kalerkantho


‘আমি আর বাংলাদেশ হাতে হাত রেখে বড় হয়েছি’

৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



‘আমি আর বাংলাদেশ হাতে হাত রেখে বড় হয়েছি’

জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সংগীতাঙ্গনে সমান তালে কাজ করে যাচ্ছেন। এই ঢাকায়ই তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ঢাকার যাপিত জীবনের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। লিখেছেন মীর রাকিব হাসান

 

জন্ম ১৯৬৯ সালে। ঢাকার শান্তিবাগে। দেশ তখন স্বাধীনতার আন্দোলনে উত্তাল। শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিবিজড়িত সেই সব দিনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার জন্মের দেড় বছর পরই মুক্তিযুদ্ধ হয়। দেশটার জন্ম হলো। বড় হতে থাকল। আমিও বড় হলাম। বলতে পারেন, আমি আর বাংলাদেশ হাতে হাত রেখে বড় হয়েছি।’

ছোটবেলা থেকেই গান গাইতেন তিনি। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে গান গাইতেন বলে ছোট থেকেই ঢাকার পরিবেশটা বেশ পরিচিত ছিল। তিনি বলেন, ‘সেই সময়ের ঢাকা ছিল অনেক শান্ত। চারদিকে ছিল সবুজ আর নিরিবিলি পরিবেশ। এই সময়ের সঙ্গে যার কোনো তুলনাই হয় না। এখন যেমন—ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট সিনেমাগুলোতে যে ঢাকা দেখি, ঠিক এমনটাই ছিল সেই সময়ের ঢাকার চিত্র। রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা কম ছিল। এখনকার মতো বড় বড় ভবন ছিল না।’

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক বন্ধনগুলোতেও এসেছে শিথিলতা। একে অন্যের প্রতি দায়বদ্ধতার, শ্রদ্ধার সেই সামাজিক পরিবেশটা তিনি আর খুঁজে পান না। স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি বলেন, “আমরা পাড়ার দোকানদারদের মামা বলে ডাকতাম। আমাদের পরীক্ষার ফলাফলের সময় হলে, তারা আমাদের পরীক্ষার ফল জানতে চাইত। আমরা যখন পরীক্ষা দিতাম, তখনই ভয়ে ভয়ে থাকতাম। কারণ পাড়ার মোড়ের দোকানদার মামাও জিজ্ঞেস করবে—‘কী রে, অঙ্কে কত পেলি? ইংলিশে কত পেলি?’ এই যে একটা দায়বদ্ধতা। পাড়ার দর্জি, ফেরিওয়ালা মামা—ওনাদের কাছেও আমাদের একটা দায়বদ্ধতা ছিল। ওনাদের কাছেও ভালো থাকতে হবে, সেই তাগিদটা অনুভব করতাম। সেই ব্যাপারটি এখন আর নেই। এখন একেবারে পাশের বাসার ছেলেটাকেও আমরা চিনি না। আর এ জন্যই কিন্তু আমাদের এখনকার ছেলে-মেয়েরা অনেক অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের দায়বদ্ধতার জায়গাটাই অনেক কমে গেছে। একমাত্র মা-বাবা ছাড়া কারো কাছে দায়বদ্ধতা নেই। আমাদের পাড়ার বড় ভাই ছিল, ছোট ভাই ছিল। ভুল ডিজাইনের জামা পরলেও বকা দিতেন। বলতেন, ‘এই—এইটা কী পরেছিস? যা, বাসায় গিয়ে চেঞ্জ করে আয়।’ আমরা কিন্তু তাদের কোলেও চড়েছি। কোনো নিরাপত্তার অভাব ছিল না। আর এখন এক বছরের বাচ্চারও নিরাপত্তা নেই।”

ঢাকার বর্তমান বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘ঢাকা তো একটা মেট্রোপলিটন শহর। এখানের বেসিক কিছু ব্যাপার ঠিক করা উচিত। যেমন—যাতায়াতব্যবস্থা। যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং করে রাখে, ফুটপাত দখল করে বসানো হয়েছে দোকানপাট। ফলে মানুষ হাঁটতেও পারে না। যানজটের কারণে সুষ্ঠুভাবে একটি কাজ সম্পন্ন করা যায় না। চরম অব্যবস্থার কারণে এই হাল। ঢাকায় পর্যাপ্ত রাস্তাঘাট নেই, যতটুকুই আছে, তা-ও ব্যবহার করা যায় না। এ রকম সংকুচিত এলাকায় এত ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার থাকবে কেন? এগুলো কমিয়ে পর্যাপ্ত সরকারি পরিবহনব্যবস্থা থাকতে হবে। সব শ্রেণির মানুষ যেন যাতায়াত করতে পারে, সেই সুব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ঢাকার পরিবহনব্যবস্থায় কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলা নেই। একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি চলছে। যত্রতত্র ফিটনেসবিহীন বাস চলছে—কেউ দেখার নেই। আমাদের নাগরিকদের অনেক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়, যা মানুষের স্বাভাবিক বিকাশের ক্ষেত্রেও অন্তরায়। ঢাকাকে সুষ্ঠু পরিকল্পনামাফিক গড়ে তুলতে না পারলে ঢাকার পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে নানা কলকারখানা, অফিস-আদালত ঢাকার বাইরে নিতে হবে। একটি ছেলে বা মেয়ের ঢাকার বাইরে পড়াশোনা করেও লক্ষ্য থাকে এই শহরে এসে চাকরি করা ও বসত গড়ার। এই ভাবনা কেন? কারণ, আমরা প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণে ব্যর্থ হয়েছি। ঢাকার বাইরে পুরো দেশে রাষ্ট্রের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ছড়িয়ে দিতে পারিনি। এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমি মনে করি, এখনো সময় আছে—সদিচ্ছা থাকলে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব।’

 



মন্তব্য