kalerkantho


দুর্ভোগের আরেক নাম সাভার ট্যানারি

রাতিব রিয়ান   

১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



দুর্ভোগের আরেক নাম সাভার ট্যানারি

সাভার উপজেলার তেঁতুলঝোরা ইউনিয়নের হরিণধরা এলাকার ১৯৯ দশমিক ৪০ একর জমির ওপর পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্পনগরী নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এই চামড়ানগরী এখন পরিণত হয়েছে জনদুর্ভোগের নগরীতে। বিষাক্ত দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী। পরিকল্পিত ডাম্পিং স্টেশন গড়ে না ওঠায় সাভারের ট্যানারির দূষণে আক্রান্ত হচ্ছে ধলেশ্বরী নদী। চামড়াশিল্প কর্তৃপক্ষ ও মালিকদের কারসাজিতে কলকারখানার বর্জ্য গিয়ে পড়ছে ধলেশ্বরীতে। এতে করে আরেকটি বুড়িগঙ্গায় পরিণত হচ্ছে ধলেশ্বরী নদী। ট্যানারির বর্জ্য পরিশোধন না করে সরাসরি ও আংশিক পরিশোধিত বর্জ্যে ড্রেনেজের লাইন সংযুক্ত করা হয়েছে নদীর সঙ্গে। এ কারণে ধলেশ্বরী দূষিত হচ্ছে।

বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অপরিশোধিত বর্জ্য স্ক্রিনিং করার পর দুটি আলাদা পাইপলাইনে সিইটিপিতে এবং ক্রোম রিকোভারি ইউনিটে নির্গমন করা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বাস্তবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বর্জ্য স্ক্রিনিং ছাড়াই পাইপলাইনে ছেড়ে দিচ্ছে। সরেজমিনে সাভার চামড়াশিল্পনগরী ঘুরে দেখা গেছে, শিল্পনগরীর এখনো অনেক প্লট চামড়াশিল্পের জন্য প্রস্তুত নয়। সেগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় আছে। কোনো কোনো উদ্যোক্তা চামড়া প্রক্রিয়াজাত শুরু করলেও বেশির ভাগের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা গড়ে ওঠেনি। এর মধ্যেই চলছে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ। শিল্পনগরীর সামনের সারিতে কয়েকটি বড় ট্যানারির কাজ চলছে, তবে পেছনের দিকে এখনো বেশির ভাগের কাজ শুরু হয়নি। আবার এসব এলাকায় বর্জ্যের ডাম্প ইয়ার্ড তৈরির কার্যক্রমও এখনো শুরু হয়নি। ফলে চামড়াবর্জ্যের কিছু অংশ ডোবা-নালায় ফেলা হচ্ছে। তবে বেশির ভাগ বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীর তীরে। ট্যানারিতে মোট ২০৫টি প্লট রয়েছে, যার মালিক ১৫৪টি ট্যানারি, পূর্ণাঙ্গ, আংশিক, নির্মাণাধীনসহ ১১১টি ট্যানারিতে কাজ হচ্ছে। মালিকদের একাধিকবার বিসিকের পক্ষ থেকে নোটিশ করা হয়েছে, তারা গুরুত্বই দিচ্ছে না।

চামড়াশিল্প নগরীতে কেন্দ্রীয়ভাবে বর্জ্য (সিইটিপি) শোধনের জন্য ১২ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য শোধনাগার মডিউল বসানো হয়েছে। কিন্তু এই মডিউল কাঙ্ক্ষিত মানমাত্রায় বর্জ্য শোধনে ব্যর্থ। এ ছাড়া বর্জ্য শোধনে স্তরগুলো ঠিকমতো কাজ করছে কি না সেটি জানার জন্য এখন পর্যন্ত সাভার ট্যানারি পল্লীতে কোনো গবেষণাগার স্থাপিত হয়নি। সাভারের ট্যানারি পল্লীতে চাকরিরত এক কর্মচারী বলেন, ‘ট্যানারির ময়লাগুলো নিরাপদ কোনো জায়গায় ফেলতে পারলে ভালো হয়। কিন্তু তা না করে এগুলো লোকচক্ষুর আড়ালে সরাসরি নদীতে ফেলা হয়।’

ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘সাভার ট্যানারিতে নানা সমস্যা রয়েছে। এখানে শ্রমিকদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই, কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য আবাসন সুবিধা নেই। ট্যানারির উন্নতির পাশাপাশি আমরাও চাই পরিবেশের উন্নতি হোক। এখানে যেসব সুযোগ-সুবিধা নেই, সেগুলো যেন অবিলম্বে নিশ্চিত করা হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘এখানকার রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই বাজে। পানি জমে থাকে। ছোট-বড় ট্রাকগুলো এ রাস্তা দিয়ে ঠিকমতো চলতে পারে না। এসব সমস্যার কারণে ব্যবসায়ীরা কাঙ্ক্ষিতমাত্রায় তাঁদের উৎপাদন করতে পারেন না।’

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ রোধে হাজারীবাগ থেকে সরিয়ে সাভারের হেমায়েতপুর হরিণধরা এলাকায় চামড়াশিল্প নগরী স্থাপন করা হয়। কিন্তু বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে গিয়ে এখন ধলেশ্বরী নদী ও আশপাশের এলাকা মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে। অনেক ট্যানারি শিল্প-কারখানার তরল বর্জ্য ‘ওভার ফ্লো’ হয়ে এলাকার রাস্তাঘাট সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বৃষ্টি হলে এ সমস্যা গুরুতর রূপ ধারণ করে। এই পরিবেশদূষণ বন্ধের দাবিতে সম্প্রতি এলাকাবাসী বিভিন্ন সময় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশও করেছে।

এ প্রসঙ্গে তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফকরুল আলম সমর জানান, ‘ট্যানারির বিষাক্ত বর্জ্যের দুর্গন্ধে ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুলে যেতে পারছে না। শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ফসলি জমিতে ফসল হচ্ছে না। উদ্যোক্তারা ময়লা পরিশোধন (সিইটিপি) শতভাগ প্রয়োগ করছে না। দিনে চালাচ্ছে আর রাতে বন্ধ থাকছে। এর ফলে তরল বর্জ্য সব নদীতে গিয়ে পড়ছে। এসব বিষয়ে জনগণকে সচেতন করার চেষ্টা চলছে। একাধিকবার বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে মানববন্ধনও করা হয়েছে।’

সাভার চামড়াশিল্প নগরীর প্রকল্প পরিচালক সাব্বীর আহমেদ স্বীকার করেন, ‘সিইটিপি চালু থাকলেও তা শতভাগ প্রয়োগ হচ্ছে না। আমি নতুন যোগদান করেছি। তবু আগে যেভাবে বর্জ্য যত্রতত্র ফেলা হতো, আমি আসার পর তা বন্ধ করে এক পাশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ধীরে ধীরে আরো নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।’ নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি রফিকুল ইসলাম ঠাণ্ডু মোল্লা বলেন, ‘এখানে ফেলা ট্যানারির কঠিন বর্জ্য এবং ঝিল্লির অংশ পচে সৃষ্টি হয় উৎকট দুর্গন্ধের। ট্যানারির বর্জ্যের গন্ধে আশপাশে থাকা মুশকিল হয়ে পড়েছে। আমরা চাইছি, বুড়িগঙ্গার মতো ধলেশ্বরী যেন দূষিত না হয়ে যায়। ধলেশ্বরীকে বাঁচানোর স্বার্থে চামড়া নগরীর যথাযথ ব্যবস্থাপনা জরুরি। এখন পর্যন্ত এ রকম কোনো ব্যবস্থাপনা আমাদের চোখে পড়েনি।’ তিনি আরো বলেন, ‘হাজারীবাগে এখনো চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজ হচ্ছে। কারা নিয়ম ভাঙছে, নদী দখল করছে, জনগণকে ভোগান্তির মধ্যে ফেলছে, এগুলো মনিটরিং করতে হবে। পরিবেশের স্বার্থেই এগুলো বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি সাভারের ট্যানারির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।’

 

 



মন্তব্য