kalerkantho


ডিএসসিসির ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড

মাদক, দখল ও জলাবদ্ধতায় নাকাল পশ্চিম জুরাইনবাসী

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাভুক্ত পশ্চিম জুরাইন। দখল, মাদক আগ্রাসনসহ নানা অপরাধের জন্য এরই মধ্যে এলাকাটি ‘ক্রাইম জোন’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে মশার উপদ্রব, জলাবদ্ধতা, বিশুদ্ধ পানি ও গ্যাসের সংকট। পশ্চিম জুরাইনের বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে লিখেছেন জাহিদ সাদেক

১৮ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



মাদক, দখল ও জলাবদ্ধতায় নাকাল পশ্চিম জুরাইনবাসী

বিক্রমপুর প্লাজার সামনে খোঁড়াখুঁড়ি। উন্নয়নকাজের ধীরগতিতে বাড়ছে ভোগান্তি

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডটি শ্যামপুর ও কদমতলী থানার অন্তর্গত। আর এই দুই এলাকায় প্রকাশ্যে চলছে মাদকের জমজমাট ব্যবসা। হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। স্থানীয় তুলাবাগের বাসিন্দা ফজলে রাব্বী আক্ষেপ করে জানান, ‘প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে ওয়ার্ডের বিভিন্ন অলিগলিতে চলে মাদক বিক্রি ও সেবন। দিনেও বেশ কয়েকটি চক্র মাদক বিক্রি করে। প্রশাসন দেখেও যেন দেখে না। আমাদের যুবসমাজ রসাতলে গেলে কার কী আসে-যায়।’ অনুসন্ধানে ও তুলাবাগের স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব মাদক ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছে ক্ষমতাসীন একাধিক প্রভাবশালী নেতা ও শীর্ষ সন্ত্রাসী। এ ছাড়া পুলিশের গা-ছাড়া ভাব ও মাদক ব্যবসা নিয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ না করায় এই মাদক ব্যবসা প্রসারের অন্যতম প্রধান কারণ। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কদমতলী থানার ওয়াসা পুকুরপার এলাকার বিল্লালের মাদক স্পটে প্রকাশ্যেই মাদক বিক্রি হচ্ছে। এ জন্য সেখানে অধিকাংশ সময় মোটরসাইকেলে কিশোর ও যুবকদের আনাগোনা চলে। এলাকার কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পলাশ (মাদক বিক্রির জেরে) খুন হওয়ার পর থেকে জুরাইন, কোদারবাজার ও পাটেরবাগ এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কে ভুগছে। পুলিশ মাঝেমধ্যে এসব স্পটে অভিযান চালালেও মূল হোতা কখনো ধরা পড়ে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানকার মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে বিল্লাল। সে আশপাশেই থাকে এবং মোবাইল ফোনে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। আর বিল্লালের সহযোগী হিসেবে আছে সাইদুল, শাওন, ফরহাদ, ওহাব, সোহাগ, বিলকিস, কালি বেবি, কালা আরিফ ও সুমন। এদের মধ্যে সুমন বর্তমানে জেলে আছে। তুলাবাগের বাসিন্দা ওবায়দুল বলেন, ‘এলাকার উঠতি বয়সের ছেলেরা দিন দিন মাদকাসক্ত হচ্ছে। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় আছেন অভিভাবকরা। কিন্তু মাদক ব্যবসায়ীরা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকায় কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না।’ তবে পুলিশের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ অস্বীকার করে শ্যামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে শতভাগ আন্তরিকভাবে কাজ করছে পুলিশ। ইতিমধ্যে মাদকসম্রাট কানা খোকনকে হেরোইনসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’ এলাকাবাসীর অভিযোগকৃত নামগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পোস্তগোলার শাওনের নাম মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকায় আছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। বাকিদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে।’

 

 

রাস্তার পাশেই ভাগাড়

দীর্ঘদিনের সমস্যা জলাবদ্ধতা

পশ্চিম জুরাইন করিমউল্লাবাগ থেকে জুরাইন কবরস্থান পর্যন্ত সামান্য বৃষ্টিতেই জমে যায় হাঁটুপানি। আর বেশি পানি হলে তো কোমর অবদি উঠে যায়। এ ছাড়া জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় জুরাইন রেলগেট, জুরাইনবাজার, তুলাবাগ, আলমবাগ, ডিআইটি প্লট, পোস্তগোলা, খন্দকার রোড ও এমসি রোডে। করিমউল্লাবাগের বাসিন্দা ওষুধ দোকানদার সালাম সিকদার বলেন, ‘আমাদের এখান থেকে কবরস্থান পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে চলাচল করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ভাড়াটিয়া অতিষ্ঠ হয়ে এলাকা ত্যাগ করে। কিন্তু যারা স্থানীয় বাসিন্দা, তারা কোথায় যাবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলে শুধু আশ্বাস মেলে।’ পাশেই বুড়িগঙ্গা নদী থাকলেও কোনো কাজে আসে না। তার মূল কারণ হলো পানি বের হওয়ার কোনো জায়গা নেই। এ ছাড়া ড্রেনেজ-ব্যবস্থাও তেমন ভালো নয়।

 

বছরজুড়েই পানি ও গ্যাসের সংকট

পশ্চিম জুরাইন এলাকায় পানি ও গ্যাস সমস্যা যেন নিত্যদিনের। একটু বিশুদ্ধ খাবার পানি আনতে প্রতিদিন ছুটতে হয় কিলোমিটার দূরত্বে। স্থানীয় মসজিদগুলোই এখন একমাত্র খাবার পানির উৎস। সেখানেও দেখা গেছে দুর্ভোগ। পানির চাহিদা বেশি থাকায় কখনো কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পানি নিতে হয় বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা শাকিল। করিমউল্লাবাগের বাসিন্দা সোবহান জানান, ‘প্রতিবার নির্বাচনের সময় নেতারা গ্যাস-পানির ব্যাপারে ওয়াদা দেন; কিন্তু বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয় না। পানিতে পচা-গন্ধ থাকায় মাঝেমধ্যে গোসল করার জন্যও ব্যবহার করা যায় না। বিশেষ করে বর্ষাকালে এটা প্রকট আকার ধারণ করে। ফুটিয়েও পান করার উপযোগী থাকে না। তুলাবাগের মুদি দোকানি ফারুক আহমেদ বলেন, ‘পানির এ সমস্যার কারণে এলাকাবাসীর অনেকে পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এর প্রধান কারণ পানি পানের উপযোগী নয়।’ এ ছাড়া গ্যাস সংকট নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল ৮টায় গ্যাস চলে যায়, আসে দুপুর ২টার দিকে। আমরা কয়েক দফা তিতাসকে জানানোর পরও কোনো সমাধান হয়নি। এতে মহল্লার অনেকে ভোর রাতে উঠে রান্নাবান্নার কাজ সারে। এ ছাড়া জরুরি রান্নাবান্না করতে হলে কাঠ-খড়ি দিয়েও রান্না সারতে হয়।’

 

রেলের জায়গা দখল করে বসানো হয়েছে ফার্নিচার মার্কেট

রেলের জমি ও রাস্তা দখল

সরেজমিন জুরাইন রেলগেট বাজার। জায়গাটি রেলের; কিন্তু সেখানে বসানো হয়েছে শতাধিক ফার্নিচারের দোকান। আবার এসব দোকান বসানো হয়েছে অনেকটা স্থায়ীভাবে। এর পাশেই জুরাইন পোস্তগোলা ব্রিজের রাস্তা দখল করে দেওয়া হয়েছে শতাধিক কাপড় ও ফলের দোকান। কয়েকজন ফার্নিচার ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এই জমিটি যে মালিক লিজ নিয়েছে তাদের কাছে তাঁরা ভাড়া দিয়ে থাকেন। তবে কে লিজ নিয়েছে বা কিভাবে লিজ নিয়েছে তা তাঁরা বলতে রাজি হননি। জুরাইন পোস্তগোলা এলাকার হকার্স কমিটির আহ্বায়ক এ কে এম খায়রুল বাসার বলেন, ‘সেনাবাহিনী আমাদের ছেড়ে চলে যেতে বলেছে; কিন্তু আমাদের উচ্ছেদ করলে আমরা যাব কোথায়? সেনাবাহিনীর যতটুকু জায়গা লাগবে আমরা ছেড়ে দেব। কিন্তু একটি চক্র চক্রান্ত করে আমাদের এখান থেকে সরিয়ে নিজেরা দোকান বসিয়ে ব্যবসা করতে চাচ্ছে। এমনকি এরই মধ্যে আমাদের কাছে প্রতি দোকানের জন্য দুই লাখ করে টাকাও চেয়েছে।’

 

মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী

এলাকাটি নোংরা আর নিচু হওয়ায় জমে থাকে ময়লা পানি আর আবর্জনা। এতে এলাকায় দেখা দিয়েছে মশা-মাছির উৎপাত। তুলাবাগের বাসিন্দা ফজলুল হক জানান, ‘মূলত সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় মশার হিড়িক। মশার পাশাপাশি সমানতালে রয়েছে মাছির যন্ত্রণাও। মশা নিধনে সিটি করপোরেশন থেকে ওষুধ ছিটালেও তাতে কোনো কাজ হয় না। আদৌ তারা ওষুধ ছিটায় কি না আমার সন্দেহ আছে। তা না হলে মশার উপদ্রব কমে না কেন?’

 

ধুলাবালিতে আচ্ছন্ন জুরাইন-পোস্তগোলা রোড

যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা

পশ্চিম জুরাইন এলাকাটির রাস্তাগুলো একটু সরু হওয়ায় সেখানে সিটি করপোরেশনের ময়লার ট্রাক বেশি দূর ঢুকতে পারে না। এ জন্য দেখা যায় যত্রতত্র ময়লার স্তূপ। জুরাইন করবস্থান রোড, ডিআইটি প্লট, তুলাবাগ গলি, করিমউল্লাবাগ রোডসহ প্রায় প্রতিটি রাস্তা ও গলিতে দেখা যায় ময়লা-আবর্জনার ছড়াছড়ি। জুরাইন এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু রাসেল রাস্তার পাশের আবর্জনা দেখিয়ে বলেন, ‘আপনিই বলুন এমন পরিবেশে কী থাকা যায়? দুর্গন্ধে রাস্তা দিয়ে হাঁটাই যায় না!’ অন্যদিকে গেন্ডারিয়া-জুরাইন সড়ক থেকে শুরু করে পোস্তগোলা ব্রিজ, নারায়ণগঞ্জ রোড, বউবাজারসহ সব রাস্তা এখন ধুলায় ধূসরিত। মানুষজন চলাচল করছে মাস্ক কিংবা নাক চেপে ধরে। দীর্ঘদিন ধরে পোস্তগোলা থেকে জুরাইন রেলগেট পর্যন্ত সড়ক বেহাল। সড়ক বিভাগ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ঠেলাঠেলির কারণে সড়কটির সংস্কার হচ্ছে না। ফলে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে যাত্রী, যানবাহন ও পথচারীদের। পোস্তগোলা সেনানিবাসের সামনে থেকে শ্যামপুর থানা হয়ে জুরাইন পর্যন্ত সড়কটি খানাখন্দে ভরা। এ রাস্তায় যানবাহনে চলাফেরা করাই দুষ্কর। বৃষ্টির সময় কাদা-পানি আর শুকনো মৌসুমে ধুলাবালির দৌরাত্ম্যে এখানকার জনজীবন অতিষ্ঠ। এদিকে জুরাইন বিক্রমপুর প্লাজাসহ কয়েকটি মার্কেটের সামনের রাস্তা খুঁড়ে রাখা হয়েছে কয়েক মাস ধরে; কিন্তু কাজের কোনো নামই নেই। বিক্রমপুর প্লাজার সাইট ম্যানেজার শুভ বলেন, ‘প্রায় তিন মাস আগে মার্কেটের সামনের জায়গাটি খুঁড়ে রাখা হয়েছে। আমরা কয়েকবার জানানোর পর এখানে সামন্য একটু রাস্তা করে দিয়েছে।’

 

সমস্যার যেন অন্ত নেই!

৫৪ নং ওয়ার্ডের আওতাধীন অন্য এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে নতুন জুরাইন, আলমবাগ, ডিআইটি প্লট, তুলাবাগ, পোস্তগোলা, কবরস্থান রোড, খন্দকার রোড, এমসি রোড, করিমউল্লাবাগ। এ এলাকাগুলোতে নেই কোনো খেলার মাঠ। খেলতে চাইলে যেতে হয় নদীর ওপারে ঝিলমিল প্রকল্পে। এ ছাড়া নেই কোনো কমিউনিটি সেন্টার কিংবা কোনো সরকারি গ্রন্থাগার। খন্দকার রোডের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ডিএসসিসির যে কয়টি ওয়ার্ড রয়েছে তার মধ্যে তুলনামূলক সুবিধাবঞ্চিত ওয়ার্ডের তালিকা করলে সবার ওপর থাকবে আমাদের এই ওয়ার্ডটি। বিভিন্ন কর্তৃপক্ষকে আমরা অভিযোগ করতে করতে ক্লান্ত। তবু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই।’

 

নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ওয়ার্ডের উন্নয়নে আমি বদ্ধপরিকর

মো. মাসুদ

৫৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর

আমি জানি আমার এলাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যা রয়েছে। বর্ষা মৌসুম এলে এলাকাবাসীর চলাচল করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। সে বিষয়টি মাথায় রেখে এলাকার বেশ কয়েকটি স্থানে ড্রেনেজ-ব্যবস্থা সংস্কার করা হয়েছে। বর্ষার আগেই বাকিগুলো সমাধান করা হবে। আর গ্যাস-পানি সংকটের আমি নিজেও ভুক্তভোগী। এলাকার লোকজনের সঙ্গে আমিও তিতাসকে বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু গ্যাসলাইনে সমস্যা ও একই লাইন থেকে কয়েকটি বাড়িতে লাইন নেওয়ায় যাদের বাসা আগে তাদের বাসায় গ্যাস থাকলেও পরের বাড়িতে থাকে না। আর মাদক সমস্যার ব্যাপারে বলব, যারা মাদকের সঙ্গে জড়িত, তারা দেশ ও সমাজের শক্র। তাদের ব্যাপারে আমি থানায় বলে দিয়েছি, যে-ই হোক, কোনো ছাড় দেওয়া চলবে না। আর যেহেতু এলাকায় রাস্তার কাজ চলছে, এ জন্য ধুলাবালি কিছু হবে এটা মেনে নিতে হবে। এ ছাড়া মশার উপদ্রব কমাতে আমাদের লোকজন যে পরিমাণ ওষুধ দেয় তা যথেষ্ট নয়। এ সমস্যাসহ ওয়ার্ডের অন্য যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলো নিরসনে আমি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করব। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ওযার্ডের উন্নয়নে আমি বদ্ধপরিকর। 



মন্তব্য