kalerkantho

ঢাকার অতিথি

পুলিশের ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে আন্তরিকতার অভাব রয়েছে

একাত্তরে শরণার্থী শিবিরে বাংলাদেশকে সহায়তা করে মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু হয়ে ওঠা জুলিয়ান ফ্রান্সিস তখন থেকেই থিতু হয়েছেন এই দেশে। ‘মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু সম্মাননা’ খেতাবে ভূষিত। বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর এই দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতার কথা শুনেছেন ফারহানা বহ্নি

৮ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পুলিশের ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে আন্তরিকতার অভাব রয়েছে

বাংলাদেশের প্রাণ এই দেশের নদ-নদী। এ দেশের বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কারখানা এবং সাধারণ জনগণ পরিবেশকে দূষিত করছে। ঢাকার যানজটসহ একটি নাগরিকবান্ধব ঢাকা নির্মাণে এর আশপাশের নদ-নদী সংস্কার বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে

 

সম্প্রতি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়েছেন ব্রিটিশ এই নাগরিক। বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ দেশের সঙ্গে আমার সম্পর্ক একাত্তর থেকেই। আমাকে তো আমার বন্ধুরা এখন বাংলাদেশি বিদেশি বলে সম্বোধন করেন।’ বাংলাদেশের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া খুব কঠিন। কাজের সূত্রে বাংলাদেশের সব জেলায় ভ্রমণ করেছি। তবে আমার গৃহস্থালির কাজ করতে খুব ভালো লাগে। আমি বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে ঘুরে বেড়াই, বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় সময় কাটাতে বেশ ভালো লাগে। বাংলাদেশের সব জায়গায় বৈচিত্র্য রয়েছে, কোনো জায়গাকেই আলাদা করে যাচাই করা যায় না।’

বাংলাদেশের মানুষ ও খাবারের প্রতি তাঁর অপারমুগ্ধতা। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে যেমন বিভিন্ন ধরনের মাছ পাওয়া যায়, তেমনি তার বিভিন্ন পদের রান্না হয়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে নানা ধরনের রান্না হয়। সেসব রান্না আমি খেয়েছি। অসাধারণ তার স্বাদ। শুধু রান্নাই নয়, সেসব মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান আমাকে অবাক করে। তাদের গানে গানে প্রকৃতির কথা, মানুষের জীবনের কথা উঠে আসে, যা থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি, শিখছি। বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিনই আমি কিছু না কিছু শিখি।’ তিনি বাংলাদেশের খাবার নিয়ে হেসে আরো বলেন, ‘আমি শপিং করতে পছন্দ করি না। অনেক সময় বাসার সাহায্যকারীর সঙ্গে খাবারের দোকানে তাকে সঙ্গ দিই। নতুন নতুন খাবারের নাম শুনি, শিখি অনেক কিছু।’

শুরু থেকেই বাংলাদেশে ছিলেন, বাংলাদেশের পরিবর্তন কিছু চোখে পড়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক কিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। তবে এ দেশের মানুষের আতিথেয়তার কোনো পরিবর্তন হয়নি। একজন হতদরিদ্র, ভূমিহীন মানুষের বাসায় গেলেও আপনাকে খেয়ে যেতে বলবে। এ দেশের মানুষের অতিথি আপ্যায়নের এই দিকটি যেকোনো বিদেশিকেই আকৃষ্ট করবে।’

ঢাকার ভালো-মন্দ নিয়ে বলেন, ‘এখানকার মানুষের একটি দিক আছে, ঢাকার ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করার চেষ্টা এবং নিজেদের মধ্যে সেগুলোকে ধারণ করার প্রয়াস আমার ভালো লাগে। ঢাকার মধ্যে আরো একটা জিনিস বেশি ভালো লাগে, তা হলো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। আমার মনে হয় সেখানে সবার ঘুরে আসা উচিত, বাংলাদেশের ইতিহাস সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবে। তবে ঢাকায় বিত্তশালী ও দরিদ্রদের মধ্যে পার্থক্য অনেক বেশি এবং তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে ঢাকার শিশুদের সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নেই, যা আমাকে খুবই ব্যথিত করে। ঢাকায় সবুজের খুবই অভাব। শুধু শিশু নয়, মানুষের জন্য পর্যাপ্ত সবুজ নেই এখানে।’ ঢাকার খারাপ দিকগুলো জানতে চাইলে তিনি প্রথমেই এ দেশের মানুষের অসচেতনতার কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘এ দেশের মানুষের ট্র্যাফিক আইনের প্রতি যেমন অসম্মান রয়েছে, তেমনি ট্রাফিক পুলিশের ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। এখানে মোটরসাইকেল চালকরা বিশ্বাস করেন, তাঁরা আইন থেকে ওপরে এবং লাল আলো দেখেও তাঁরা মোটরসাইকেল চালিয়ে যান। ১৯৮৩ সালের আইনে আছে মোটরসাইকেলে ড্রাইভার এবং যাত্রী উভয়েরই হেলমেট পরতে হবে; কিন্তু আমি এই আইনের প্রয়োগ খুব কম দেখেছি। এ ছাড়া যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা হয়, ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয়। যা খুবই দৃষ্টিকটু ও সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য অন্তরায়।’

বাংলাদেশের নদীর প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। কিন্তু সেই নদীর দূষণ তাঁকে অনেক কষ্ট দেয়। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রাণ এই দেশের নদ-নদী। এ দেশের বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কারখানা এবং সাধারণ জনগণ পরিবেশকে দূষিত করছে। এসব দূষণ রোধ তো দূরের কথা, তা ক্রমেই বাড়ছে; যার ফলে বন্যা ও নদীভাঙন বাড়ছে। প্রাকৃতিক নিষ্কাশনব্যবস্থা, নদী ও খালগুলো মানুষ দ্বারা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। ঢাকার যানজটসহ একটি নাগরিকবান্ধব ঢাকা নির্মাণে এর আশপাশের নদ-নদী সংস্কার বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।’ জীবনের এতটা সময় এই দেশে খরচ করেছেন তাঁর সেই অনভূতি নিয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমার যুক্তরাজ্যে এক নাতি ও ভাতিজা আছে, তাই মাঝেমধ্যে যেতে হয়। তবে এখন বাংলাদেশই আমার বাড়ি। এই দেশকে আমি ভালোবাসি।’

মন্তব্য