kalerkantho


সোনালি শৈশবের কথা বলি

মারুফা মিতু   

১৮ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



সোনালি শৈশবের কথা বলি

মডেল : ওডেটা, আসিন, ছবি : মঞ্জুরুল আলম

শৈশব মানুষের সঙ্গে সঙ্গে ছায়া হয়ে হাঁটে। সারা জীবন শৈশবের স্মৃতি মনে রেখে মানুষ পথ চলে। মনের এক কোণে সব সময় ঘাপটি মেরে বসে থাকে প্রিয় এই সময়টা। শৈশবের বন্ধনটাই এমন। এই বন্ধনের মধ্যেই মনে ভাসে সময়কালটা হবে এমন—যেখানে থাকবে খেলার মাঠ, একঝাঁক দুরন্ত বালক কিংবা বালিকা, এগাছ-সেগাছ থেকে ফল চুরি। স্কুল পালানো আর মায়ের বকুনির সঙ্গে ভালোবাসা—কত আনন্দ, কত স্মৃতি। আহা! সোনালি শৈশব। এগুলো এখন মা-বাবার মুখে শোনা রূপকথার মতোই।

আধুনিক শৈশবে কী দেখি আমরা? আর কৈশোরে? আজকের কোমলমতি শিশুরা, যাদের শৈশব চার দেয়ালে বন্দি। তাদের কাছে শৈশব মানেই মোটা মোটা বই, ভারী ব্যাগ, খেলার জন্য কম্পিউটার আর মা-বাবার মুখে রাজা-রানির গল্পের পরিবর্তে বন্দিজীবনের নানা শর্ত। তাদের ছেলেবেলা যেন আটকে গেছে কোথাও।

মডেল : ওডেটা

একঘেয়ে জীবনে তারা ছোট থেকেই অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। যেখানে তাদের খেলার মাঠে ছুটে বেড়ানোর কথা, সেখানে তাদের সময় কাটে টেলিভিশনে কার্টুন দেখে আর গেম খেলে। যা শিশুর মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে তাকে নানা জ্ঞান অর্জন থেকে করছে বঞ্চিত। তাই শিশুকে চার দেয়ালে আটকে নয়, তাকে আপনার হাত ধরে পৃথিবী দেখান। তাকে তার শৈশব ফিরিয়ে দিন। আর এই ক্ষেত্রে আপনার ছোট ছোট কিছু কাজ শিশুকে দিতে পারে একটি সুন্দর শৈশব।

 

আলোর পৃথিবী

শিশুকে সারা দিন কম্পিউটার, ভিডিও গেম আর পড়াশোনায় আটকে না রেখে তাকে বই পড়ায় অভ্যস্ত করে তুলুন। এটি তার ভবিষ্যতের জন্য যেমন ভালো, তেমনি তার শৈশবের ক্ষেত্রে জরুরি। ফ্ল্যাটে বন্দি থেকে সে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই বই হতে পারে তার সঙ্গী। তার জানার মাধ্যম। এর থেকে ভালো আর কোনো মাধ্যম হতে পারে না। ফ্ল্যাটে বন্দি শিশুদের বন্ধু তেমন একটা থাকে না। সেই ক্ষেত্রে এই বই তার বন্ধু হয়ে তাকে সঙ্গ দিতে পারে, আর দিতে পারে নির্মল এক শৈশব।

 

গৃহকর্মীর সঙ্গে ভালো আচরণ

আপনি আপনার শিশুকে যা শেখাবেন, সে তা-ই শিখবে। তার সামনে গৃহকর্মীকে অসম্মান করবেন না। যতটা সম্ভব সম্মান দিয়ে কথা বলুন এবং শিশুকেও শেখান। ফ্ল্যাটে বন্দি থাকায় শিশুদের মধ্যে নৈতিকতাবোধ, কাকে কিভাবে সম্মান দিতে হবে, তা কখনো কখনো গড়ে ওঠে না। যা তার শৈশবের শিক্ষার একটি অংশ। আর শৈশবের এই শিক্ষা তার সারা জীবনের অর্জন। ছেলেবেলা থেকেই শিশুকে সঠিক শিক্ষা দিন।

 

বেড়ানো

শিশুকে একটি জায়গায় আটকে রাখবেন না। তাকে ঘুরতে নিয়ে যান। নতুন নতুন জায়গায় নিয়ে তাকে নতুন নতুন জিনিস শেখান। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দিন। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার মাধ্যম হোন আপনি নিজেই। ফ্ল্যাটে বন্দি শৈশব থেকে শিশুকে একেবারে মুক্ত করা সম্ভব নয়। তবে যতটা সম্ভব তাকে স্বাভাবিক শৈশব দেওয়ার চেষ্টা করুন। তাই নগরজীবনে অ্যাপার্টমেন্ট কালচারে বেড়ে ওঠা আপনার শিশুর শৈশব বিষণ্নতা আর একাকিত্বে ডুবে যাচ্ছে।

প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন এই শিশুরা বিশ্বজুড়েই ইন্টারনেট ব্যবহারে আসক্ত হয়ে পড়ছে। শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার যেমন অনেক সুবিধা করে দিচ্ছে, তেমনি এর মাধ্যমে বাড়ছে সাইবার অপরাধ আর পর্নোগ্রাফি ব্যবহার। শিশুরাই এসব সাইবার অপরাধী এবং পর্নোগ্রাফির শিকার হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারাহ দীবা জানান—‘আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে শিশুরা ইন্টারনেটে একেবারেই উন্মুক্ত এবং তাদের প্রতিরোধ করার কোনো ব্যবস্থা নেই। আমাদের সঙ্গে যেসব শিশুর কথা হয়, তাদের কাছে আমরা জানতে পারছি, তারা এমন ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছে ইন্টারনেটে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। শুধু তা-ই নয়, এর পরিমাণ এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।’ তিনি আরো জানান, ‘ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। আর এখনকার শিশু-কিশোররাই প্রথম প্রজন্ম, যারা মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেট ছাড়া বিশ্বকে কল্পনাই করতে পারে না।’

গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সাত থেকে ১৮ বছরের প্রায় ৭০ ভাগ শিশু ক্লাসওয়ার্ক করার সময় ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্টের মুখোমুখি হয়। আর বাসাবাড়িতে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ পরিবার শিশুদের কথা ভেবে পর্নোগ্রাফি কনটেন্ট ব্লক করে। এসবের ফলে শিশুর বিভিন্ন ধরনের মানসিক বিকাশজনিত সমস্যা, মানসিক বিকৃতি, মাদকাসক্তিসহ নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি সারাক্ষণ চার দেয়ালে বন্দি হয়ে থাকার কারণে আমাদের শিশুরা ওজন বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ছাড়া টেলিভিশন, ভিডিও গেম, কম্পিউটারের সামনে বসে থাকার ফলে শিশুর সামাজিক সম্পর্ক বিকশিত হচ্ছে না। পারিবারিক সম্পর্কগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা, মমত্ববোধ, ভালোবাসা কমে যাচ্ছে।

প্রকৃতি থেকে দূরে সরিয়ে শিশুদের বিনোদন আর অবসর কাটানোর জন্য যে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে টেলিভিশন, ইন্টারনেট, কম্পিউটারকেন্দ্রিক, সেটি শিশুদের নানাভাবে ক্ষতি করছে। স্কুল তৈরি হচ্ছে খুপরির মতো জায়গা নিয়ে। খেলার মাঠের সংখ্যা তো বাড়ছেই না; বরং অযত্ন-অবহেলা আর সুপরিকল্পনার অভাবে নাগরিক জীবন থেকে সেগুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

শিশুদের প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্নতা প্রসঙ্গে লেখক ও প্রাবন্ধিক মুহম্মদ জাফর ইকবাল জানান, ‘শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু ওদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় চার দেয়ালে বন্দি হয়ে কেটে যাচ্ছে। প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে না পারায় আমাদের শিশুরা নিজের দেশ, প্রকৃতিকে যেমন চিনছে না, তেমনি ওদের মধ্যে স্বভাবসুলভ কৌতূহলী মানসিকতা ও নতুন কিছু জানার চাহিদাও বিকশিত হচ্ছে না। আমাদের মাঝে সামগ্রিক অর্থে বিজ্ঞানমনস্কতা বৃদ্ধি না পাওয়ার এটাও একটা বড় কারণ বলে আমি মনে করি।’ তিনি আরো বলেন, ‘এভাবে দিন-রাত চার দেয়ালে বন্দি করে রেখে, মুখস্থ করিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যোগ্য নাগরিক করে গড়ে তোলা যাবে না। শিশুরা প্রকৃতির স্পর্শ না পাওয়ায় শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে বড় বড় বিজ্ঞানী, দার্শনিক পেতে চায়, তাহলে অবশ্যই শিশুশিক্ষার সঙ্গে প্রকৃতির মেলবন্ধন করতে হবে। শিশুদের নিয়ে যেতে হবে প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে।’


মন্তব্য