kalerkantho


আট থেকে আশি সবাই প্রযুক্তিনির্ভর এটা ভালো লক্ষণ নয়

‘লাক্স তারকা’ খ্যাত অভিনেত্রী প্রসূন আজাদ। এই ঢাকায়ই তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। যাপিত জীবনের এই ঢাকা নিয়ে বলেছেন তিনি। আর লিখেছেন মীর রাকিব হাসান

১৮ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



আট থেকে আশি সবাই প্রযুক্তিনির্ভর এটা ভালো লক্ষণ নয়

ঢাকায় প্রসূনের স্মৃতি-বিস্মৃতির শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার মা-বাবা তখন একটা মাত্র রুমে থাকতেন। নিম্ন-মধ্যবিত্তদের পরিবার যেমন থাকে। সেই বাসায়ই আমার জন্ম। পরিবারে তৃতীয় ব্যক্তি আমার আগমনের জন্য মা-বাবাকে নতুন বাসা নিতে হয়। আমরা বাসাবোর একটি বাসায় উঠি। বাসাবোতেই আমার প্রথম স্কুল। আমার স্কুলের ওপরেই আমাদের বাসা ছিল। স্কুল শেষে সিঁড়ি বেয়ে বাসায় উঠে পড়তাম। বিকেলে ওই স্কুলমাঠেই চলত খেলাধুলা। এভাবেই কেটেছে অনেকটা দিন। এরপর সংসারে আসে নতুন অতিথি, আমার ছোট ভাইয়ের জন্ম হলো। কাকরাইলের উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হলাম। এরপর বাসা বদল করে আমরা চলে আসি শাহজাহানপুর। বাসাবোতে প্রতিবেশীরা সবাই মিলে একটা পারিবারিক বন্ধনের মতো ছিলম। যেটা শাহজাহানপুর এসে খুব মিস করতাম। পুরো বাসাবো এলাকাটাই আমার পরিচিত ছিল। শাহজাহানপুর এসে দেখলাম অন্যরকম পরিবেশ। ঘর থেকে কেউ বের হয় না। প্রতিবেশীর সঙ্গে সামাজিক সম্পর্কের যেন বালাই নেই। আমার একজন হুজুর ছিল। ওনার কথা খুব মনে পড়ে। ওনার কাছে নিয়মিত আমরা যেতাম। কোরআন তিলাওয়াত করতাম। একসময় কোরআন খতমও দিলাম। সবাই মিলে আরবি পড়তে যাওয়া, এই স্মৃতিগুলো বেশ মজার।’

শাহাজাহানপুর থেকে একটু বড় হওয়ার পর। প্রসূনের আম্মু এসআই পদে উত্তীর্ণ হন। তখন পল্টন থানায় কোয়ার্টারে থাকার সুযোগ মেলে তাঁদের। প্রসূনের বাবাও পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁর বেশির ভাগই ঢাকার বাইরে পোস্টিং ছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা ছুটি পেলে আব্বুর কাছে ঘুরতে যেতাম। পল্টন থানা কোয়ার্টারে একটা বিশাল মাঠ ছিল। আমরা ওখানে খেলতাম। এখানে এসে যেন এক বিশাল পৃথিবী পেলাম। শৈশবের অনেক সুন্দর দিন কাটিয়েছি ওখানে। সেখান থেকে এলাম মালিবাগে। এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলো। লাক্স চ্যানেল আই সুন্দরী প্রতিযোগিতায় নাম লেখালাম। ২০১২ সালে লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অর্জন করি। সেখানে পাঁচ লাখ টাকা পেলাম। সেই টাকা দিলাম আব্বু-আম্মুকে। আম্মু ইউএন মিশনে দক্ষিণ আফ্রিকা ছিলেন। সেখান থেকে এলেন। সেখান থেকে কিছু টাকা পেয়েছিলেন। সব মিলিয়ে সেই টাকা দিয়ে আমরা ফ্ল্যাট কিনলাম। তখন আমরা বলা যায় স্থায়ীভাবে ঢাকার বাসিন্দা হলাম।’

বর্তমান ঢাকা আর আগেকার ঢাকার পার্থক্য কী? ‘আমরা ছোটবেলায় যত টেনশন মুক্ত হয়ে ঘুরতাম। এখনকার ছেলে-মেয়েরা মনে হয় না সেভাবে পারে। ওদের মাথায় সব সময় কী যেন একটা টেনশন কাজ করে। হয় পড়াশোনা, নয়তো হাতে মোবাইল ইন্টারনেট দিয়ে কত-শত টেনশন ডাউনলোড দেয়। এই যে মোবাইলে গেইম খেলে। এটাও একটা টেনশন বলা যায়। আমাদের শৈশবটা তো খুব বেশিদিনের আগের কথা না। আমরা প্রযুক্তিতে এতটা মত্ত ছিলাম না। দিনকে দিন সবাই ভয়াবহভাবে প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে। আট থেকে আশি সবাই যেন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে। এটা ভালো লক্ষণ নয়। এটা আমার কাছে অনেক বড় পরিবর্তন।’ তিনি আরো বলেন, ‘ক্রমেই আমাদের নাগরিকজীবনে সামাজিকতা, আন্তরিকতার বন্ধনটা কমে আসছে। আমি জানি না আমার পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে। এটাই এই ঢাকার এখন সবচেয়ে পরিচিত রূপ। আর কখনো সামাজিক পরিবেশটা ফিরে আসবে কি না জানি না। ঢাকা সার্বিক দিক থেকেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। রাস্তায় বের হলেই যানজটের সমস্যা। আমার শৈশবে এত জ্যাম কখনো দেখিনি। এখন আমরা ধরেই নেই। ওই রাস্তায় আধা ঘণ্টা লাগবে। ওখানে এত সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। বরং ঢাকায় জ্যাম না থাকলে কেমন যেন অচেনা লাগে! অন্যদিকে দিনকে দিন ঢাকার জন্যসংখ্যা বেড়েই চলেছে। এই শহরের মায়া আর প্রয়োজনীয়তা এমনই। তবে ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখতে আমি মনে করি খুব দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। নয় তো জটিলতা আরো বাড়বে।’



মন্তব্য