kalerkantho


অব্যবস্থাপনায় বাড়ছে ঢাকার নিম্ন আদালতের নিরাপত্তা ঝুঁকি

রাতিব রিয়ান   

২৫ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



অব্যবস্থাপনায় বাড়ছে ঢাকার নিম্ন আদালতের নিরাপত্তা ঝুঁকি

সরেজমিনে ঢাকা মহানগর জজ আদালতের এজলাসের বারান্দা। জটলা লেগে আছে বিচারপ্রার্থী-দর্শনার্থীদের। বেশ খোশমনেই এই জটলার কাছে এসে মুড়ি-চানাচুর বিক্রি করছেন হকার রমজান আলী। তিনি প্রতিদিনই এখানে আসেন। এই কোর্টপাড়া এখন তাঁর জীবিকাস্থল। শুধু রমজান আলী নন, এ রকম শত শত হকার নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে সারা দিনমান ঘুরে বেড়ান আদালত প্রাঙ্গণে। এভাবে হকারের সংখ্যাধিক্য, আদালত প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত চায়ের দোকান আর কোনো প্রকার চেকিং ছাড়া লোকজনকে প্রবেশ করতে দেওয়ায় ঢাকার নিম্ন আদালতের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইনজীবীরা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ইঁদুর মারা বিষ থেকে জুতা পালিশ, চায়ের দোকান, ফল বিক্রেতা, বিড়ি, সিগারেট বিক্রেতাসহ শতাধিক হকার ঢাকার মহানগর দায়রা আদালত ও ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্ত্বরে কোনো বাধা ছাড়াই অবাধে বিচরণ করছে। এদের নেই কোনো চেকিংয়ের ব্যবস্থা, মালামাল প্রবেশেও নেই কোনো চেকিং। এমনকি চেকিং ছাড়াই প্রাইভেট কার-মোটরসাইকেল প্রবেশ করছে। এ ছাড়া আইনজীবীদের গলায় পরিচয়পত্র ঝোলানো বাধ্যতামূলক হলেও কেউ সে নিয়ম মানছেন না। ফলে যেকোনো সময় মারাত্মক অঘটন ঘটে যেতে পারে।

জুতা পালিশকারী বাবুল বণিক বলেন, ‘আমরা তো প্রতিদিনই এখানে আসি। আমাদের কেউ কিছু বলে না। আমাদের কোনো তল্লাশিও করা হয় না। এভাবেই তো দিনের পর দিন চলছি।’ এভাবে অবাধে বিচরণে আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা তো অন্য কোনো মতলব নিয়ে আসি না। আমরা এখানে পেটের দায়ে ব্যবসা করতে আসি।’

ঢাকার নিম্ন আদালতের নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে গত বছরের ২৩ মার্চ প্রজ্ঞাপন জারি করেন উচ্চ আদালত। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহায়তায় দেশের প্রত্যেক আদালত প্রাঙ্গণ, এজলাস, বিচারকের বাসভবন, বিচারক ও কর্মচারীসহ আদালত সংশ্লিষ্ট সবার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত, বিশেষ জজ আদালত, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, ঢাকা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের শতাধিক আদালতে আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী, আসামি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাধারণ মানুষ মিলিয়ে প্রতিদিন এখানে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের সমাগম ঘটে।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) বাংলাদেশের ৬৪ জেলার ৬৩ জেলায় (মুন্সীগঞ্জ বাদে) আদালতসহ দেশের সাড়ে ৪০০ স্পটে প্রায় ৫০০ বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এ ঘটনায় দুজন নিহত ও দুই শতাধিক মানুষ আহত হন। ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে একযোগে এ বোমা হামলা চালানো হয়। ঢাকার আদালতগুলো ও প্রেস ক্লাবসহ গুরুত্বপূর্ণ ৩৪টি স্পটে এ হামলা চালায় জেএমবি।

ঢাকার নিম্ন আদালতগুলো ঘুরে দেখা গেছে, ছোট পরিসরে যত্রতত্র দোকান, হাজার হাজার বিচারপ্রার্থী মানুষ ও হকারের আনাগোনা। এর মধ্যেই প্রিজন ভ্যান থেকে নামানো হচ্ছে চাঞ্চল্যকর মামলার আসামি, বিভিন্ন জঙ্গি হামলা মামলার আসামি, ভিআইপি আসামি। কিন্তু দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই আদালতের নিয়মিত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরালো নয়। অথচ এ পথেই যাতায়াত করে বিচারকের গাড়ি, যা তাঁদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

ঢাকা বারের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী আইনজীবী নেতা অ্যাডভোকেট কাজী নজিবউল্লাহ হিরু বলেন, ‘বেশ কিছুদিন আগে খুন হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী মুরগি মিলনের হত্যাকারীরা আদালত চত্ত্বরে হকারের ছদ্মবেশে ছিল। কিছুদিন আগে এক আইনজীবীর ছেলেকে আদালত চত্ত্বরে হত্যা করা হয়েছে। ওই খুনিরাও আদালতে হকারের বেশেই এসেছিল। বহিরাগতদের অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সন্ত্রাসীরা সুযোগটি বারবার গ্রহণ করবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘সব সময় প্রয়োজন হয় বলে কিছু জুতা পালিশওয়ালাকে ছবি ও জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে তাদের পরিচয়পত্র দিয়ে আদালতে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।’

ঢাকা বারের কার্যকরী পরিষদের সদস্য আল আমিন সরকার বলেন, ‘নিম্ন আদালতে বিপুলসংখ্যক আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীর যথেষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। সিএমএম আদালত ছাড়া কোনো আদালতের প্রবেশপথে আর্চওয়ে নেই। আর সিএমএম আদালতে আর্চওয়ে থাকলেও তদারকি নেই। সার্বিক নিরাপত্তায় এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

ঢাকা বারের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল ইসলাম খান বাচ্চু বলেন, ‘আইনজীবী ভবনের নিরাপত্তায় ভবনের গেটে সার্বক্ষণিক তিনজন পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকেন। এ ছাড়া সমিতির নিরাপত্তা কর্মীও আছে। ১৩টি সিসি ক্যামেরা দিয়ে পুরো ভবনটি মনিটরিং করা হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার মতে এখানকার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে সবাই সচেতন। আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি নেই।’ তবে বিশেষ প্রয়োজন হলে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা যেতে পারে বলে মন্তব্য তাঁর। আদালতে কর্মরত পুলিশের ওসি (প্রসিকিউশন) আমিনুর রহমান বলেন, ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের টিম রয়েছে। আদালতে বিচারক ও বিচারপ্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের। এজলাসের বাইরের কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘পুরো আদালত প্রাঙ্গণ সিসি ক্যামেরা দিয়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হয়। বিপুলসংখ্যক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখানে দায়িত্ব পালন করে। এককথায় বলতে পারি, এখানে নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি নেই।’ যদি আরো নিরাপত্তাব্যবস্থার দরকার হয় তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান আদালত পুলিশের ওসি আমিনুর রহমান।



মন্তব্য