kalerkantho


হাতিরঝিল ওয়াটার ট্যাক্সি

প্রশান্তির পাশাপাশি আছে ভোগান্তিও

জহিরুল ইসলাম   

১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



প্রশান্তির পাশাপাশি আছে ভোগান্তিও

ছবি : মঞ্জুরুল করিম

ঠিক দুপুর বেলা মেঘের দাপটে আকাশে চলছে সূর্যের লুকোচুরি, কিন্তু গরমের কোনো কমতি নেই। এমন পরিবেশে রাজধানীর অসহনীয় যানজটে অতিষ্ঠ মানুষের চেয়ে অনেকটা ভালো থাকতেই পারে হাতিরঝিলের ওয়াটার ট্যাক্সির কয়েক হাজার যাত্রী। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভোগান্তিরও কমতি নেই। যানজটহীন পথে আর কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর আশায় আসা কেউ কেউ হচ্ছেন আশাহত। যাত্রীকে তার গন্তব্যে অনেক সময় যেতে হচ্ছে ঘুর পথে। অভিযোগ আছে শিশুদের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়ারও। সুবিধা আর অসুবিধার মাঝে এখনো যাত্রীরা আসছে। কর্তৃপক্ষ ছোট ছোট সমস্যার সমাধানে নজর দিলে রাজধানীবাসীর জন্য এটি হতে পারে সত্যিকার অর্থে প্রশান্তির পথযাত্রা।

গত সোমবার হাতিরঝিলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এফডিসি কর্নার ঘাটে ভৈরব, কর্ণফুলী, পদ্মা, চিত্রা নামের কয়েকটি ওয়াটার ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে। ধানসিঁড়ি নামের ট্যাক্সিটির আসন সংখ্যা ৪২ হলেও মাত্র ১০ জন যাত্রী নিয়ে ঘাটে ভিড়ল। জানা যায়, ট্যাক্সিগুলোর ৪২ আসনেরগুলো ছাড়া অন্য প্রায় সবই দিনের বিভিন্ন সময়ে বন্ধ থাকে। কিছুক্ষণ পর গোমতী নামে ট্যাক্সিটি গুলশানের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। যেখানে যাত্রী দেখা যায় আটজন। একই সময় ঘাটে ভিড়ে শীতলক্ষ্যা। যাত্রী বাঁধন হোসেন বলেন, ‘এই নৌপথে মাঝেমধ্যে আসি। মগবাজারে অফিস হওয়ায় যানজট এড়াতে এই পথ বেছে নেওয়া। তবে অনেক সময় যাত্রী কম হলে ট্যাক্সি ছাড়া নিয়ে একটু দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। আর সার্ভিসটি ১০টা পর্যন্ত চলার কথা থাকলেও ৮টার পরে ঘাটে গিয়ে অনেক সময় কোনো ট্যাক্সি পাওয়া যায় না। কোনো ট্যাক্সির যাত্রী কম হলে তাকে অন্য স্টপেজের ট্যাক্সিতে তুলে দেওয়া হয়।’

বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে দেখা যায় ৯ নম্বর ট্যাক্সিটিতে তিনজন রামপুরার যাত্রী বসে আছে। কিন্তু আরো বেশি যাত্রীর অপেক্ষার জন্য ছাড়া হচ্ছিল না। পরে চালকের অনুরোধে ম্যানেজার ওই যাত্রীদের গুলশানের একটি ট্যাক্সিতে তুলে দেন। যাত্রীরা কিভাবে রামপুরা ফিরবেন জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চালক বলেন, ‘গুলশান নিয়ে সেখান থেকে রামপুরার ট্যাক্সিতে উঠিয়ে দেওয়া হবে।’ এভাবেই স্বল্প সময়ে যানজট এড়িয়ে গন্তব্যে যাওয়ার জন্য যাত্রীরা মাঝেমধ্যে ভোগান্তিতে পড়ে। তবে বিষয়টিকে কর্তৃপক্ষ বলছে বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আর যাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন এমন ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটে।

জানা যায়, ওয়াটার ট্যাক্সিগুলো ছাড়া হয় সকাল ৭টা থেকে, চলে রাত ১০টা পর্যন্ত। বর্তমানে ৮৩ আসনের দুটি, ৫০ আসনের একটি, ৪২ আসনের ছয়টি, ৩০ আসনের চারটিসহ মোট ১৩টি ট্যাক্সি রয়েছে। ট্যাক্সিগুলো ছয়টি ঘাটে ভিড়ে। এর মধ্যে রয়েছে এফডিসি কর্নার, পুলিশ প্লাজা, রামপুরা ব্রিজ, মেরুল বাড্ডা, গুদারাঘাট ও গুলশান-১। এই স্টপেজগুলোতে ভাড়া নেওয়া হয় এফডিসি থেকে গুলশান ৩০ টাকা আর রামপুরা ২৫ টাকা। এ ছাড়া রামপুরা ব্রিজ থেকে গুলশান ২০ টাকা। গুলশান থেকে পুলিশ প্লাজা পর্যন্ত ২৫ টাকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চালক বলেন, ‘চলছে কোনো মতে, তবে মাঝেমধ্যে যাত্রী সংকট হয়। বৃষ্টি হলে যাত্রী পাওয়া যায় না। আসলেও কম।’ ভৈরবে করে গুলশান যাওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রীদের মধ্যে গৃহিণী শাহেদা আক্তার তাঁর পরিবার নিয়ে উঠেছেন। তিনি বলেন, ‘এখানকার সার্ভিস খারাপ না। মাঝেমধ্যেই এই পথে যাতায়াত করি। কিন্তু কিছু কাজ কেমন জানি জোর-জবরদস্তির মতো।’ নিজের ছোট বাচ্চাকে দেখিয়ে বলেন, ‘এর বয়স আড়াই বছর। তাও টিকিট নেওয়া লাগল। এটা কেমন কথা? এত ছোট শিশুদের জন্য টিকিট নেওয়াটা যেমন অন্যায় এবং হাস্যকরও।’ এফডিসি কাউন্টারের সামনে রাখা অভিযোগ বক্সেও নাম প্রকাশ না করে কেউ একজন একটি অভিযোগের চিরকুট রেখে গেছেন। যেখানে লেখা আছে ‘দুই বছরের বাচ্চার টিকিট নেই। তাহলে চার বছরের বাচ্চা কি হেঁটে টিকিট কাটতে পারে? পাঁচ বছর করা হোক টিকিট কাটার বয়স।’ বিষয়গুলো নিয়ে হাতিরঝিল প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও কেউ ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিস নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন। প্রকল্প ম্যানেজার (সিপিএস) আনোয়ারুল ইসলাম ও সিনিয়র ইনচার্জ মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলেও কিছু বলতে চাননি। হাতিরঝিল প্রকল্পের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) (অব.) মেজর জেনারেল নিসার বলেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনীর নিয়ম মেনে চলতে হয়। তাই কিছু বলতে পারছি না। আপনি পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেন।’ পরে বিষয়গুলো নিয়ে হাতিরঝিলের প্রকল্প পরিচালক ক্যাম্প কমান্ডার মেজর সাদিক বলেন, ‘দুই বছরের বাচ্চা যদি একটি আসনে বসে তবে ভাড়া নিতে হয়। কোলে নিয়ে বসলেও পরিবেশের একটি বিষয় থাকে। তাই ভাড়া রাখাটাই সুবিধাজনক। আর যাত্রী হয়রানির বিষয়টি আসলে দুই দিকে সমন্বয় করতে হয়। যেমন—বোটের যাওয়া-আসার খরচ আছে, তেলের খরচ আছে, বোটের প্রত্যাশিত আয়ও আছে। কখনো দেখা যায় যাত্রী নেই, দুজন যাত্রী নিয়েই চলে যাচ্ছে। আবার কখনো দেখা যাচ্ছে একদিকের যাত্রী কম। সে ক্ষেত্রে একটার সঙ্গে আরেকটার সমন্বয় করতে হয়।’

উল্লেখ্য, যানজটের কথা মাথায় রেখে ১৬ ডিসেম্বর ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু হয় হাতিরঝিল ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিস। হাতিরঝিল প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও রাজউকের তত্ত্বাবধানে ২০ বছর এই সেবার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে করিম গ্রুপকে।

 



মন্তব্য