kalerkantho


পার্কিং সিন্ডিকেটের দখলে কারওয়ান বাজারের অলিগলি

রাতিব রিয়ান   

৮ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



পার্কিং সিন্ডিকেটের দখলে কারওয়ান বাজারের অলিগলি

কারওয়ান বাজার প্রধান সড়কের বাঁ দিকে যেসব সংযোগ সড়ক বাজারের সঙ্গে মিশেছে, এর একটিও ফাঁকা থাকে না দিনের শুরু থেকে মধ্যরাত অবধি। পণ্য পরিবহন ও লোকজনের যাতায়াত সহজ করতে এসব সড়ক ব্যবহার হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে হচ্ছে উল্টো। দিনের ব্যস্ততম সময়ে পেট্রোবাংলা থেকে এরশাদ বিল্ডিং ও টিসিবি মোড় থেকে কয়লাপট্টি পর্যন্ত বাজারের প্রধান সড়কসহ সব কয়টি রাস্তা ও ফুটপাত চলে যায় পার্কিং সিন্ডিকেটের দখলে।

সুষ্ঠু পার্কিংয়ের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি থেকে ১০টি পয়েন্ট ইজারা নেওয়া হলেও সংযোগ সড়কের বিভিন্ন জায়গায় পার্কিং বাণিজ্য শুরু করেছে ইজারাদাররা। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের নিয়ম-নীতি মানা হচ্ছে না। রাস্তায় যেখানে-সেখানে পার্কিং করার ফলে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে কারওয়ান বাজারের সাধারণ মানুষ। বছরের পর বছর নিয়মহীন পার্কি চালু থাকলেও সেদিকে নজর নেই ট্রাফিক পুলিশ কিংবা সিটি করপোরেশনের।

কারওয়ান বাজারে বাংলাদেশের অন্যতম পাইকারি বাজারের পাশাপাশি রয়েছে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অফিস। রয়েছে ব্যাংক-বীমা, স্বায়ত্তশাসিত অফিস। এ ছাড়া রয়েছে বেশ কিছু সংবাদপত্র ও বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশনের কার্যালয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অফিস-কার্যালয় থাকলেও এগুলোর বেশির ভাগেরই নেই নিজস্ব পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। এই সুযোগে ইত্তেফাক গলি, ওয়াসা রোড, চকিগলি, কামার রোডসহ কারওয়ান বাজারের সব রাস্তা দখল করে চলছে অবাধে পার্কিং। এসব রাস্তায় প্রতিদিন শত শত গাড়ি পার্ক করে রাখা হয়।

কারওয়ান বাজারে নিয়মিত বাজার করতে আসেন পূর্ব রাজাবাজারের বাসিন্দা হোসেন শহীদ মজনু। তিনি বলেন, ‘দু-এক দিন পর পরই এই বাজারে আসি। একবারে বেশি করে বাজার করে নিয়ে যাই। কিন্তু রাস্তায় ছোট ছোট গাড়ি, প্রাইভেট কার পার্কিং থাকায় আমাদের চলাচলে অসুবিধা হয়।’ হানিফ নামে অপর একজন প্রাইভেট কারচালক বলেন, ‘আমাদের স্যার এখানকার ব্যাংকে চাকরি করেন। তাই গাড়ি কারওয়ান বাজারের মসজিদের সামনে পার্ক করে রাখি। পার্কিং বাবদ ৩০ টাকা করে দেওয়ার কথা; কিন্তু সেখানে আমাদের কাছ থেকে ৪০ টাকা নেওয়া হয়। কখনো ১০০ টাকাও নেওয়া হয়।’

কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ বাজারে প্রতিদিন অন্তত পাঁচ হাজার পাইকারের আনাগোনা রয়েছে। পণ্য কেনা, পরিবহনে লোড করা, ভ্যান গাড়িতে পণ্য নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই গুনতে হচ্ছে নির্দিষ্ট পরিমাণের চাঁদা। পণ্য কিনে ট্রাকে লোড করার জন্য একটি স্থানে সেগুলো রাখার জন্যও দিতে হয় টাকা। চাঁদাবাজরা বেশ কয়েকটি খাত বের করে সেখান থেকে নিয়ম করে চাঁদা আদায় করছে। চাঁদা আদায়ের সুবিধার্থে সরকারি দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পদও বাগিয়ে নিয়েছে তারা। চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করলে দিতে হয় চরম মাসুল।

প্রতিদিন কারওয়ান বাজারে আসা ট্রাকপ্রতি চাঁদা তোলা হয় ১০০ থেকে ৩০০ টাকা। এ ছাড়া পণ্য লোড-আনলোড করার ভ্যানকে দিতে হয় ৫০ টাকা। শুধু পার্কিং নয়, ফুটপাতের বেশির ভাগ জায়গা দখল করে বসানো হয়েছে ভাসমান দোকান। এসব দোকানদারের কাছ থেকে নেওয়া হয় চাঁদা। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী তিন ফুট আয়তনের ভাসমান দোকানের জন্য মাসে চার হাজার ও ছয় ফুটের দোকানের জন্য মাসে ১০ হাজার টাকা ‘ভাড়া’ দিতে হয়। এ ছাড়া দোকানের জায়গা (ফুটপাত) বরাদ্দ পেতে অগ্রিম দিতে হয় অবস্থানভেদে ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত। মাসিক ভাড়া ছাড়াও প্রতি রাতে বসার জন্য এসব অস্থায়ী দোকানদারকে আরো চাঁদা দিতে হয়।

দিনের বেলা মূল চাঁদাবাজি হয় পার্কিংয়ের নামে। পার্কিংয়ের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ১০টি স্পট নির্ধারণ করে সেগুলো ইজারা দেয়। ইজারার নাম করে এসব স্পটে নির্ধারিত ৩০ টাকার পার্কিং ফি আদায়ের বদলে ইচ্ছামতো টাকা আদায় করা হচ্ছে। এ ছাড়া জনতা টাওয়ার ও ক্রিসেন্ট মার্কেটের সামনে অবস্থান করা পিকআপ থেকে ১৫০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।

স্থানীয় এক ব্যাংক কর্মকর্তা মো. সানোয়ার বলেন, ‘কারওয়ান বাজারে বেশির ভাগ ভবনে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। কারওয়ান বাজারের সড়কগুলো অনেক প্রশস্ত; কিন্তু দুদিকে গাড়ি পার্ক করে রাখায় অনেক সমস্যা হচ্ছে।’ ডিএনসিসির কারওয়ান বাজারের ইজারাদার মতি মৃধা বলেন, ‘ডিএনসিসি থেকে আমরা পুরো কারওয়ান বাজার পার্কিংয়ের জন্য ইজারা নিয়েছি। আমরা নিয়ম মেনে পার্কিং করি। কেউ যদি পার্কিংয়ের নামে কোনো বিশৃঙ্খলা করে, তবে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিই।’ পুরো দখল করা পার্কিং প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের পার্কিং এরিয়া কতটুকু হবে, তা সিটি করপোরেশন থেকে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। এ রকম কোনো নির্দেশনাও দেওয়া হয়নি। তবে আমরা ফুটপাত দখল করে রাখি না। জনসাধারণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটে—এ রকম কোনো কাজও করি না। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অন্য কেউ এগুলো করতে পারে।’

ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘যাঁরা ইজারা নিয়েছেন, তাঁদের নিয়ম মেনেই এখানে ব্যবসা করতে হবে। পার্কিং ইজারাদারদের কারণে কোনো দুর্ভোগ হলে তার দায় তো তাঁদেরই নিতে হবে। সিটি করপোরেশন থেকে পার্কিংয়ের জায়গা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। এ ছাড়া পার্কিংয়ের জন্য কত টাকা দিতে হবে, তা-ও ঠিক করে দেওয়া আছে। এখানে বেশি টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। তার পরও যদি কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসে, তাহলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

তেজগাঁও ট্রাফিক জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশ শুধু প্রধান সড়কের যানজট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। কারওয়ান বাজার সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত। এর সব সুবিধা-অসুবিধা সিটি করপোরেশনেরই দেখার কথা। তার পরও আমরা কারওয়ান বাজারের যান চলাচল পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা করি।’

 



মন্তব্য