kalerkantho


তাঁতীবাজার মোড়ের ‘গ্রিন জোন’

সংস্কারকাজের দীর্ঘসূত্রতায় বাড়ছে ভোগান্তি

মো. জহিরুল ইসলাম   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



সংস্কারকাজের দীর্ঘসূত্রতায় বাড়ছে ভোগান্তি

তাঁতীবাজার মোড়ের সবুজ পার্কটি এখন আর নেই! দখলদারদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে টিকে ছিল বেশ কয়েক বছর। বর্তমানে পার্কটির জায়গায় ময়লা-আবর্জনা ফেলে নোংরা করছে কিছু অসচেতন মানুষ। পার্কের আশপাশে অবৈধভাবে করা হচ্ছে গাড়ি পার্কিং। এলাকাবাসী বলছে, কর্তৃপক্ষের অবহেলায় পার্কটির বর্তমান অবস্থা। স্থানীয় কাউন্সিলর বলছেন, নতুন প্রকল্প আসছে; তাই এটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতার কারণে বাড়ছে এলাকাবাসীর ভোগান্তি।

বছর কয়েক আগেও গুলিস্তান থেকে একটু সামনে গিয়ে কিংবা বংশাল মোড় থেকে সামনে দৃষ্টি রাখলেই দেখা যেত সবুজের সমারোহ। সবুজ গাছ ও ঘাসে ভরপুর ছিল স্থানটি। পরে পার্কটি বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনে ছেয়ে যায়। আর এখন ধুলা, ময়লা, আবর্জনা ছাড়া কিছুই নেই। যে জায়গাটিতে একসময় এলাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় ও পথচারীরা খোলা সবুজ পার্কে একটু বসে জিরিয়ে নিতে পারতেন, এখন তার চিহ্নমাত্র নেই।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পার্কটির পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই নাকে এলো গাঁজার গন্ধ। মনে হলো, কেউ নেশা করছে। পাশে একজনকে সন্দেহের বশে জিজ্ঞেস করতেই বলে উঠলেন—‘হ আমি খাই, তো কী হইছে?’ দেখা যায়, গ্রিন জোনটির মধ্যে এখন আর কোনো সবুজ নেই। একসময় পার্কটির চারপাশে কংক্রিটের টবে ছিল বিভিন্ন রকমের ফুলগাছ। পুরো চত্বর বিস্তৃত ছিল সবুজ ঘাসে। পরিপাটি করে কাটা ঘাসগুলো দেখে মনে হতো যেন সবুজ গালিচা। দক্ষিণ অংশে ছিল পাহাড়ের আদলে নির্মিত কংক্রিটের স্থাপনা। সেই স্থাপনায় যুক্ত ছিল জলাধার। বেশ কয়েকটি সিঁড়ি বেয়ে যখন পানি নিচে নেমে আসত, তখন মনে হতো যেন পানির নীরব স্রোত মনে শীতল প্রশান্তি বইয়ে দিচ্ছে। এখন এর কিছুই নেই, আছে শুধুই ইট-বালি আর ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে দেখা যায়, কেউ ময়লা ফেলছে, তো কেউ মূত্রত্যাগ করছে। আবার দোকানের ময়লার পলিথিনও ফেলছে টিনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে। এ ছাড়া ইংলিশ রোড থেকে রায়সাহেব বাজার মোড় পর্যন্ত অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরো কিছু খালি জায়গা। যেখানে অবাধে রাখা হচ্ছে পিকআপ, ট্রাক থেকে শুরু করে ছোট-বড় গাড়ি। স্ট্যান্ডটি রায়সাহেব বাজার মোড় পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। যার কারণে সদরঘাট রুটে যানজটও আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০০৮ সালে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য হেরিটেজ ক্রিয়েটিভ কাউন্সিল নামের একটি প্রতিষ্ঠান এটি নির্মাণ করার পর থেকেই নানাভাবে এটিকে ধ্বংস করার চেষ্টা অব্যাহত ছিল। অযত্ন-অবহেলায় পড়ে ছিল দীর্ঘ সময়। বিলবোর্ড তৈরি করা নিয়েও হয়েছে অনেক আলোচনা-সমালোচনা। তার পরও ক্ষমতাসীনরা তাদের প্রভাব খাটিয়ে ঠিকই বিলবোর্ড দিয়ে পার্কটির সৌন্দর্য লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। সবশেষে এবার গ্রিন জোনটিকে নতুন পার্কের দোহাই দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হলো। এখন দেখলে বোঝা যায় না যে এই স্থানটি ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা।

গ্রিন জোনের অনেকটা কাছেই বাসা নিলুফার আক্তার নামের এক গৃহিণীর। তাঁর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রাজধানীর ধুলাবালি আর গাড়ির শব্দে মানুষ সব সময় অতিষ্ঠ হয়ে থাকে। আমরা একটু শান্তিতে ছিলাম। ছোট পরিসরে হলেও বাসার সামনে এমন একটি সুন্দর পার্ক থাকলে অন্তত শান্তিতে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। এখন সেটাও ধ্বংস করা হয়েছে।’ জানা যায়, তাঁতীবাজার মোড় থেকে ইংলিশ রোড হয়ে রায়সাহেব বাজার মোড়ের কিছু আগ পর্যন্ত পার্ক করার পরিকল্পনা করছে ডিএসসিসি। তবে কবে নাগাদ কাজ শুরু হবে বিষয়টি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। পাশেই চলছে জিন্দাবাহার পার্কের সংস্কারকাজ। সেখানে গিয়ে কথা হয় গ্রিন জোনের রক্ষণাবেক্ষণ কাজে নিয়োজিত একজনের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘শুনেছি গ্রিন জোনের জায়গাটিতে নতুন করে অনেক বড় পার্ক হবে। আগে অনেক মানুষ দেখতে আসত। আবার নেশাখোরদেরও আড্ডার স্থান ছিল। এখন সাধারণ মানুষ আর আসে না। পুরোটাই নেশাখোরদের দখলে চলে গেছে।’ কথা হয় জিন্দাবাহার পার্কের সহকারী প্রকৌশলী আজহারুল ইসলামের সঙ্গে। বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার জানা মতে, গ্রিন জোনের জায়গাটি চৌরাস্তায় ঢুকে যাবে। এটি তাঁতীবাজারের গলির সঙ্গে মিশে যাবে। যার মাঝখানে তৈরি করা হবে ঝরনা।’ পথচারীদের মূত্রত্যাগে পরিবেশ আস্তে আস্তে আরো খারাপ হচ্ছে। পাশ দিয়ে হাঁটাও এখন কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় ডাব বিক্রেতা রশিদ মিয়া বলেন, ‘এখানে দোকান চালাতে অনেক ভেজাল। আগে খালি পুলিশের দৌড়ানি খেতে হতো। এখন এই জায়গায় মানুষের প্রস্রাবের গন্ধে দাঁড়ানোই যায় না। পুলিশের দৌড়ানি তো আছেই।’

সূত্রে জানা যায়, ডিএসসিসি থেকে প্রায় দুই হাজার ২৩২ বর্গফুট আয়তনের জায়গাটি ইজারা নিয়ে ওই পার্ক নির্মাণ করেছিল হেরিটেজ। এতে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়। তাঁতীবাজারের স্থানীয় বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘খেলার মাঠ, হাঁটার জন্য একটু খোলা জায়গা—সবই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। সব জায়গা কৌশলে দখলদাররা দখল করে নিচ্ছে। আর সাধারণ মানুষের জন্য একটু দাঁড়ানোর জায়গাও থাকছে না। এলাকার ফুটপাতগুলোও হকারদের দখলে। এসব দেখার যেন কেউ নেই।’

অধুনালুপ্ত এই পার্কটির জায়গার মালিক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। বিষয়টি নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশেন ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবু সাঈদ বলেন, ‘নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলেই বর্তমানটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই এখানে পার্কের কাজ শুরু হবে। মানুষ ময়লা ফেলে বলে দেয়াল দিয়ে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তা-ও ময়লা ফেলা বন্ধ হয় না। আশা করছি, খুব অল্প সময়ের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে নতুন পার্কটি নির্মাণ করা হবে। আর আশপাশে অবৈধভাবে যাতে কেউ গাড়ি পার্ক না করতে পারে বা দখলে নিতে না পারে, সে বিষয়টি আমি দেখব। গৃহীত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এখানকার সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা পাবে বলে আমি মনে করি।’



মন্তব্য