kalerkantho

রাষ্ট্রের মেরামতি : কিশোর কারিগর

৮ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



রাষ্ট্রের মেরামতি : কিশোর কারিগর

ছবি : মঞ্জুরুল করিম

সংখ্যাল্পের সুবিধা, লুণ্ঠন আর দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতে দিতে বাংলাদেশের রাজধানীতে চালু হয়েছে ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর সড়ক ব্যবস্থাপনার রাজত্ব। এই জটিলতার মাঝে হারিয়ে গেছে নিরাপত্তা, ন্যূনতম আয়েশ, অজস্র কর্মঘণ্টা। তাই কিশোররা এই ব্যবস্থাপনার মেরামত করে। চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর জন্য তাদের কি দায়ী করবেন? ঢাকার সড়ক সুবন্দোবস্তের সবচেয়ে বড় অন্তরায়গুলো কী? এই পরিস্থিতির অবসানের উপায়ই বা কী? রাজধানীর বিরাজমান সড়ক ব্যবস্থাপনার পরিস্থিতি নিয়ে সবিস্তারে লিখেছেন ফিরোজ আহমেদ

 

দেশটার যে গুরুতর মেরামতি দরকার, কিশোররা সেটা সপ্তাহজুড়ে রাস্তায় রাস্তায় দেখিয়ে দিয়েছে। তাদের সরল ও দৃঢ় মনোভঙ্গিতে রাজপথ দখল করে নেওয়ার মধ্যে দুটি বিষয় আছে।

ক. বিদ্যমানের প্রতি অনাস্থা, ক্রোধ ও বীতশ্রদ্ধা। জমে জমে তা প্রকাশিত হয়েছে আগ্নেয়গিরির মতো। এটা ঘটনার প্রতিক্রিয়া অংশ।

খ. লুণ্ঠনের পাকেচক্রে ক্রমশ জটিল হয়ে উঠতে থাকা নগরকে সরল ও স্বাভাবিক পথে আনার, অর্থাৎ করে দেখানোর বাসনা। এটা ঘটনার মধ্যে যে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটেছে, তা।

কিশোরদের আকাঙ্ক্ষার পথ ধরে আমরা যদি আবারও ফিরে তাকাই ঢাকা শহরের পরিবহন ব্যবস্থার দিকে, সড়ক ব্যবস্থাপনার দিকে, দেখব জেনে কিংবা না জেনে বেশির ভাগ নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ যা মনে করছেন, সারবস্তুর দিক দিয়ে তার মধ্যে পার্থক্য খুব বেশি নেই। এই গভীর মিলটির কারণ হলো, এই ব্যবস্থাপনার মূলনীতিগুলো আসলে খুবই সরল হওয়ার কথা, বেশির ভাগের জন্য সুবিধাজনক হওয়ার কথা। কিন্তু সংখ্যাল্পের সুবিধা, লুণ্ঠন আর দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতে দিতে বাংলাদেশের রাজধানীতে ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর সড়ক ব্যবস্থাপনার রাজত্ব চালু হয়েছে। এই জটিলতার মাঝে হারিয়ে গেছে নিরাপত্তা, হারিয়ে গেছে ন্যূনতম আয়েশ, হারিয়ে গেছে অজস্র কর্মঘণ্টা। কিশোররা সেই ময়লা সাফ করে, জটিলতাকে এককোপে কেটে ফেলে আবারও সেই সরলতার রাজত্ব ঢাকার রাজপথে ফিরিয়ে আনার মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছে। তাদের দমন করার চেষ্টা কায়েমি স্বার্থ করে যাবে, কারণ তাদের আন্দোলনটার সূত্রপাত আপাতদৃষ্টে এক মন্ত্রীর অসুস্থপ্রায় হাসির বিরুদ্ধে হলেও এর কর্মসূচিগুলো সংখ্যাল্পের দুর্নীতি, সুবিধা আর লুণ্ঠনের ভিতটাও কাঁপিয়ে দিয়েছে। মন্ত্রীকে বিসর্জন দেওয়া তাই অত সহজ নয়; কেননা যে ব্যবস্থার তিনি প্রতিনিধি, তাকে জলাঞ্জলি দেওয়ার চাপটা তখন সামলানো আরো কঠিন হয়ে পড়বে।

২.

ঢাকায় যাঁদের গণপরিবহনে চড়তে হয়, কিংবা আর যেকোনো পরিবহনে যাঁরা রাস্তায় থাকেন, এমনকি ফুটপাথে; তাঁরা সবাই নিরাপত্তাহীনতার দিকটা খেয়াল করেছেন। চালকরা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালান। কিন্তু এই বেপরোয়া মনোভাবের জন্য তাদের কী করে দায়ী করবেন? ঢাকার চালকদের কোনো বেতন নেই, আছে ট্রিপভিত্তিক মজুরি কিংবা দৈনিক ইজারা। এভাবে মালিকরা চালকদের বাধ্য করেন নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা উসকে দিয়ে যথাসম্ভব বেশি যাত্রী তোলার এক রণক্ষেত্রে শামিল হতে। এরই ফল হলো একটি বাসের সঙ্গে আরেকটি বাসের প্রতিযোগিতা। যার ফল শুধু বাসযাত্রীদেরই নয়, মোটরসাইকেল, সাইকেলসহ অন্য গাড়ি এবং পথচারীদের ভোগ করতে হয় আহত কিংবা নিহত হয়ে। আতঙ্ক তো নৈমিত্তিক। সর্বশেষ ঘটনায়ও আমরা দেখলাম, মীম ও রাজীব পিষে গেল একই জাবালে নূর কম্পানির দুটি বাসের প্রতিযোগিতার কারণে। এই পরিস্থিতির অবসানের একমাত্র উপায় হলো ঢাকার বাসগুলোকে একটিমাত্র কিংবা রুটভিত্তিক কয়েকটি কম্পানির অধীনে আনা। একটি রুটে একটিমাত্র কম্পানির বাস চলবে, তা নিশ্চিত করা। অবিলম্বে গণপরিবহনের জন্য সড়কে আলাদা লেনের ব্যবস্থা করতে হবে। নগর পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে। রুটভিত্তিক একক কম্পানির অধীনে সব রুট ও বাস ছেড়ে দেওয়ার স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি) বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে। সব বাস মালিক হবেন এই কম্পানির অংশীদার ও বিনিয়োগকারী। বিশেষজ্ঞরা মিলে একটি শহরের জন্য প্রয়োজনীয় বাসের সংখ্যা নির্ধারণ করবেন। প্রয়োজনীয়সংখ্যক বাস আমদানি করতে হবে এবং সবই কম্পানির অধীনে চলবে। সরকারি ও বেসরকারি যৌথ মালিকানায় থাকবে এই প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিগতভাবে যে কেউ এতে বিনিয়োগ করে এর অংশীদার হতে পারবেন। প্রয়োজনে এই কাজের জন্য অভিজ্ঞ ও দক্ষ প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিয়ে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে।

কিশোরদের আন্দোলনের আরেকটি চমৎকার দিক হচ্ছে, তারা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কোনো বিষোদ্গার করেনি। বরং সরকার ও মালিকরাই চেষ্টা করেছেন শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের লেলিয়ে দিতে, এবং তাতে খুব একটা সফল হননি। তাই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় পুলিশ আর ছাত্রলীগই ছিল প্রধান ভরসা। কিন্তু মালিকরা এবং মালিকদের বেশির ভাগই সরকারি দলের সদস্য হওয়ায় শ্রমিকদের তারা প্রায়ই লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করতে সক্ষম হন। অথচ পরিবহন শ্রমিকদের প্রধান আন্দোলন হওয়ার কথা মালিকদের বিরুদ্ধে। এর থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় হলো আইনের বদলে সরকারকে বাধ্য করা; যেমন—চালকদের জন্য সুনির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করতে হবে।

পরিবহন শ্রমিকদের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি ও দুর্নীতিও বন্ধ করতে হবে। বিআরটিএতে লাইসেন্স দেওয়ার পদ্ধতি জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ করতে হবে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শাস্তি দিতে হবে। চালকসহ পরিবহন খাতের সব শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দুর্ঘটনা বন্ধ করতে শ্রমিকদের আট ঘণ্টার কর্মঘণ্টা ও যথাযথ অবসর নিশ্চিত করে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নিয়মিত তদারকি ও শাস্তির বন্দোবস্তও রাখতে হবে। বেশির ভাগ পরিবহন শ্রমিকই এই ব্যবস্থা মেনে নিতে এখনই রাজি, কেননা তাতে মালিকদের মাফিয়া রাজত্ব থেকে মুক্ত হয়ে তারা অবসর ও বেতনের নিশ্চয়তা পাবে।

ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরে শিশুদের গণপরিবহনের প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়াটাও খুবই অন্যায়, বিপজ্জনকও। তাই দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্কুল ও কলেজ বাস বাধ্যতামূলকভাবে থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা না করলে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেওয়া যাবে না। এতে শিশুদের সামাজিকতা, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং আত্মবিশ্বাস বাড়বে। অভিভাবকরাও দুশ্চিন্তামুক্ত হতে পারবেন।

ঢাকার সড়ক বন্দোবস্তের সবচেয়ে অন্যায় দিকটি হলো প্রকাশ্য চাঁদাবাজি। টার্মিনালে টার্মিনালে পুলিশ, মাস্তান ও মাফিয়াদের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। ঢাকার সড়কে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এই চাঁদার টাকা পরিশোধ করাও পরিবহন শ্রমিকদের বেপরোয়া আচরণের জন্য দায়ী। পরিবহন শ্রমিককে মালিকের টাকা, জ্বালানির টাকা এবং চাঁদাবাজের টাকা উত্তোলন করে শেষে নিজের মজুরিটুকু জোগাড় করতে হয়। এবং এই বিপুল চাঁদাবাজির আয়টা নিশ্চিত করতেই মাফিয়া গোষ্ঠী ছাত্র আন্দোলন দমন করতে এত বেপরোয়া ভূমিকা পালন করেছে।

ঢাকার গণপরিবহনের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো, কোন ব্যবস্থাপনার অভাবে ‘জোর যার মুল্লুক তার’—এই অসুস্থ নীতির রাজত্ব? গণপরিবহনে কে উঠতে পারবে? দৌড়ে যে উঠতে পারে, অন্যকে ঠেলে যে উঠতে পারে, কিংবা বেশি টাক খরচ করে যে দামি বাসে উঠতে পারে। বাকি মানুষদের, তাদের একটা বড় অংশ বৃদ্ধ, নারী, শিশু ও শারীরিকভাবে অক্ষম, দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, অপেক্ষা করতে হয়, প্রায়ই যা হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বাসে উঠতে গিয়ে হুড়াহুড়িতে দুর্ঘটনার সংখ্যা অজস্র, বলা যায় সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। শ্রদ্ধাবোধ ও সহিষ্ণুতার বদলে উত্তেজনা ও প্রতিযোগিতার বোধ আমরা রাজধানীতে দেখি, তার মনোজগৎ নির্মাণে এই পরিবহনব্যবস্থার একটা গভীর ভূমিকা আছে। একক কম্পানি এবং বাধ্যতামূলক লাইনে দাঁড়ানোর অভ্যাস কিন্তু এই আচরণে পরিবর্তন আনবে। বিশেষজ্ঞরা বসে প্রয়োজনীয় চাহিদা নির্ধারণ করবেন। সেই অনুযায়ী গাড়ি ও আসনসংখ্যা প্রয়োজনীয় অনুপাতে বৃদ্ধি করা দরকার। দরকার নারী, শিশু ও অক্ষমদের জন্য আসন বণ্টনের। এ ছাড়া গণপরিবহনে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর আইন, চালক ও সহকারীর অনুমোদন বাতিলসহ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

৩.

ঢাকা কেন জঞ্জালের নগরী? কারণ পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অভাব। ঢাকায় কেন সড়কে বিশৃঙ্খলা? কারণ পুলিশের অভাব। কিন্তু ছাত্ররা দেখিয়ে দিয়েছে, সুযোগ থাকলে, কর্তৃত্ব দেওয়া হলে তারা এই সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে রাজি। শৌখিন স্কাউট, বিএনসিসি নামের যেসব প্রাতিষ্ঠানিক স্বেচ্ছাসেবিতার চর্চা দেশে আছে, তারা কী ভূমিকা রাখছে, দেশবাসীর তা অজানা। যদিও তাদের পেছনে অর্থের খরচার কমতি নেই। বরং সত্যিকারের স্বেচ্ছাসেবার বন্দোবস্ত প্রয়োজন, যা দিয়ে এই আগ্রহী কিশোরদের সাপ্তাহিক ভিত্তিতে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করা যায় নগরবাসীর ও নগরের অনেক কিছুতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। অনুপ্রাণিত করা গেলে এই কিশোররা দায়িত্ব নিয়ে দুর্নীতিমুক্তভাবে ময়লা সাফ থেকে শুরু করে অনুমোদন পরীক্ষা—সবই করতে পারবে। দেশের সঙ্গে, নাগরিকদের সঙ্গে, নিজেদের ভালো-মন্দের সঙ্গে এভাবে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়ে তারা সক্রিয় নাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারবে। তাদের শারীরিক ও মানসিক উভয় স্বাস্থ্যেরই বিকাশ এভাবে ঘটা সম্ভব, বহু দেশে তাই এই স্বেচ্ছাসেবাকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক শিক্ষার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

এই আন্দোলনে কিশোরদের যে কর্তৃত্ব গ্রহণ করার আকাঙ্ক্ষা আমরা দেখেছি, তার মাঝে দেশের রাজনৈতিক আবহ একটা প্রেক্ষাপট হিসেবে কাজ করেছে। মানুষ যখন ভাবে তার বলার জায়গা নেই, তার কথা কেউ শুনবে না, ‘বললেই গুলি করে দেয়’, সব আন্দোলন দমন করে ফেলেছে, সংসদে যখন কোনো আলোচনা নেই জনগণের দাবি নিয়ে, তখন পরিবহনের মতো একটা নৈমিত্তিক বিষয় নিয়ে প্রাপ্তবয়স্করা বিরক্তি আর ক্ষোভ জানানোর চেয়ে বেশি আর কিছু করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। তাদের সংবেদন হারিয়ে ফেলেছিল, নিরাপত্তাহীনতা তাদের অভ্যস্ত করে ফেলেছিল পরিস্থিতির সঙ্গে। এই অভ্যস্ততায় বাদ সেধেছে কিশোররা। এটা আসলে ভবিষ্যতেরও ইঙ্গিত। দশকের পর দশক ধরে যে রাজনীতিহীন, ছাত্র সংসদহীন প্রজন্ম গড়ে উঠেছিল, তাতে একটা ঝাঁকি দিয়েছে এই আন্দোলন। রামপুরার রাস্তায় যে কিশোরকে দেখলাম তপ্তরোদে এক হাতে শিঙাড়া মুখে পুড়ছে, আরেক হাতে আঙুল তুলে গাড়িকে এক সারিতে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে—তার ইশারা না মানার দুঃসাহস কেউ দেখায়নি। যে রাজনীতির শিক্ষা তার হলো, দেশকে ভালোবাসার, দায়িত্ব নেওয়ার আকাঙ্ক্ষার যে বহিঃপ্রকাশ ঘটল, তা কিন্তু সহজে হারিয়ে যাওয়ার নয়।

৪.

যেকোনো পরিবর্তনের দুটি কার্যকর উপায় আছে। হয় তা ধীরে সংস্কার হবে, নয়তো একদিন ধাক্কায় বাতিল হয়ে পড়বে। হয় শাসকরা সংস্কার করে করে চাহিদার সঙ্গে পরিস্থিতির খাপ খাওয়াবে, নয়তো মানুষ একদিন ফুঁসে উঠে অচলায়তন ভেঙে ফেলবে। তারই একটা মীমাংসা ঢাকার রাজপথে আমরা দেখছি। সংস্কার নাকি বিপ্লব, সাধারণত নির্ভর করে শাসকেরই চরিত্রের ওপর। কখনো কখনো হয় সংস্কারের জন্য বল প্রয়োগ করতে হয়, মানুষকেই মাঠে নামতে হয় রাষ্ট্রের কাঠামোটাই ঠিকঠাক রেখে তার মেরামতির জন্য।

কিশোরদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার মিষ্টি উপদেশ দেওয়া কিছু চালাক-চতুর লোক মাঠে দেখা যাচ্ছে। বিদ্যমান পরিবহনব্যবস্থা থেকে যারা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লুট করছে, তারাও এমন আরামের বন্দোবস্ত ছেড়ে দেবে এত অল্পে, তা মনে করারও কোনো কারণ নেই। চতুররা আসলে কিন্তু এই টাকা কামানো অংশের মনের কথাটাই একটু মিষ্টি সুরে ঘুরিয়ে বলছে। কিশোররাও তা বোঝে, তাই তারা মনে করিয়ে দিয়েছে কোটা সংস্কার আন্দোলনের পরিণতির কথা। ফলে মাঠে লাঠিয়ালরাও নেমে পড়ছে, হামলা-হুমকি আর তর্জন-গর্জনে তাদের ঘরে ফেরাতে। অথচ ঢাকা এর চেয়ে নিরাপদ কখনো ছিল না। ঢাকা এর চেয়ে সুশৃঙ্খল কখনো ছিল না। এমনকি শিক্ষার্থীরা পরিবহন শ্রমিকদের ওপরও কোনো হামলা করেনি। তারা শুধু নগরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে। শ্রমিকদেরও তাই দায়িত্ব হবে জনতার কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা এই শিশুদের বিরুদ্ধে না দাঁড়ানো, বরং মালিকদের কাছ থেকে নিজেদের অধিকারগুলো বুঝে নেওয়া।

শিশুরা কি নিজেদের পড়াশোনার বারোটা বাজাচ্ছে? পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুই বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন বোসের স্মৃতিকথা পড়ে দেখবেন, তিনি ও মেঘনাদ সাহা—এঁরা গণিত আর পদার্থবিজ্ঞানের মতো বিষয়ে যে উৎকর্ষ দেখিয়েছেন, তার তাড়নাটা এসেছিল কৈশোরে ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের প্রেরণা থেকে। এই রকম একটা গভীর আলোড়ন সমাজে যে ভাবনা আর চেতনার জন্ম দেয়, যুগ যুগ ধরে তার প্রভাব টের পাওয়া যায়। নিশ্চিত থাকুন, সড়ক সংস্কার আন্দোলনের এই কিশোররা গোটা ব্যবস্থা মেরামতের কারিগর প্রজন্ম আমাদের উপহার দিতে চলেছে—কর্মে আর ভাবনায়।

 

মন্তব্য