kalerkantho


ঢাকার অপরাধ

জবি ক্যাম্পাসে বাড়ছে মাদকের আড্ডা

জাহিদ সাদেক   

১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



জবি ক্যাম্পাসে বাড়ছে মাদকের আড্ডা

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি)। মাত্র সাড়ে সাত একরের ছোট ক্যাম্পাস। নানা সংকট আর সীমাবদ্ধতা সঙ্গে নিয়ে যখন সামনে এগিয়ে যাচ্ছে রাজধানীর এ বিশ্ববিদ্যালয়টি, তখন সংকটের সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে ক্যাম্পাসে মাদকসেবীদের আড্ডার বিষয়টি। বিকেল ও সন্ধ্যায় তো বটেই, ক্যাম্পাস সময়ও বিভিন্ন স্থানে বসে গাঁজাসহ নানা ধরনের মাদক সেবনের আসর। ক্লাসের সময়গুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী পরিবহনের দ্বিতল বাসগুলোতেও চলে সিগারেট-গাঁজা খাওয়ার জমজমাট আসর। পুলিশ কিংবা প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব ঘটলেও কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে না তারা। ফলে জবি ক্যাম্পাস হয়ে উঠেছে মাদকাসক্তদের ‘অভয়াশ্রম’।

সরেজমিনে গিয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা যায়, জবির নতুন ভবনের নিচের গ্যারেজে, বিজ্ঞান ভবনের পেছনের গ্যারেজে, অগ্রণী ব্যাংকের পেছনে, কলা ভবনের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের পেছনে, ভাষাশহীদ রফিক ভবনের ছাদের ওপর, ভিসি ভবনের পেছনে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা বিআরটিসির বাসের ভেতর, ক্যান্টিন, পাটুয়াটুলী গেট, সামাজিক বিজ্ঞান চত্বর, রেভেনাস ক্যান্টিনের পাশে, নির্মাণাধীন ছাত্রী হল, লোকপ্রশাসন বিভাগের ছাদে, লোকপ্রশাসন বিভাগের বারান্দায়, রফিক ভবনের পূর্ব পাশে, দ্বিতীয় গেটের সামনে, পোগোজ স্কুল এবং শিক্ষার্থীদের ঘোষিত টিএসসিতে প্রতিদিন বসে মাদকের আড্ডা। সন্ধ্যায় দল বেঁধে এসব জায়গায় গাঁজা ও ইয়াবা সেবন করে মাদক সেবনকারীরা। এমনকি দিনদুপুরে এসব জায়গায় গাঁজা সেবন করতে দেখা গেছে। যে কারণে এসব এলাকায় কেউ সাধারণত বসে থাকতে চায় না। হাতের নাগালে সহজেই পাওয়া নানা ধরনের মাদকে বিশ্ববিদ্যালয়ে দিন দিন বাড়ছে মাদকসেবী শিক্ষার্থীর সংখ্যা। তাদের বাধা দিতে গেলে মারধরের শিকার হয়েছেন অনেকেই। এতে জবির ভেতরে-বাইরে মাদকের কারবার ও সেবনের অভয়ারণ্য সৃষ্টি হয়েছে। হাত বাড়ালে মিলছে গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য।

 

ভাষাশহীদ রফিক ভবনের পাশের এ জায়গায় সন্ধ্যা হলেই বসে গাঁজার আড্ডা

বাংলাদেশ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, জবি ক্যাম্পাসে মাদকসেবীদের বেশির ভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং তারা প্রায় সবাই ক্যাম্পাসের ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এসব রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় তারা মাদক নেওয়ার মতো অপকর্ম প্রকাশ্যেই করে বেড়াচ্ছে। তাদের কেউ বাধা দিচ্ছে না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ক্যাম্পাসের বাইরের এবং ক্যাম্পাসের কয়েকজন ছাত্রের যোগসাজশে মাদকাসক্ত ছাত্রদের হাতে মাদক পৌঁছে দেওয়া হয়। আর তারাই বিশ্ববিদ্যালয়সহ আশপাশের মাদক বিক্রির সিন্ডিকেটগুলো পরিচালনা করে। এর মধ্যে বাংলাবাজার ফুট ওভারব্রিজের পাশের ফুটপাতের হোটেল ও আশপাশে হরহামেশাই মিলছে নেশাজাতীয় দ্রব্য। মাত্র ২০-৩০ টাকায়ই বিক্রি হচ্ছে আরএমজি (রেডিমেড গাঁজা) ও ইয়াবা। এ ছাড়া আশপাশের কয়েকটি স্পটে সক্রিয় এসব মাদকসেবীর সিন্ডিকেট। পরিচিত ক্রেতা ছাড়া এরা সবার কাছে বিক্রি করে না। এরা গাঁজা বা ফেনসিডিল বিক্রি করে বিভিন্ন সংকেতের মাধ্যমে। গাঁজার পোঁটলাকে বলা হয় প্যাকেট, গাঁজায় ভর্তি সিগারেটকে বলে স্টিক আর ফেনসিডিল বিক্রি করা হয় প্রাণআপ কিংবা টাইগারের বোতলে।

অনেক সময় ওই মাদকসেবীরা মাদকদ্রব্যের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে চুরি-ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে। এ জন্য ক্যাম্পাস ও এর আশপাশ এলাকায় বাড়ছে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা। এমনকি পথচারীকে রাতের অন্ধকারে ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় গেটে ধরে নিয়ে আসে মাদকসেবীরা। সব কিছু কেড়ে নেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। কয়েক দিন আগেও এমন কয়েকজন গাঁজাখোরকে ধরে গণধোলাই দেয় ক্যাম্পাসের পাশে শাঁখারীবাজারের স্থানীয়রা। পরে তারা বিষয়টি মীমাংসা করে নেয়।

ক্যাম্পাসে এসব মাদকসেবীর জন্য অনেকে হয়রানি কিংবা বিরক্তির শিকার হচ্ছেন। মনোবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী হাসিব মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের হল না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসে বন্ধুদের সঙ্গে পড়াশোনা করতে হয়। কিন্তু মাদক বা গাঁজাসেবীদের জন্য সে উপায় দিন দিন কমে যাচ্ছে। এখন সন্ধ্যা হলেই ক্যাম্পাসে গাঁজার গন্ধে থাকা দায় হয়ে যায়। বিশেষ করে যেসব জায়গায় পড়াশোনা করা যায়, তার পাশেই বসে গাঁজার আসর।’ লোকপ্রশাসন তৃতীয় বর্ষের ছাত্র হাফিজ আল মুনাদি বলেন, ‘প্রতি রাতেই আমাদের বিভাগের সামনে এলেই দেখা যায়, একদল ছেলে বারান্দার লাইট নিভিয়ে গাঁজার আসর বসিয়েছে। তাই বাধ্য হয়েই এখান থেকে সরে যেতে হয়।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক নৈশপ্রহরী স্বীকার করেছেন রাতে গাঁজা কিংবা ফেনসিডিলের আসরের কথা। তাঁদের একজন বলেন, ‘লোকপ্রশাসন বিভাগের সামনে ছেলেরা বাতি নিভিয়ে গোল হয়ে বসে গান করে এবং গাঁজা বা এ ধরনের কিছু খায়। তাদের একবার বাধা দিয়েছিলাম, কিন্তু উল্টো তারা আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করায় এরপর আর বাধা দিই না। এসব গাঁজাখোর কিছু বললেই রাজনৈতিক প্রভাব দেখায়। এ ছাড়া তাদের সঙ্গে এই ক্যাম্পাসের বাইরের শিক্ষার্থীরাও আসে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জবি ক্যাম্পাস ও আশপাশের মাদকচক্রের সদস্যরা পার্শ্ববর্তী ধোলাইখাল, সূত্রাপুর, গেণ্ডারিয়া, নয়াবাজার, নবাবপুর রোড, আরমানীটোলা মাঠ, চানখাঁরপুল, কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা। এসব এলাকার মাদক কারবারিদের সঙ্গে জবির মাদকসেবী শিক্ষার্থীদের রয়েছে বিশেষ সখ্য। শিক্ষার্থীদের চাহিদামতো মাদক সরবরাহ করে কারবারিরা। জানা গেছে, মাদক সেবন করতে করতে কিছু বিপথগামী শিক্ষার্থীও মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা জবি প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েয়েছে। এতে বলা হয়, জবির পাঁচ শিক্ষার্থী ও এক কর্মচারী মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। তারা হলো—ব্যবস্থাপনা বিভাগের সপ্তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. পারভেজ, ফিন্যান্স বিভাগের অষ্টম ব্যাচের মো. সৌরভ, অর্থনীতি বিভাগের নবম ব্যাচের মো. তুষন, ব্যবস্থাপনা বিভাগের মো. জুয়েল ও সমাজবিজ্ঞানের দশম ব্যাচের মো. শফিকুল গনি সম্রাট। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ার কর্মচারী আনোয়ার হোসেন মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত।

ক্যাম্পাসে মাদকের বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো ছাত্র যাতে মাদকাসক্ত হতে না পারে, সে ব্যাপারে খুবই সতর্ক আমরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সচেতন করার জন্য মাদকের বিরুদ্ধে আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।’ এ বিষেয়ে জবি প্রক্টর নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমাদের কিছু তথ্য দিয়েছিল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। আমরা সেগুলো খুঁজে পাইনি। যদি বিস্তারিত পেতাম, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেত।’ তিনি আরো বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মাদকাসক্তের বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন। এরই মধ্যে ক্যাম্পাসে মাদকবিরোধী একটি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। মাদক কারবারে যারা জড়িত, তাদের খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মসিউর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ। কর্তৃপক্ষের অনুরোধক্রমে আমরা এর আগে অভিযান চালিয়েছিলাম। এ ব্যাপারে সতর্ক আছি। প্রয়োজনে আবারও অভিযান চালানো হবে।’

 



মন্তব্য