kalerkantho


ঢাকার অতিথি

সুন্দরবনের সন্নিকটে উন্নয়ন প্রকল্প প্রাণিবৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি

১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



সুন্দরবনের সন্নিকটে উন্নয়ন প্রকল্প প্রাণিবৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি

বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও জনগণের মাথাপিছু আয় বেশ আকর্ষণীয় হলেও এখানে ধনী ও গরিবের মধ্যে আয়বৈষম্য এবং বেকারত্বের হার আশঙ্কাজনক। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতির ফাঁদে আটকে আছে জনজীবন

 

স্পেনের নাগরিক গ্যাব্রিয়েল। দীর্ঘদিন যাবৎ বাস করছেন লন্ডনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স প্রগ্রামে জনপ্রশাসন বিষয়ে অধ্যয়নরত। তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের ইন্টার্ন হিসেবে ছয় সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশে এসেছেন। বাংলাদেশ পরিভ্রমণের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেছেন তিনি। লিখেছেন হোসাইন মোহাম্মদ জাকি

 

বর্তমানে লন্ডনে বসবাসরত গ্যাব্রিয়েল গ্রামীণ ব্যাংকের ইন্টার্ন হিসেবে ছয় সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশে এসেছেন। এরই মধ্যে তার পাঁচ সপ্তাহ অতিক্রান্ত হয়েছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে কিভাবে জানার সুযোগ হলো—এমন প্রশ্নের উত্তরে গ্যাব্রিয়েল বলেন, ‘ক্ষুুদ্রঋণ ব্যবস্থাপনায় গ্রামীণ ব্যাংক সারা পৃথিবীতে যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছে। জনপ্রশাসনের ছাত্র হিসেবে বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ আন্দোলন, এর সফলতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কার্যকরী পদক্ষেপ দেখার ইচ্ছা নিয়ে বাংলাদেশে এসেছি।’

জনমানুষের সংস্কৃতি ও যাপিত জীবন দেখার সুযোগ মিলেছে কতটুকু—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি ভ্রমণ করতে ভালোবাসি। বাংলাদেশে আসার আগে তুরস্ক, মরক্কো, সংযুক্ত আরব আমিরাত, দুবাইসহ অনেক দেশে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ ঘটেছে। বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্য, সেখানকার মানুষের রীতি-নীতি, সংস্কার, খাদ্যাভ্যাস, আচার-আচরণ, ধর্মীয় মূল্যবোধ আমাকে চিন্তার খোরাক জোগায়। গত রমজানে বাংলাদেশিদের সঙ্গে ইফতারে অংশগ্রহণ করেছি। সেটি ছিল এক বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা। বেশির ভাগ খাবার ঝাল হলেও এখানকার খাবার আমার বেশ পছন্দ। এর আগে লন্ডনেই এজাতীয় খাবারের সঙ্গে আমার সখ্য গড়ে উঠেছিল। বিশেষত বাংলাদেশের কাচ্চি বিরিয়ানির স্বাদ ও গন্ধ অতুলনীয়। এখানকার অধিবাসীরা বেশ অতিথিপরায়ণ ও আড্ডাপ্রিয়। এ দেশে এসে দুটি বাহনের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হয়েছি। একটি হলো সিএনজি, অপরটি রিকশা। এখানে অগণিত স্প্যানিশ ফুটবলভক্ত। এটি আমাকে বেশ অবাক করেছে। বিশেষ করে প্রায় ঘরে ঘরে রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা দলের অনুরাগী।’

পাঁচ দিনের সুন্দরবন ভ্রমণের বৃত্তান্ত বর্ণনা করতে গিয়ে গ্যাব্রিয়েল ছিলেন বেশ উচ্ছ্বসিত। তিনি বলেন, ‘দিনের বিভিন্ন সময় সুন্দরবনের আলাদা আলাদা রূপ। রাতে আবার শান্ত-স্নিগ্ধতার আরেক রূপ। কাছ থেকে নয়নাভিরাম চিত্রল হরিণের ছোটাছুটি ও দল বেঁধে পানি খাওয়ার দৃশ্য ছিল মনোমুগ্ধকর। বিচিত্র পাখির কলকাকলিতে মুখর বনে কুমিরের রোদ পোহানোর দৃশ্য স্মৃতিপটে থাকবে বহুদিন। নদীর পাড়ে সারি সারি গোলপাতার মনোরম দৃশ্য। সুযোগ পেলে আবারও সেখানে যেতে চাই। বারবার যেতে চাই। স্থানীয় লোকদের কাছে শুনেছি, সুন্দরবনের নিকটবর্তী স্থানে একটি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে, যা এখানকার প্রাণিবৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। পরিবেশবিদ, প্রাণিবিজ্ঞানী ও উন্নয়ন সমাজকর্মীদের প্রতিরোধের মুখে বিশ্বের অনেক দেশের সরকারই এ ধরনের পরিবেশ বিধ্বংসী প্রকল্প বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। আশা করছি, বাংলাদেশেও সেই নজির স্থাপন করতে পারবে।’

ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থাপনা এ দেশের অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে বলে আপনার ধারণা? এমনটা জানতে চাইলে গ্যাব্রিয়েল বলেন, ‘রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও জনগণের মাথাপিছু আয় বেশ আকর্ষণীয় হলেও এখানে ধনী ও গরিবের মধ্যে আয়বৈষম্য এবং বেকারত্বের হার আশঙ্কাজনক। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতির ফাঁদে আটকে আছে জনজীবন। তথাপি ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়নে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কাছে পুঁজি সহজলভ্য হয়েছে, আয়ের পথ সুগম হয়েছে এবং ক্রমান্বয়ে তাদের অনেকেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তায় পরিণত হচ্ছে। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে চরম দারিদ্র্যে পতিত মানুষদের অনেকেই দারিদ্র্যসীমা থেকে বের হয়ে এসেছে। গ্রামীণ পরিবার ও সমাজে নারীর আশাপ্রদ ক্ষমতায়ন ঘটেছে, নারীর অবদানের স্বীকৃতি মিলছে। স্যানিটেশন ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থায় সেখানে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। গ্রামীণ জনগণের মানসম্মত ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সুনিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিবিধ কারিগরি ও হিসাব-নিকাশের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরিতে অধিকতর টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখতে পারে। এতে করে গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত ক্রমেই আরো মজবুত হবে বলে আমি আশাবাদী।’

 



মন্তব্য