kalerkantho


ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম পূরণ

অনাস্থার টানাপড়েন চলছে এখনো

৪ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



অনাস্থার টানাপড়েন চলছে এখনো

মেগাসিটি ঢাকার বেশির ভাগ মানুষ অন্যের বাড়িতে থাকেন, ভাড়াটিয়া হয়ে। এই মানুষগুলোর ব্যাপারে যেমন বাড়ির মালিক, প্রতিবেশীদের কাছে তথ্য থাকে না, তেমনি প্রশাসন-রাষ্ট্রও থাকে অন্ধকারে। অনেক সময় বিপদেও তাদের পরিবারের হদিস মেলে না। একইভাবে পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ পায় অপরাধীরা। ঘাপটি মেরে থাকে জঙ্গি, ছিনতাইকারী, চোর, ডাকাত, সন্ত্রাসীসহ অনেকে। ছদ্মনামে জঙ্গিদের আস্তানা গড়ার খবরে পুলিশ আড়াই বছর আগে ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম হাতে নেয়। পরিবার, ফোন নম্বরসহ ব্যক্তিগত তথ্য পুলিশের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে দিতে জোর আপত্তি তোলেন ভাড়াটিয়ারা। আদালতেও যান কেউ কেউ। শেষে তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম চালু হলেও পায়নি গতি। আড়াই বছর পরের অবস্থা জানাচ্ছেন এস এম আজাদ

 

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীর ১২ নম্বরের বাসিন্দা আবুল কালাম আগে মোহাম্মদপুরের শেরশাহসূরী রোডের ভাড়া বাসায় ছিলেন। দেড় বছর আগে সেখানে পুলিশের ভাড়াটিয়া তথ্য ফরমও পূরণ করে দেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি পল্লবীতে বাসা নিয়ে আসেন। এখানেও ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয় তাঁকে। কালাম বলেন, ‘এটা কেন নিচ্ছে? কী লাভ হবে জানি না। সব জায়গায় গেলেই দিতে হলে ঝামেলাই মনে হয়।’ উত্তর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা কবির হোসেন বলেন, ‘আগের বাসায় ফরম পূরণ করে দিয়েছিলাম। কাজের মেয়েরটার দিলাম। ভাবলাম, তারা যাচাই করবে। মেয়েটার ভোটার আইডি কার্ডটা ঠিক আছে কি না জানা দরকার ছিল। যোগাযোগ করে কিছুই জানতে পারলাম না। বর্তমান বাসায় আসার পর দিতে চাচ্ছিলাম না। মালিকের চাপে দিতে হলো।’ খিলক্ষেতের ডুমনি মস্তুল এলাকার বাড়ির মালিক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘একবার ফরম দিছিল। পূরণ করে দিছি। এরপর ফরমও দেয় না। আমরাও আর দিইনি।’

ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম পূরণ নিয়ে জানতে চাইলে এমনই মন্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। ভাড়াটিয়া, বাড়ির মালিকসহ সংশ্লিষ্টরা স্থানীয় থানা পুলিশের দেওয়া ফরম পূরণ করে দিলেও বিষয়টি নিয়ে একেবারেই অন্ধকারে আছেন। এই ফরম পূরণ করা নিয়ে সাধারণ বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের মধ্যেও রয়েছে অসচেতনতা। অপরাধীদের নজরদারিতে আনতে ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম পূরণ ও ডাটাবেজ তৈরির কার্যক্রম শুরু করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। শহরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, কার্যক্রমটি স্তিমিত হয়ে পড়েছে। পুলিশ এখন নতুন করে ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ করছে না। অসংখ্য ভাড়াটিয়া এখনো তথ্য ফরম পূরণ করেননি। কেউ মিথ্যা তথ্য দিয়ে বাড়ি ভাড়া নিলেও সেটি যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। যেসব বাড়িতে গোপনে জঙ্গি আস্তানা গড়ে তোলা হয়েছিল সেসব বাড়ির মালিকরাও ভাড়াটিয়াদের ব্যাপারে ছিলেন চরম উদাসীন। সেই বাড়িগুলো ঘুরে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত বাড়ি নিয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন মালিকরা। দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ ও গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করলেও নিরাপত্তা পুরোপুরি সচেতনতা নেই এসব বাড়িতে। জঙ্গি আস্তানায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির ও সাধারণ বাড়ির মালিকরা বলছেন, মিথ্যা তথ্য ও ভুয়া পরিচয়পত্র দিয়ে জঙ্গি কার্যক্রম চালানোর ঘটনায় বাড়ির মালিকরাও দায়ী হয়ে যাচ্ছেন। তাই বাসায় ওঠার আগেই ভাড়াটিয়াদের তথ্য ফরমের সত্য-মিথ্যা যাচাই হওয়া জরুরি। ভাড়াটিয়ারা বলছেন, বাসা বদল করলেই তথ্য ফরম পূরণের নামে হয়রানি করা হচ্ছে। তবে কোথায় কিভাবে ডাটাবেইস তৈরি হচ্ছে তা তথ্যদাতা জানেন না। নেই কোনো শনাক্তকরণ নম্বর বা পরিচিতির ব্যবস্থা। তবে পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, সিটিজেন ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিআইএমএস) সফটওয়্যারে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ ভাড়াটিয়া পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সেখানে একই তথ্য বারবার বা একই পরিচয়পত্র নম্বর দিয়ে ভুয়া পরিচয় দিলে তা ধরা পড়বে। তথ্য সরবরাহ করে ভাড়াটিয়া ও মালিকদের ঝুঁকিমুক্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। 

ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে গেছে, এটি ঠিক নয়। এখন একটু ধীরে হচ্ছে। কারণ নতুন, যারা আগে তথ্য দেননি তাদের তথ্যই এখন সংগ্রহ করা হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রথম দিকে ভুল বোঝাবুঝির কারণে বিষয়টি বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে হচ্ছে। সিআইএমএস নম্বর দিয়েই মূলত ভাড়াটিয়াদের শনাক্ত করা যাবে। প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন হলে নাগরিকরা এর সুফল পাবে। ভুলও ভাঙবে সবার। এখানে কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে হয়রানির কিছু হচ্ছে না। প্রক্রিয়াটি সফল হলে বারবার তথ্য দেওয়া লাগবে না। উন্নত দেশে এ পদ্ধতিতেই হয়।’

ডিএমপির তথ্যমতে, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কয়েকটি বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার হওয়ার পর সেসব বাসার বাসিন্দা সম্পর্কে তথ্য না থাকার বিষয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে ডিএমপি। এর পর পরই ভাড়াটিয়াদের তথ্য থানায় দিতে বাড়ির মালিকদের সময় বেঁধে দেয় ডিএমপি। সে বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ১৫ মার্চের মধ্যে ভাড়াটিয়া নিবন্ধন ফরম পূরণ করে পার্শ্ববর্তী থানায় জমা দেওয়ার অনুরোধ জানান। এর পরই পুলিশের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে রিট করা হয়। পরে আদালত রিটটি খারিজ করে দেন। ডিএমপি দুই দফা সময় বাড়িয়ে গত বছরের ৩০ এপ্রিল তথ্য সংগ্রহের শেষ দিন নির্ধারণ করে। ওই সময় পর্যন্ত ৪৯ থানায় ১৮ লাখ ভাড়াটিয়ার তথ্য ফরম পূরণ করা সম্ভব হয়।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণপদ রায় জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৯ লাখ ৭১ হাজার ৭০১টি ভাড়াটিয়া পরিবারের তথ্য সংরক্ষণ করেছে পুলিশ। প্রতি পরিবারের গড়ে চারজন করে সদস্য হলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ লাখ নগরবাসীর তথ্য পুলিশের কাছে এসেছে। এখনো ২০ লাখ ৭০ হাজার ৯৭৭টি ফরম বিতরণ করা আছে। রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম পূরণ হয়েছে পল্লবী থানায়, প্রায় ৯০ হাজার। এরপর মোহাম্মদপুরে ৮৮ হাজার, দক্ষিণখানে ৮১ হাজার, কামরাঙ্গীরচরে ৬৬ হাজার, বাড্ডায় ৫৮ হাজার, রামপুরা ও শেরেবাংলানগরে ৫০ হাজার করে তথ্য ফরম পূরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রতিনিয়ত কাজটি চলছে। এখন নতুন তথ্য সংগ্রহ করে সফটওয়্যারে আপডেট করা হয়। এখনো সবখানে ফরম দেওয়া আছে। আর সিস্টেমটা এমন যে তথ্য যাচাই না হলে সমস্যা নেই। কাউকে হয়রানি করা হলে তথ্য পেলে আমরা সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেব।’

ঢাকায় বাড়ির মালিকদের কোনো সংগঠন পাওয়া যায়নি। তবে কয়েকজন মালিক বলেন, তথ্য ফরম পূরণ এবং জঙ্গি আস্তানার ঘটনায় তাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে। সন্দেহ ও তথ্য ফরম পূরণ করার চাপের কারণে ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে সম্পর্কও খারাপ হয়। যাচাই না হওয়ার কারণে ফরম পূরণ করেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন অনেক বাড়ির মালিক।

ভাড়াটিয়াদের মধ্যে রয়েছে অসচেতনতা ও সন্দেহ। জাতীয় ভাড়াটিয়া পরিষদের সভাপতি মোক্তার হোসেন খান বলেন, ‘পুলিশ শুধু কাগজ নিয়া যায়। কোনো স্লিপ পর্যন্ত দেয় না। এসব তথ্য নিয়ে কোনো কাজ করেনি তারা। সার্ভারে আছে কি না কেউ জানে? বাসা বদল করলে বারবারই তথ্য দিতে হচ্ছে। এটা হয়রানি ছাড়া কিছু নয়। যাচাই-বাছাই হলে ভুয়া আইডি কিভাবে থাকে?’ তিনি আরো বলেন, ‘ঢাকা শহরে দুই কোটিরও বেশি মানুষ। পুলিশ এখনো অর্ধেকেরই তথ্য নিতে পারেনি। পাবলিক ভালো মনে করলে এত দিনে হয়ে যেত। আগে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ দূর করতে হবে।’

আবুল কালাম নামে ভাটারার একটি বাড়ির মালিক বলেন, ‘এই ফরম নিয়ে প্রায়ই ঝামেলা লাগছে। ভাড়াটিয়ারা পূরণ করতে চায় না। পুলিশও এসে নেয় না। হঠাৎ কোনো কাজে এলে ভাড়াটিয়ার ফরম নাই কেন, তা নিয়ে ঝামেলা পাকায়!’

২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রূপনগরের শিয়ালবাড়ীর ৩৩ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর বাড়িতে অভিযানে নিহত হয় নব্য জেএমবির নেতা মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম। ওই বাড়ির পঞ্চম তলায় ভাড়া নিয়ে থাকতেন তিনি। পুলিশ তদন্ত করে বাড়িটি শনাক্ত করলেও মালিকপক্ষ ভাড়াটিয়া সম্পর্কে কোনো তথ্যই দিতে পারেনি। অভিযানের পর সতর্ক হয়েছেন মালিক। ওই ভবনে গিয়ে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তালাবদ্ধ বাড়িতে ঢোকা যায়নি। তিনতলা থেকে এক নারী বলেন, পরে আসেন; পুরুষ কেউ নেই।’ পরে মালিক আবুল হাসেমকে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই ভাড়াটিয়াদের বিষয়ে সতর্ক ছিলাম। পুলিশকেও আমরা সহযোগিতা করেছি। ভাড়াটিয়ার তথ্য ফরম পূরণ করে আমি এখন থানায় দিয়ে আসি। কিন্তু কেউ যদি জাল এনআইডি বা ভুল তথ্য দেন, সে ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা কী করবেন? আমাদের থানা থেকে তো কিছুই জানানো হয় না। তারা তো পরীক্ষা করে জানাবে।’

 

জঙ্গি থাকা বাড়িতে অসচেতনতার নজির

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৩০টি বড় ধরনের জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালিয়েছে। এর মধ্যে ২১টি আস্তানা এবং হামলার স্থানে ৭৪ জন নিহত হয়েছে। তেজগাঁওয়ের পশ্চিম নাখালপাড়ায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাছে ১৩/১ নম্বর ছয়তলা বাড়ি ‘রুবি ভিলায়’ গত ১১ জানুয়ারি রাতে পঞ্চম তলার মেসে অভিযান চালায় র‌্যাব। এ সময় র‌্যাবের সঙ্গে গোলাগুলিতে তিন তরুণ নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে একই ছবি থাকা দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র উদ্ধার করা হয়। পরে তদন্তে জানা যায়, কুমিল্লার মেজবাহ নামে এক তরুণ নিজের ছবি দিয়ে দুটি ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি করে এর ফটোকপি মেসের তত্ত্বাবধায়ক রুবেলকে দেয়। তবে থানায় ভাড়াটিয়াদের তথ্য ফরম পূরণ করে দেওয়া হয়নি। বাড়ির মালিক এসব বিষয়ে ছিলেন চরম উদাসীন। সম্প্রতি ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, প্রধান ফটক খোলা। বাড়িতে নেই কোনো নিরাপত্তাকর্মী। তবে প্রবেশপথে বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা। সেই মেসে এখনো তালা ঝুলছে। দ্বিতীয় তলায় মালিকের ফ্ল্যাটে এক নারী দরজা খোলেন। পরিচয় জানাতেই ঘরে কেউ নেই বলে দরজা বন্ধ করে দেন তিনি। তবে তখনো ঘরের ভেতরে লোকজনের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। অভিযান পরিচালনাকারী র‌্যাব ৩-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এমরানুল হাসান বলেন, ‘ভবনটির মালিক শাহ মো. সাব্বির হোসেন বিমানের পারসার। তিনি বেশির ভাগ সময় বাইরে থাকেন। তাঁর স্ত্রীও লোকদের দিয়ে কাজ করান। বাড়ির সাধারণ নিরাপত্তার প্রশ্নে তাঁদের ‘রহস্যজনক অবহেলা’ আছে। বাড়ির মালিককে জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে ১৪ জানুয়ারি র‌্যাব তেজগাঁও থানায় একটি জিডি করে এ ব্যাপারে তদন্ত বা আইনগত প্রক্রিয়া নেওয়ার কথা বলে। তিনি আরো বলেন, ‘একই বাড়ি থেকে আগেও দুটি অভিযান চালিয়ে নাশকতাকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়। এর পরও সতর্ক বা সচেতন হয়নি মালিকপক্ষ।’ জানতে চাইলে তেজগাঁও থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘ওই বাড়িতে ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম দেওয়া হয়। সতর্ক করা হয়। তারা শোনেনি।’

২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ঘটে সন্ত্রাসী হামলা। সে বছরই ঢাকার কয়েকটি বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার হওয়ার পর সেসব বাসার বাসিন্দা সম্পর্কে তথ্য না থাকার বিষয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে ডিএমপি। এর পর পরই ভাড়াটিয়াদের তথ্য থানায় দিতে বাড়ির মালিকদের সময় বেঁধে দেয় ডিএমপি

গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর রাতে দারুস সালামের বর্ধনবাড়ীর ২/৩-বি নম্বর ‘কমল প্রভা’ নামে বাড়িতে পাঁচ দিন ধরে চলা অভিযানের সময় বিস্ফোরণে জঙ্গি আব্দুল্লাহ, তার দুই স্ত্রী নাসরিন ও ফাতেমা, দুই ছেলে ওসামা ও ওমর এবং দুই কর্মচারী নিহত হয়। অভিযানের পর বাড়িটির মালিক বিটিআরসির কর্মকর্তা ও হাবিবুল্লাহ বাহার আজাদের পুরো পরিবারকে আটক করে র‌্যাব। তার ছেলে বাংলাদেশ বিমানের পাইলট সাব্বির এনাম, স্ত্রী সুলতানা পারভীন ও আত্মীয় আসিফ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বাড়ি ভাড়া নিয়ে কবুতরের খামার গড়ে তোলা আব্দুল্লাহর মাধ্যমে বাড়ির মালিকের পরিবারও জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। সাব্বির উড়োজাহাজ নিয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করছিল। সম্প্রতি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটিতে সংস্কারের কাজ করাচ্ছেন রিয়াজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি। চার তলায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ফ্ল্যাটটি ছাড়া সবই সংস্কার চলছে। বাইরে টু-লেট লাগিয়ে ভাড়াটিয়া তোলা হয়েছে। ভবনের সামনে র‌্যাবের একটি সতর্কীকরণ নোটিশ থাকলেও সেটিকে উল্টে রাখা হয়েছে। ওই নোটিশে বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িটির তৃতীয় থেকে রুফটপ (ছাপ) পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করা আছে। জানতে চাইলে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এই বাড়ির মালিকের সঙ্গে চাকরি করি। পরিবারের কেউ না থাকায় আমি দেখাশোনা করি। তারা কোর্ট থেকে বাড়ি ঠিক করার অনুমতি পাইছে। আর আগের ভাড়াটিয়া কেউ নেই। এখন যারা আসছে তাদের আইডি কার্ড করা হচ্ছে।’

 

গুরুত্ব না দিলে নিজেদেরই ক্ষতি

কৃষ্ণপদ রায়

অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ), ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)

প্রতিটি বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ার কাছে তথ্য ফরম কেন পূরণ করা জরুরি সে খবরটি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বাড়িওয়ালাদের সচেতন করে ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম পূরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি থানার স্থানীয় বিট অফিসার এ ফরম পৌঁছে দেন। এর পরও গুরুত্ব না দিলে নিজেদেরই ক্ষতি। অপরাধীদের যেমন শনাক্ত করা যাবে, তেমনি নিজের নিরাপত্তায়ও সহায়তা পাওয়া যাবে। এটি সবার জন্যই মঙ্গলজনক। কোনো হয়রানির জন্য এ কার্যক্রম শুরু হয়নি। যাঁরা সচেতন হননি, গুরুত্ব দেননি, তাঁরাই সমস্যায় পড়েছেন। এখনো সিআইএমএস সার্ভারে তথ্য যুক্ত করা হচ্ছে। সেখানে এনআইডির ভুল তথ্য গেলে ধরা পড়বে। এক নাম ও তথ্যে একাধিক ফরম গেলে সেটা সার্ভার ধরে ফেলবে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। ফলে ক্রমেই সিস্টেমটি ডেভেলপ করা হবে।



মন্তব্য