kalerkantho


স্মৃতির শহর

দ্বিতীয় রাজধানী হলে ঢাকাকেন্দ্রিকতা কমবে

প্রফেসর ড. এস এম ইমামুল হক, মৃত্তিকা ও পরিবেশবিজ্ঞানী উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



দ্বিতীয় রাজধানী হলে ঢাকাকেন্দ্রিকতা কমবে

ঢাকায় প্রথম আসি ১৯৬১ সালে। এর আগে খুলনায় থাকতাম। ঢাকায় এসে উঠেছিলাম তেজগাঁওয়ে আমার চাচার বাসায়। এরপর সেখান থেকে আজিমপুর কলোনিতে চলে যাই। বাবা আমাকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলে। তখন ছায়াঘেরা, পাখি ডাকা, শান্ত নগরী ছিল ঢাকা। রিকশা ছিল প্রধান বাহন। তবে প্রচুর ঘোড়ার গাড়ি ছিল। দু-চারটি লক্কড়-ঝক্কড় বাস চলত। আমরা বলতাম মুড়ির টিন। এখনকার তুলনায় ছোট হলেও সার্ভিস খারাপ ছিল না। সবাই সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে বাসে উঠত। বাসগুলো তখন শুধু স্ট্যান্ডে থামত। আর এখন রাস্তার মাঝখানে হুটহাট বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করায়। দিন দিন বাস সার্ভিস খারাপ হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, মানুষের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধও ক্রমেই কমে আসছে।

তখন ঢাকার জনসংখ্যা ছিল কয়েক লাখ। এখন তো প্রায় দুই কোটি হবে। রাস্তাঘাট ছিল ছোট ছোট। মনে পড়ে, হাইকোর্টের সামনের সড়কে সাইকেলের আলাদা লেন ছিল। আমরা অন্যান্য দেশের সিটির উদাহরণ দিয়ে বলি, সাইকেলের আলাদা লেন করতে হবে, অথচ ঢাকায়ই একসময় এ ব্যবস্থা ছিল। এটি আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল। ক্লাস সেভেন-এইটে পড়ার সময় থেকেই নিউ মার্কেটে নিয়মিত বাজার করতাম। টাটকা জিনিস পাওয়া যেত। এক মণ চালের দাম ছিল ৪০ টাকা। গরুর মাংস বিক্রি হতো দেড় টাকা সের (তখনো কেজি হয়নি)। দোকানের বিক্রেতারাও ম্যানার, এটিকেট জানত। তারা ক্রেতাদের স্যার বলে সম্বোধন করত। অথচ ইদানীং সভ্যতা-ভব্যতা একেবারেই উঠে গেছে, চালু হয়েছে মামু, চাচা কালচার। বাজার-সদাই করতে সদরঘাটও যেতাম। তখন সদরঘাট ছিল ঢাকার মূল ব্যবসাকেন্দ্র। এখন আগের সেই সদরঘাট খুঁজে পাই না।

পুরান ঢাকার বিরিয়ানি বেশ জনপ্রিয় ছিল। স্ট্রিট ফুড তখনো ছিল; কিন্তু এত বেশি ছিল না। আজিমপুর কলোনিতে নানা ধরনের ফেরিওয়ালার হাঁক শোনা যেত। ফেরি করে বিক্রি করত খাবারদাবার ও তরিতরকারি। সন্ধ্যার দিকে কলোনিতে ‘মালিশ, মালিশ’ বলে একজন লোকের হাঁক শোনা যেত। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ম্যাসেজ করত সে। শীত এলেই একদল লোক লেপ-তোশক বানানোর জন্য কলোনিতে ঘুরে বেড়াত। এখন এসব আর চোখে পড়ে না।

১৯৬২ সালে ক্লাস এইটে পড়ি। সেই বয়সেই পাকিস্তানবিরোধী মিছিলে যেতাম। মিছিল শুরু হতো আমতলা থেকে। সব সড়ক ঘুরে শেষ হতো বাহাদুর শাহ পার্কে। আমার অনেক বন্ধু ছাত্র ইউনিয়ন করত। তখন ছাত্র ইউনিয়ন বেশ শক্তিশালী ছিল। ১৯৬৫ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিই। তখন শুরু হয় পাক-ভারত যুদ্ধ। সে সময়ই ভালোভাবে অনুধাবন করলাম, পাকিস্তানের কারণে আমরা কতখানি দুর্বল হয়ে আছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ফজলুল হক হল ছাত্রলীগের সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলাম। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে এনএসএফের দৌরাত্ম্য ছিল। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান আমাদের চোখের সামনেই হয়েছে। উত্তাল গণ-আন্দোলনের সময় মাঠে ছিলাম। একাত্তরের ৭ই মার্চের ভাষণের দিন বাঁশের লাঠি হাতে গিয়েছিলাম রেসকোর্স ময়দানে। বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতামঞ্চের খুব কাছাকাছি ছিলাম। লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিল সেখানে। ৭ই মার্চের মতো এত লোকসমাগম ঢাকায় আগে কখনো দেখিনি।

ঢাকার প্রায় সব সিনেমা হলে সিনেমা দেখেছি। তখন অনেক মানসম্মত চলচ্চিত্র তৈরি হতো। ভারতীয় বাংলা সিনেমা বেশি দেখতাম। বন্ধুরা মিলে ঢাকায় অবাধে ঘুরে বেড়াতাম। এত ঘরবাড়ি, দালানকোঠা তখন ছিল না। এখন ব্যাপক জনবহুল শহরের নাম ঢাকা। এখানে ৫০টির বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। ঢাকায় এত বেশি বিশ্ববিদ্যালয় করতে দেওয়া উচিত হয়নি। স্কুল-কলেজের কথা উঠলেও সবাই বলে, ছেলে-মেয়েকে ঢাকায় পড়াতে হবে। কেন? সারা দেশে ভালো ভালো স্কুল-কলেজ আছে। সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালে অসুবিধাটা কোথায়? শুধু চিকিৎসার জন্যই অসংখ্য মানুষ ঢাকায় আসে। চিকিৎসকরা মফস্বলে থাকতে চান না, প্রয়োজনে তাঁদের বাধ্য করতে হবে।

ঢাকার পরিবেশের অবস্থা শোচনীয়। তাপমাত্রা বাড়ছে। যথেষ্ট বৃক্ষরাজি নেই। গাছপালা যা ছিল, সেগুলো কেটে আমরা ভবন বানিয়েছি। ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে। আমাদের স্বাভাবিক ড্রেনেজ সিস্টেম, খালগুলো হারিয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পরেরবার ক্ষমতায় এলে খালগুলো ফিরিয়ে আনবেন। এ শহরকে বাঁচাতে এটি ভালো উদ্যোগ, তাঁকে অগ্রিম ধন্যবাদ।

আমাদের বাসার আশপাশে খোলা জায়গাগুলোতে বড় বড় গাছ না হোক, অন্তত ফুলের গাছ লাগালেও পরিবেশ সুন্দর হয়। মানুষের সচেতনতা অনেক কমেছে। পরিবেশ ভালো না থাকলে যে মানুষ ভালো থাকবে না, সে বিষয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। নাগরিক, নগরবিদ, নগরপিতা—সবারই সচেতনতা দরকার। তা না হলে এ শহর বাসযোগ্য রাখা যাবে না।

বুড়িগঙ্গার আশপাশে গড়ে তোলা হয়েছে অপরিকল্পিত শিল্প-কারখানা। হাজারীবাগের ট্যানারির বর্জ্য পানিতে মিশে দূষণ করবে, সেটি কারো মাথায় ছিল না। ফল যা হওয়ার হয়েছে, বুড়িগঙ্গা দূষিত হয়েছে। ভবিষ্যতের কথা কেউ চিন্তা করেনি। পরিবেশ দূষিত করতে পাঁচ থেকে ১০ বছর লাগে। আর ১০০ বছরেও দূষিত নগরীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় কি না সন্দেহ! বুড়িগঙ্গা বাঁচাতে হলে পানিপ্রবাহের ব্যবস্থা করতে হবে। দূষণ বন্ধে জোর মনিটরিং করতে হবে।

ঢাকার যানজট অসহনীয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঢাকা আদর্শ নগর হয়ে ওঠেনি। ফুটপাত বেদখল। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং আর রিকশা-ভ্যান সড়কের অনেকটাই দখল করে রাখে। গাড়িচালক ও পথচারীরা ট্রাফিক আইন মানে না, এটি বড় সমস্যা। কোটি কোটি টাকা খরচ করে ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো হয়েছে। ট্রাফিক সিগন্যাল অনুযায়ী যানবাহন চলাচল করে না। কেন এ রকম হবে? পুলিশের হাতের ইশারার সেকেলে সিস্টেম বিলোপ করে ট্রাফিক সিগন্যাল সিস্টেম চালু করতে হবে। এ ছাড়া ঢাকার চারপাশে নদী—এই পথ কাজে লাগাতে পারলে যানজট কমত।

ঢাকা বড় হচ্ছে। নতুনভাবে যে এলাকাগুলো গড়ে উঠছে, সেগুলো পরিকল্পিতভাবে করতে হবে। ঢাকা শহরে জনসংখ্যা একটি বড় সমস্যা। আমার মনে হয়, এই জনসংখ্যার অর্ধেকেরই কোনো কাজকর্ম নেই। তারা ঢাকায় আসে কাজের খোঁজে। গ্রামে ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যায় না, অথচ তারা ঢাকায় এসে রিকশা চালায়। ঢাকা শহরকে বাঁচাতে হলে রিকশা উঠিয়ে দিতে হবে। বাড়াতে হবে পাবলিক পরিবহন। মেট্রো রেল, নতুন নতুন উড়াল সেতু হলেও ঢাকার জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে সমস্যার সমাধান হবে না।

আমার মনে হয়, দ্বিতীয় একটি রাজধানী হওয়া উচিত। দ্বিতীয় রাজধানী হলে ঢাকাকেন্দ্রিকতা কমবে। সচিবালয় ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়া হলে জনসংখ্যার চাপ অনেকটাই কমত। সব মন্ত্রণালয় ঢাকায় থাকতে হবে কেন? যেমন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যেতে পারে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় বরিশালে। কৃষি মন্ত্রণালয় সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে ময়মনসিংহ কিংবা উত্তরবঙ্গে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান যতটা সম্ভব ঢাকার বাইরে স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের গ্রামগুলোকে শহরায়িত ও সেখানে সমান সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করতে হবে। তবেই ঢাকামুখী মানুষের স্রোত বন্ধ হবে এবং ঢাকা নগরীকে আমরা একটি আদর্শ নগরী হিসেবে দেখতে পাব।

 



মন্তব্য