kalerkantho


ডিএনসিসির কাঁচাবাজার

৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরও ভাঙতে হবে!

রাতিব রিয়ান   

১৮ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরও ভাঙতে হবে!

কারওয়ান বাজার রাজধানীর সবচেয়ে বড় পাইকারি ও খুচরা বাজার। কারওয়ান বাজারের ওপর চাপ কমাতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন রাজধানীর মহাখালী, যাত্রাবাড়ী, আমিনবাজারে তিনটি পাইকারি কাঁচাবাজার নির্মাণ করেছে। পরিকল্পনা ছিল এই কাঁচাবাজার নির্মাণ করার পর সেখান থেকে কারওয়ান বাজার স্থানান্তর করা হবে; কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে উল্টো। ওই তিন কাঁচাবাজারে দোকান রয়েছে সাড়ে চার হাজার। দোকানগুলোর পরিধি ৭০ থেকে ১২০ বর্গফুট। ব্যবসায়ীদের দাবি, এই ছোট পরিসরের দোকান দিয়ে কার্যক্রম চালানো সহজ হবে না। এর ফলে ব্যবসায়ীরা দোকান বরাদ্দ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এর মধ্যে দোকান বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ১২৯টি। দোকান বরাদ্দ নিতে বিভিন্ন সময় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়েছে। সে সময় প্রতি স্কয়ার ফিট জায়গার মূল্য ধরা হয় ২৫ হাজার টাকা। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে দাম কিছুটা কমানো হলেও মেলেনি সাড়া। এমন অবস্থান দোকানগুলো ভেঙে জায়গা বাড়ানো ছাড়া আর বিকল্প উপায় দেখছে না সিটি করপোরেশন।

কাঁচাবাজার নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান বলেন, ‘দোকানগুলো ছোট হওয়ায় ব্যবসায়ীরা সেখানে যেতে চাইছেন না। দোকানগুলো বড় করার চিন্তাভাবনা চলছে। দোকানগুলোর স্পেস বাড়ানো হলে আশা করি পরিস্থিতির সমাধান হবে।’ কারওয়ান বাজার ঘুরে জানা গেছে এখানকার ব্যবসায়ীরা যে স্পেসে ব্যবসা করছেন তা ৩০০ থেকে ৪০০ ফুট। কারওয়ান বাজারের মা জেনারেল স্টোরের মালিক আব্দুল্লা মারুফ বলেন, ‘এখানে আমার বাবা ব্যবসা করেছেন। আমিও ১৫ বছর ধরে ব্যবসা করি। আমাদের সব কাস্টমার এখানে আসে। এই বাজার ছেড়ে অন্য কোথাও গেলে পুরনো ক্রেতাদের আমরা হারিয়ে ফেলব। তাই এই বাজার ছেড়ে আমরা অন্য কোথাও যেতে চাই না।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রবীন্দ্র শ্রী বড়ুয়া বলেন, ‘এই তিনটি কাঁচাবাজারেই ব্যবসায়ীরা যেতে চান না। এর প্রধান কারণ এই তিন বাজারের দোকানগুলো ছোট। সে জন্য দোকানগুলো পুনর্বিন্যাস করে স্পেস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজনে এখানে ব্যবসায়ীদের আকর্ষণ বাড়াতে হবে, যে করেই হোক ব্যবসায়ীদের নিয়ে আসতে হবে।’

প্রায় ১২ বছর আগে ২০০৬ সালে রাজধানীর তিন প্রান্ত মহাখালী, যাত্রাবাড়ী ও আমিনবাজারে পাইকারি কাঁচাবাজার নির্মাণ করে কারওয়ান বাজারের সব দোকান সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কৃষিপণ্যের বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নের পাশাপাশি কারওয়ান বাজারের যানজট কমাতে এ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ২০১৪ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্প শেষ হয়েছে ২০১৬ সালে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ৩৫০ কোটি টাকা। মহাখালী আন্তজেলা বাস টার্মিনালের কাছে ৭ দশমিক ১৭ একর জমির ওপর জিওবির অর্থায়নে ৫টি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪ হাজার বর্গমিটার ফ্লোর এরিয়ায় দোকান নির্মাণ করা হয়েছে মোট ৩৬০টি। ডিএনসিসির এই মার্কেটি ছয়তলাবিশিষ্ট। এ ছাড়া মার্কেট এরিয়ায় রয়েছে ৯ তলাবিশিষ্ট আরেকটি ভবন। রয়েছে গাড়ির গ্যারেজ, ময়লার ডাম্পিং স্পেস, কসাইখানা, লিফট ও জেনারেটর বিল্ডিং।

কারওয়ান বাজার মূলত সবার কাছে পরিচিত কাঁচাবাজারের কারণে। এই কাঁচাবাজারের গোড়াপত্তন মূলত ব্রিটিশ শাসনামলেই হয়েছে। কারওয়ান বাজারের সবচেয়ে পুরনো মার্কেট হলো সিটি করপোরেশন মার্কেট-১। দ্বিতলবিশিষ্ট এ মার্কেটটি প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৬৪ সালে। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সালে তা ডিআইটির অধীনে চলে যায়। তবে স্বাধীনতার পর তা আবার ১৯৮০ সালে সিটি করপোরেশনের অধীনে চলে যায়।

প্রায় ১২ বছর ধরে কারওয়ান বাজার স্থানান্তরের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। পশ্চিম কাওরান বাজার কাঁচামাল আড়ত ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির নেতা মো. হানিফ বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের কমপক্ষে দুই হাজার ট্রাক কাঁচামাল আসে। মহাখালী মার্কেটে পার্কিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। এ ছাড়া দোকানের পরিসরও ছোট। এ অবস্থায় মহাখালী বাজারে যাওয়া সম্ভব নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘যাত্রাবাড়ী ও আমিনবাজারেও নানা সমস্যা রয়েছে। ওই কাঁচাবাজারগুলোতেও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। সেখানে গিয়েও ব্যবসা শুরু করলে সুবিধা করা যাবে না।’

কারওয়ান বাজার ক্ষুদ্র আড়ত কাঁচামাল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন বলেন, ‘মহাখালী ও গাবতলীতে স্থানান্তরিত হওয়ার কোনো পরিবেশ নেই। এমন অবস্থায় আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। এ ছাড়া আমাদের কাছে দোকানের পজিশন বাবদ গলাকাটা দাম চাওয়া হচ্ছে। আমরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। বেশি টাকা দিয়ে দোকানের পজিশন কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্য তো আমাদের নেই।’ ডিএনসিসির অঞ্চল-৫-এর নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অজিয়র রহমান বলেন, ‘কারওয়ান বাজার থেকে ব্যবসায়ীদের স্থানান্তরের জন্য আলাপ-আলোচনা চলছে। ব্যবসায়ীরা কিছু দাবির কথা জানিয়েছেন, তাঁরা তাঁদের সুযোগ-সুবিধার কথা বলেছেন। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পেলে কারওয়ান বাজার ছাড়তে তাঁদের আপত্তি নেই। ব্যবসায়ীদের দাবি-দাওয়া যাতে ঠিকমতো পূরণ করা যায় সে বিষয়টিও আমাদের মাথায় আছে।’



মন্তব্য