kalerkantho


ট্রাফিকের সবুজ আলোয় লাল সংকেত!

তালহা তান   

৮ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



ট্রাফিকের সবুজ আলোয় লাল সংকেত!

চালকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ট্রাফিক পুলিশ ব্যবহার করছেন সবুজ আলোর লেজার লাইট

ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট, সড়ক বিভাজন—কোনো কিছুতেই শৃঙ্খলিত করা যাচ্ছে না রাজধানী ঢাকার যান চলাচল। বিশেষত রাত ৯টার পর যখন ভারী যানবাহন শহরে প্রবেশ করতে শুরু করে, তখন বিশৃঙ্খলা আরো বেড়ে যায়। ট্রাফিক সিগন্যাল লাইটে তোয়াক্কা করেন না চালকরা। তাই যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে ট্রাফিক পুলিশকে অবলম্বন করতে হচ্ছে নতুন নতুন পদ্ধতি।

যানজট নিরসনে এমআরটি, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বিভিন্ন সড়কে ফ্লাইওভার, আন্ডারপাস, ইউলুপ, একমুখী চলাচল ব্যবস্থা, ফুটপাতে অবৈধ দখলমুক্তকরণ, মোবাইলকোর্ট পরিচালনা, সড়ক প্রশস্তকরণ, অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল প্রতিষ্ঠার প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় তিন লাখ গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে। সেই সংখ্যা ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। ২০০৯ সালেই রাজধানীতে মোটরযানের সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখের বেশি। যান চলাচলের পর্যাপ্ত রাস্তা এবং রাখার জায়গা না থাকায় যানজট দিন দিন বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকায় প্রতি পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হচ্ছে যানবাহনের সংখ্যা। স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকল-এসইউভি (জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাসকে ব্যক্তিগত যানবাহন এবং বাস-ট্রাকসহ অন্য সব বাণিজ্যিক যানবাহন ধরে নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) মোট ২০ ধরনের যানবাহনের হিসাব সংরক্ষণ করে। দেখা গেছে, ২০০৯ সালে বিআরটিএ নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ ১৬ হাজার ৯১২টি। ২০১৪ সালে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা দাঁড়ায় দ্বিগুণ। তারা আরো মনে করে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করা ৩২টি সংস্থার ভেতরে সমন্বয়হীনতা ঢাকার যানজটের একটি বড় কারণ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গত ১৬ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে ৭১ বিধিতে জরুরি গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে নোটিশের জবাবে বলেন, ঢাকায় প্রতিদিন ৩৭১টি নতুন গাড়ি নামছে, যার বেশির ভাগই ব্যক্তিগত। আমাদের ট্রাফিক পুলিশ যানজট নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে আমরা কনসালটেন্ট নিয়োগ দিয়েছি। তাঁরাও পথ বের করতে চেষ্টা করছেন। আশা করছি শিগগিরই মহানগরী যানজটমুক্ত করা সম্ভব হবে।

রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন, শাহবাগ, কারওয়ান বাজার, মানিক মিয়া এভিনিউ, বিজয় সরণি, মোহাম্মদপুর, গাবতলী, আজমপুর ঘুরে দেখা গেছে, রাতে গাড়ি চালকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ট্রাফিক পুলিশ এবার ব্যবহার করছে সবুজ আলোর লেজার লাইট। অনেক দূর থেকে লেজার লাইট ফেলে চালককে সতর্ক করতে দেখা যায় ব্যস্ত এই মোড়গুলোতে।

তবে চিকিৎসকরা মত দিচ্ছেন, ট্রাফিকের হাতে সবুজ আলোর এই লেজার লাইট মূলত আমাদের লাল সংকেত দিচ্ছে। বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার বিভিন্ন মোড়ে বসানো হয়েছে এলইডি লার্জ স্ক্রিন মনিটর। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর সড়কের একপাশ ধরে বসানো হয়েছে ছোট ছোট এলইডি মনিটর, যা চোখের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তারা আরো বলছেন, দোকানে দোকানে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা, সাইনবোর্ডগুলোর ওপর ফ্লাড লাইট, মার্কেট, সুপার শপ, শপিং মলগুলোতে এলইডি লাইটের ব্যবহার এমনিতে নগরবাসীর শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এর ওপর ট্রাফিক পুলিশের হাতে লেজার লাইট কোনোভাবেই যথাযথ ব্যবহার বলা যাবে না।

সাঈদ খোকন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় ১০টি এলইডি বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমতি দেন। এরপর ছোট আকারের আরও ৫০০টির অনুমোদন দেওয়া হয়। এই প্রসঙ্গে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জাহিদুল এহসান মেনন বলেন, ‘লেজার লাইটের যথাযথ ব্যবহার হতে হবে। ক্লাসরুম বা সেমিনার হলে বোর্ডে লেজার লাইট ব্যবহারে কোনো ক্ষতি নেই। তবে ‘ইনঅ্যাপ্রোপ্রিয়েট ইউজ’ হলে তা ক্ষতির কারণ হতে পারে। লেজার লাইট চোখের রেটিনা, লেন্স এবং কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত করে। বয়স্ক ব্যক্তি, যাঁদের রেটিনা, লেন্স বা কর্নিয়া আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত, তাঁদের ওপর লেজার লাইটের ক্ষতিকর প্রভাব তুলনামূলক বেশি। লেজার লাইটের আলো কখনো কখনো অন্ধত্বের কারণ হতে পারে। আমরা অনেক সময় শিশুদের হাতে খেলনা হিসেবে লেজার লাইট তুলে দিই, এটা কখনোই সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। বরং বলা যেতে পারে, অভিভাবকদের সচেতনার অভাব। বিষয়টি পর্যবেক্ষণ বা কেনা-বেচা নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। তবে সচেতনতাই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট বলে আমি মনে করি।’

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মীর রেজাউল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটা সত্য নগরীর যানজট যেভাবে বেড়ে চলেছে তা নিয়ন্ত্রণ করতে আমাদের সদস্যদের বেগ পেতে হচ্ছে। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে ট্রাফিক পুলিশ বা সার্জেন্টদের কোনো ধরনের লেজার লাইট সরবরাহ করা হয়নি। কেউ যদি ব্যবহার করে থাকেন, সেটা তিনি ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করছেন।’



মন্তব্য