kalerkantho


আমার রোড ফোবিয়া এখনো আছে

১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



আমার রোড ফোবিয়া এখনো আছে

পাবনার মেয়ে শাহানাজ খুশি। ২৫ বছরের মতো ঢাকায় আছেন। খুব সাধারণ মেয়ে থেকে তারকা বনে গেছেন। ঢাকার যাপিত জীবনের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। লিখেছেন মীর রাকিব হাসান

স্বাধীনপ্রিয় মানুষ শাহানাজ খুশি। তাঁর পৃথিবী বলতে স্বামী নাট্যকার ও অভিনেতা বৃন্দাবন দাস ও দুই ছেলে দিব্য জ্যোতি ও সৌম্য জ্যোতি। মঞ্চ থেকে শুরু করলেও বৈচিত্র্যময় অভিনয় কৌশল দিয়ে খুব কম সময়ই হয়েছেন টিভি নাটকের দর্শকনন্দিত অভিনেত্রী। কিভাবে ঢাকায় বসবাস জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় প্রথম আসা ইডেন কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিতে। সেটা ১৯৯৩ সালের ঘটনা। ১৯৯৪ সালের দিকে স্থায়ীভাবে থাকা শুরু করি। প্রথমে আদাবরে প্রাচ্যনাট্য থিয়েটারের এক বড় ভাইয়ের বাসায় উঠলাম। ওখানে দেড় মাস থাকার পর শহীদবাগে থিয়েটারের আরেক বড় ভাইয়ের বাসায়। সেখান থেকে শহীদবাগেই সাবলেটে একটি রুম নিই। শহীদবাগ থেকে শান্তিবাগ। বাসা পরিবর্তন হতে থাকল। এগুলোর সময়কাল খুবই অল্প। কোথাও মনঃপূত হচ্ছিল না। ওই সময় অর্থনৈতিক অবস্থাটাও তেমন ভালো ছিল না। বৃন্দাবন তখন দুই হাজার টাকার বেতনের একটি চাকরি করে। অনেক বড় কিছু করতে পারছিলাম না। আবার আত্মমর্যাদাটাও অনেক বেশি। সব পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিলাম না। শেষে শান্তিবাগে একটি বাসা পাই। ওখানে সাড়ে তিন বছর ছিলাম। ওখান থেকে কাঁঠালবাগান চলে যাই। সেখানে ছিলাম ৯ বছর। কাঁঠালবাগান থেকে নিজের বাসায়, নিউ ইস্কাটন রোডে। এখানে ১০ বছর হয়ে গেল। শুরুর দিকে তো ঢাকাকে ভীষণ ভয় লাগত। এখানে কিভাবে থাকব। রাস্তা পার হতে পারতাম না। রিকশায় উঠলেও মনে হতো এই বুঝি আমার শেষ যাত্রা। পাশ দিয়ে গাড়ি গেলেও আমার ভীষণ ভয় লাগত। আমার রোড ফোবিয়া এখনো আছে। একা রাস্তা পার হতে পারি না। তবে তখনকার ঢাকা ছিল অনেক ফাঁকা। এত ঘিঞ্জি ভবনের আধিক্য ছিল না। অনেক বেশি সবুজ ছিল। সে সময় আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। বলা চলে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করতাম। বৃন্দাবনের দুই হাজার টাকার বেতনের চাকরিতে সাবলেটে যে রুমে থাকতাম, সেখানে এক হাজার ৪০০ টাকা ঘর ভাড়া দিতে হতো। আর বাকি ৬০০ টাকার ২০০ টাকা হাতে রেখে ৪০০ টাকা একটি মুদি দোকানে দিতাম। ওই টাকা জমা দিয়ে মাসিক যত বাজার দরকার হয়, সেগুলো আনতাম। সে সময় বৃন্দাবন অফিস থেকে বের হয়ে যখন একটা স্ক্রিপ্ট টাইপ করে দিত; সেখান থেকে দু-এক শ টাকা আসত। তখন আবার দোকানের বাকি টাকা শোধ করতাম।

যখন শান্তিবাগে ছিলাম, তখন কাকরাইল থেকে শান্তিবাগে রিকশায় যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না। থিয়েটার শেষে আমরা সবার সঙ্গে বের হলেও বলতাম, আমরা একটু পরে যাব। ওদের সামনে থেকে হেঁটে রওনা দিতাম। ওরা সবাই চলে গেলে আমি আর বৃন্দাবন চামেলীবাগের  ভেতর দিয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পেছন দিয়ে হেঁটে বাসায় যেতাম। এটা ছিল আমাদের প্রতিদিনের গল্প।’

এই জীবনযাপন নিয়ে কোনো স্ক্রিপ্ট লেখার প্ল্যান আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো আমার আর বৃন্দাবনের জীবনের বাস্তবতা। ডায়েরি লিখলে যেমন মিথ্যা লেখা যায় না, তেমনি স্ক্রিপ্ট লেখার ক্ষেত্রেও তেমনটাই করতে হবে। সেখানে থিয়েটার গ্রুপ থেকে শুরু করে কাকে জড়াব আর কাকে বাদ দিব। হয়তো অনেক কথা অনেকের ভালোও লাগবে না।’

যাপিত জীবনের বর্তমানের এই ঢাকাকে কেমন লাগে জানতে চাইলে খুশি বলেন, ‘অনেক সময় বিদেশে যাই। ফিরে আসার সময় যখন এয়ারপোর্টে পা রাখি, মনটা জুড়িয়ে যায়। মনে হয় এটাই আমার আসল জায়গা। তবে এখন মনে হয় দিনকে দিন সবাই হার্টলেস হয়ে যাচ্ছে। মানুষগুলো অনেক ফর্মাল হয়ে যাচ্ছে। আমার একবার খুব সিরিয়াস একটা অপারেশন হয়। এটা ১৯৯৬ সালের জানুয়ারির ঘটনা। আমার পরিবারের সঙ্গে তো আমাদের ১৭ বছর কোনো যোগাযোগ ছিল না। সেটা অন্য গল্প। বলা যায় আমাদের তেমন কেউ ছিল না। আমি তখন ভাবতে পারতাম না মা-বাবা ছাড়া একটা ইনজেকশনও দেওয়া যায়। তখন আমাদের থিয়েটার প্রাচ্যনাটের সবাই হাসপাতালে আমাকে পাহারা দিত। বৃন্দাবন তখন সবে চাকরিতে জয়েন্ট করেছে। ওর সব সময় আমার পাশে থাকার সময় হয়নি। হাসপাতালে লিফট ছিল না। আমাকে পাঁচতলা থেকে কোলে করে ওরা নামিয়েছে। আমার বাসা ছিল ছয় তলায়। সেটা আবার কোলে করে ওরা তুলেছে। কিন্তু গত ১০ বছরে আমার অনেক বিপদ গেছে। সেসব বন্ধুবান্ধব শুনেছে। হয়তো পাঁচ-সাত দিন পরে কল দিয়েছে। আমিও হয়তো এমন করি। এটাই এই যান্ত্রিক শহরের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন বলে আমি মনে করি।’

 

 

 

 



মন্তব্য