেব বলেন, ‘আমার এই ব্যবসার ওপর পরিবার চলে। যদি ব্যবসা করতে না পারি, তো পরিবার চলবে কিভাবে? আমরা তো এখানে বসতাম না, হকারদের নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় বসতে বাধ্য হচ্ছি। সরকার আমাদের জায়গা করে দিলেই আমরা চলে যাব।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিউ মার্কেট ও নীলক্ষেত এলাকায় রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এসব হকারের কাছ থেকে ব্যবসা আর নেতার সঙ্গে খাতির অনুযায়ী প্রত্যেক হকারের কাছ থেকে প্রতিদিন ১০০ থেকে ৩৫০ টাকা চাঁদা তোলা হয়। এই চাঁদার ভাগ পুলিশও পায়। রফিক নামের একজন লাইনম্যান নিউ মার্কেট এলাকার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করেন বলে জানায় হকাররা।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ হকার্স লীগ সদস্য ও হকার্স পুনর্বাসনের সভাপতি এম এ কাশেম বলেন, ‘এরই মধ্যে আমরা ছয়টি দাবির কথা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছে জানিয়েছি। প্রত্যেক হকারের ছবিযুক্ত তালিকা তৈরি ও আইডি কার্ড প্রদান এবং পরিচয় বহনকারীদের নামে ব্যবসা উপযোগী স্থানে দোকান বরাদ্দ দিতে হবে এবং তা বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত হকারদের ফুটপাত থেকে উচ্ছেদ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।’

এদিকে বেশ কয়েকজন হকারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় কিছু লাইনম্যানের নাম। যারা তাদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে থাকে। এদের মধ্যে নীলক্ষেতসংলগ্ন ফুটপাতে শাহীন ও শহীদ; সায়েন্স ল্যাব পর্যন্ত ফুটপাতগুলোয় মো. রফিক, ইসমাইল, মজনু বাচ্চু, আকবর ও আলম; গাউছিয়া মার্কেটের সামনে ইব্রাহিম (ইবু) ও তাঁর সহযোগী হোসেন, তাহের, মোর্শেদ, সিরাজ ও মুসা মিয়া; নিউ মার্কেটের পূর্ব পাশে আবদুস সাত্তার মোল্লা ও শাহাদাৎ; নিউ সুপার মার্কেটের পাশে আবদুল জলিল, নিউ মার্কেটের ওভারব্রিজের ওপর খোকন, কালাম; বলাকা সিনেমা হল ও মার্কেটের সামনের ফুটপাতে মাইনুল, আমিনুল ও সেলিম। এঁরা সবাই সরকারদলীয় কর্মী ও ১৮ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনারের নামে টাকা তুলে থাকেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হকারদের কাছ থেকে ‘তোলা’র টাকা পুলিশের পকেটে যায় এমন কথার বিরোধিতা করে নিউ মার্কেট থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে অনেক সময় এসব ফুটপাত হকারদের কাছে ইজারা দেওয়া হয়। তা ছাড়া আমরা সব সময়ই সচেষ্ট থাকি এসব ফুটপাত অবৈধ দখলের ব্যাপারে।’ বিষয়টি নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার জসীম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এগুলো নিয়ে অনেকবার সিটি করপোরেশনের সঙ্গে মিলে উচ্ছেদ করেছি। কিন্তু এক দিক থেকে উঠিয়ে দিলে অন্য দিকে আবার বসে যায়। এদের জায়গা না দেওয়ায় এমনটা হচ্ছে।’ বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল বলেন, ‘আমরা কখনোই ফুটপাত ইজারা দিই না। হকার উচ্ছেদের অভিযান অব্যাহত আছে।’

 



মন্তব্য