kalerkantho


ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশায় বাড়ছে দুর্ঘটনা

রুদ্র রাজ   

২৫ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশায় বাড়ছে দুর্ঘটনা

ছবি : লুৎফর রহমান

রাজধানীর লালবাগের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। সরু রাস্তায় অনিয়ন্ত্রিত গতির কারণে এর মাত্রা আরো বেড়েছে। আজিমপুর, লালবাগ, আমলীগোলা, শহীদগনর—এসব এলাকায় প্রায় হাজারের ওপর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলছে। এরই মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে চলছে পথচারীরা। অনেকের মতে, গলির রাস্তায় অনুমোদন ছাড়া এই বাহনের কারণে পরিবেশ যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি একটি স্বার্থান্বেষী মহল ভাড়া বাবদ বিপুল টাকার মালিক হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২৩, ২৪, ২৫, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডসহ লালবাগের প্রায় সব এলাকায় চলছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। অভিযোগ আছে, পুলিশ হাতে রেখেই ব্যাটারিচালিত শত শত রিকশা নামছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, লালবাগ এলাকার ভাঙাচোরা রাস্তাগুলোয় প্রায় সময় যাত্রী নিয়ে রিকশা উল্টে আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। বিষয়টি নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। অথচ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়া ইচ্ছামতো অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা নামাচ্ছে মালিকপক্ষ। পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো ধরনের বাধা না থাকায় অনেকেই এতে উৎসাহিত হচ্ছে। ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েকটি এলাকা এবং ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের বেশ কিছু জায়গায় রিকশা ছাড়া অন্য যাতায়াত ব্যবস্থা থাকলেও উল্লিখিত অন্য এলাকাগুলোতে রিকশা আর ব্যাটারিচালিত রিকশাই একমাত্র ভরসা। তবে সাধারণ রিকশার পরিমাণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালে ব্যাটারিচালিত রিকশা অবৈধ ঘোষণা করা হয়। ব্যাটারিচালিত রিকশায় অতিরিক্ত ঝুঁকি থাকায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকেও দেওয়া হয়নি কোনো ধরনের অনুমোদন। রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের জন্য বিভিন্ন সময় অভিযান চালায় সিটি করপোরেশন। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। বরং মূল সড়ক ছেড়ে দিয়ে এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা ঢাকার চারপাশে বিভিন্ন এলাকার রাস্তায় চলছে। যার মধ্যে অন্যতম একটি এলাকা রাজধানীর লালবাগ ও আশপাশের এলাকা। কামরাঙ্গীর চর রিকশা মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি মনির হোসেন বলেন, ‘প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কারো সাধ্য নেই কিছু করার। গরিব মানুষগুলোর ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাতে একটু কষ্ট কম হয়, তাই হয়তো এর দিকে বেশি ঝুঁকছে।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের লালবাগ রোড, মেডিক্যাল স্টাফ কোয়ার্টার থেকে বিডিআর গেট, কাশ্মীরিটোলা লেন, নবাবগঞ্জ রোড, নবাবগঞ্জ লেন। ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের জগন্নাথ সাহা রোড, শহীদনগর, রাজ নারায়ণধর রোড। ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী  রিয়াজুদ্দিন  রোড, লালবাগ  দুর্গ, পুষ্পরাজ সাহা রোড, আতশ খান লেন, হরমোহনশীল স্ট্রিট, গঙ্গারাম রাজার লেন, নগর বেলতলী লেন, শেখ সাহেব বাজার, সুবল দাস রোড। ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের আজিমপুর রোড, বিসি দাস স্ট্রিট, নীলক্ষেত সরকারি ঢাকেশ্বরী রোডগুলোতে বিরতিহীনভাবে চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। বৃহস্পতিবার জগন্নাথ সাহা রোডে ঢুকতেই যাত্রীসহ একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা খোলা ড্রেনে চাকা নামিয়ে দিলে যাত্রীদের মধ্যে দুজন আহত হন। যাত্রীদের একজন শাহ নেওয়াজ বলেন, ‘ঠেকায় পড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশায় ওঠা। ওরা এত জোরে চালায় যে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। পারলে হাওয়ায় ভাসে।’ যার কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। এলাকার কেউ কেউ বলছেন, রাস্তা ভালো হলেও ঝুঁকি, আবার ভাঙাচোরা হলেও বিপদ। দীপক নামে একজন বলেন, ‘ভালো রাস্তা হলে অনেক অটো জোরে চালায়। যার জন্য স্পিডব্রেকারেও থামে না। আবার ভাঙা রাস্তায়ও জোরে চালায়। একজন আরেকজনের রিকশায় লাগিয়ে দিয়ে নিজেরা নিজেরা ঝগড়া করে। আমরা বসে বসে দেখি।’

সচেতন নাগরিকদের কেউ কেউ বলছেন, ‘শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য এটি মানা গেলেও সুস্থ-সবল কাউকে ব্যাটারিচালিত যান চালানোর অনুমতি দেওয়া মানে বিপদ ডেকে আনা। সাধারণত দ্রুতগতির গাড়িগুলো যে কাঠামোতে তৈরি করা হয়, একটি হালকা রিকশার মধ্যে শুধু মোটর লাগিয়ে দিলেই সেটি এত গতিতে চলার যোগ্যতা অর্জন করে না। যার জন্য দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। চালকরা জানে না যে কত জোরে চালালে দুর্ঘটনা ঘটবে না। অথবা রিকশাটি কত জোরে চলার ক্ষমতা রাখে। দেখা যায়, গতিসম্পন্ন মোটর লাগানো থাকলেও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রেক কিন্তু সাধারণ রিকশার মতোই। তাই জোরে এসে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক আবু সালেহ বলেন, ‘রিকশায় কারিগরিভাবে বাড়তি কোনো নিরাপত্তার সুযোগ-সুবিধা না থাকা এবং সাধারণ রিকশার মতো ব্রেক থাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। আর যে পেডাল দিয়ে রাখে এই রিকশা কিছুটা ভারী হওয়ায় পায়ে চেপে চালানোও সম্ভব হয় না।’ ব্যাটারিচালিত রিকশার বিষয় নিয়ে কথা বললে লালবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ সুভাষ কুমার পাল বলেন, ‘সিটি করপোরেশন উচ্ছেদ অভিযান চালালে আমরা সহায়তা করতে পারি। আমরা নিজেরা কোনো অভিযান করি না। তবে ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে মাঝেমধ্যে পুলিশও ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের চেষ্টা করে। এ ছাড়া আমাদের কিছু করার থাকে না।’

দেখা যায়, ব্যাটারিচালিত রিকশার আধিক্যের কারণে পেডালচালিত রিকশা খুব কম। অনেক খুঁজে দু-একটি পাওয়া গেলেও তাদের সঙ্গে আবার ভাড়া নিয়ে বনিবনা হয় না। যার কারণে ব্যাটারিচালিত রিকশাই ভরসা। এ ছাড়া বিভিন্ন রাস্তায় স্কুল শুরু ও ছুটির সময় ব্যাটারিচালিত রিকশার দরুন অসহ্য যানজট তো লেগেই থাকে। আজিমপুর মাতৃসদন থেকে আমলীগোলা খেলার মাঠের পাশে যাবেন নাজমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘এই ব্যাটারিচালিত রিকশায় না উঠে উপায় নেই! অন্য রিকশা ওদিকে যেতেই চায় না। বলে—যানজট, গেলে পোশাবে না।’ এই যানজটও আবার এদের কারণেই। রাস্তায় একজনের রিকশার সঙ্গে অন্যজন লাগিয়ে দিয়ে সমস্যার সৃষ্টি করে।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘কিছু রাজনৈতিক নেতা এবং এর অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে জড়িত স্বার্থান্বেষী মানুষ ব্যাটারিচালিত রিকশা নামিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করছে। যার কারণে বারবার উচ্ছেদ অভিযান করেও কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশ চাইলে এক ঘণ্টার মধ্যে সব ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু পুলিশের কিছু সদস্য টাকা খেয়ে তা করছে না। বিষয়গুলো সবাই জানে, সবাই বোঝে, তার পরও কেউ কিছু বলে না। আমরা জনপ্রতিনিধি হয়ে আছি বড় সমস্যায়। সবাই শুধু আমাদের কাছে কৈফিয়ত চায়।’



মন্তব্য