kalerkantho


পূর্ব জুরাইন

তিতাস খালপারের দুঃখগাথা

জাহিদুল ইসলাম   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



তিতাস খালপারের দুঃখগাথা

পূর্ব জুরাইনের একাধিক রাস্তায় বছরজুড়েই এমনিভাবে জমে থাকে পানি

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কদমতলী থানার অন্তর্গত পূর্ব জুরাইন খালপার এলাকা। এটি দক্ষিণ সিটি করপোরেশেনের ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। পূর্ব জুরাইনের হাজি কালা মিয়া সরদার রোড, কলেজ রোড, বাগানবাড়ি রোড, ওয়াসা রোড, সবুজবাগ, ব্যাংক কলোনিসহ বেশ কয়েকটি এলাকা নিয়ে এই ওয়ার্ডটি গঠিত। ময়লা-আবর্জনাপূর্ণ তিতাস খাল, রাস্তায় সারা বছর জলাবদ্ধতা, খানাখন্দে ভরা সড়ক, গ্যাস আর পানি সংকটে এলাকাবাসীর যাপিত জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। এ ছাড়া ওয়ার্ডটিতে নাগরিকদের জন্য নেই কোনো কমিউনিটি সেন্টার কিংবা পার্ক বা খেলার মাঠ। আছে মশা ও মাদকসেবীদের উপদ্রব।

শুষ্ক মৌসুমেও রাস্তায় জলাবদ্ধতা

পূর্ব জুরাইন কমিশনার গলি থেকে মিষ্টির দোকান এলাকায় আসতে হাজি খোরশেদ আলী সরদার রোডের অর্ধেকের বেশি পানির নিচে, যা এই রাস্তার ১২ মাসের চিত্র। খোরশেদ আলী সরদার রোড ছাড়াও খালপার এলাকার প্রধান দুটি সড়কই কি শীত, কি বর্ষা সারা বছরই থাকে পানির নিচে। বর্ষার সময় সে পানি পৌঁছে যায় একেবারে কোমর অবধি। এতে স্বাভাবিক চলাচল তো দূরের কথা, একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ এ পথ মাড়ান না। রাস্তায় যাতে হাঁটতে না হয় সে জন্য খালপার থেকে ইজিবাইকে পাঁচ টাকার বিনিময়ে আছে জুরাইন বাজারে আসার সুযোগ। সরেজমিনে দেখা যায়, পূর্ব জুরাইন আশরাফ মাস্টার আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়টি এ রাস্তার পাশে অবস্থিত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়ছে সবচেয়ে বেশি। স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী পিয়ারুল ইসলাম বলে, ‘আমার বাড়ি তিতাস গ্যাস রোডে। সেখান থেকে এখানে আসতে গোটা রাস্তায় এসব পচা পানি মাড়িয়েই আসতে হয়।’ অনুসন্ধানে জানা যায়, পূর্ব জুরাইন এলাকার জলাবদ্ধতার সমাধানের জন্য প্রায় প্রতিদিন স্থানীয়রা বৈঠক করেন। তবু এর সমাধান মেলেনি দীর্ঘ ২৫ বছরে। এলাকাবাসী গণস্বাক্ষর নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের আন্তরিক সহযোগিতাও চেয়েছেন। কিন্তু প্রতিবার নামমাত্র খাল পরিষ্কার করে সরকারি এই সংস্থা অর্থ আত্মসাৎ করে বলে অভিযোগ স্থানীয় লোকজনের।

ময়লা-আবর্জনায় পূর্ণ খাল। তার ওপর অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে দোকানপাট

ময়লা-আবর্জনায় ভরা তিতাস খাল

১৪ ফুট প্রস্থের খাল পরিণত হয়েছে তিন ফুটে। খাল পরিপূর্ণ, ময়লা-আবর্জনায় ভরা, পানি প্রবাহ নেই। খালের ওপর মাচা পেতে বসানো হয়েছে কয়েকটি দোকান। এক পাশের বাসিন্দারা খাল পার হওয়ার জন্য নিজ নিজ বাড়ির সামনে স্ল্যাব বসিয়েছেন। দেখা যায়, খোরশেদ আলী সরদার রোডের মিষ্টির দোকান এলাকা থেকে তিতাস খালের শুরু। খালপারের রাস্তাটির নাম খালপার রোড। খালের অবস্থা দনিয়া পর্যন্ত প্রায় একই হাল। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি আনোয়ার মাস্টারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তিতাস খাল খনন করা হয়। সে সময় এর প্রস্থ ছিল গড়ে ১৪ ফুট। তখন পূর্ব জুরাইনের প্রায় সব পানি এই খাল দিয়েই প্রবাহিত হতো। সেই সময় খালের পারে মানুষের চলাচলের জন্য একটি ছোট রাস্তা ছিল। দিনে দিনে সেটির প্রস্থ বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে দখলের পরিমাণও বাড়তে থাকে। নব্বইয়ের দশকে খালে দেয়াল তুলে ১০ ফুট প্রস্থের পাকা সড়ক তৈরি করা হয়। পরে দনিয়া অংশেও রাস্তা তৈরি করা হয়। এতে খালটি তিন ফুট প্রস্থের নালায় পরিণত হয়েছে। এর পর থেকে দিনে দিনে এলাকার জলাবদ্ধতা বাড়তে থাকে। সব শেষে গত বর্ষায় এই এলাকায় জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। স্থানীয় বাসিন্দা বাহাদুর মিয়া জানান, দুটি নদীর পার ঘেঁষে এলাকা পূর্ব জুরাইন। তবু ওই এলাকায় সারা বছর জলাবদ্ধতা, যা স্থানীয় বাসিন্দারের চিন্তার কারণ। স্থানীয় এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড ছয় থেকে সাত মাস পর পর তিতাস খাল পরিষ্কার করতে আসে। খাল পরিষ্কার করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা নিজেদের লেবার, নিজেদের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করেন। যার ফলে সরকারি টাকা হাতিয়ে নিতে তাঁদের সুবিধা হয়। আপনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানাই, এলাকাবাসীর দুর্ভোগের কথা ভেবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।’ 

রয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পূর্ব জুরাইনে যখন ওয়াসার পানির সংযোগ দেওয়া হয়, তখন এই এলাকায় ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষের বসবাস ছিল। কিন্তু এখন মানুষ বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। অথচ ওয়াসার পানির পাইপ বা সংযোগ আগেরগুলোই আছে। এ ছাড়া পানি এলেও পানিতে এত ময়লা আর দুর্গন্ধ থাকে যে সে পানি দিয়ে গোসল পর্যন্ত করা যায় না। বর্ষাকালে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। পানি সমস্যার কারণ হিসেবে হাজি কালা মিয়া সরদার রোডের বাসিন্দা আবুল খায়ের বলেন, ‘ওয়াসার লাইন ঘেঁষে অনেকেই বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন। অনেকে রাস্তা খুঁড়ে পানির সংযোগ নিয়েছেন। এতে অনেক স্থানে পাইপ ফেটে গেছে। ফলে নানা কারণে পানি দূষিত হচ্ছে। এ ছাড়া অনেক সময় লাইনে পানিও থাকে না। বছরের পর বছর এসব সমস্যা থাকলেও কেউ যেন দেখার নেই।’

চরম গ্যাস সংকটে এলাকাবাসী

পূর্ব জুরাইনের বিভিন্ন এলাকায় তিতাস গ্যাসের সংকট চরম আকার ধারণ করে। সকালে থাকে তো বিকেলে নেই। এ জন্য এলাকার মানুষ সুযোগ পেলেই একই সঙ্গে সারা দিনের খাবার রান্না করে রাখে বলে জানালেন স্থানীয়রা। এমন কোনো দিন নেই যে দিন গ্যাসের সমস্যা হয় না। সরবরাহ লাইনের পাইপ ছিদ্র হয়ে বুদবুদ আকারে গ্যাস বের হচ্ছে। দেখা যায়, পূর্ব জুরাইনের খোরশেদ আলী সরদার রোডে একটি বাড়ির পাশে নালা থেকে বুদবুদ আকারে গ্যাস বের হচ্ছে। এ ছাড়া পূর্ব জুরাইন প্রধান সড়ক ও তিতাস খালের বিভিন্ন অংশ থেকেও বুদবুদ আকারে গ্যাস বের হতে দেখা গেছে। এতে এই এলাকার বেশির ভাগ বাড়িতে সকাল ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ থাকে না বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ নূর হোসেন বলেন, ‘এলাকায় জলাবদ্ধতার বিষয়টি সমাধানের জন্য আমরা কাজ শুরু করেছি। স্থানীয় এমপি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা জলাবদ্ধতা নিরসনে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ৫৫৮ কোটি টাকার কাজ করাচ্ছেন। সংস্কারকাজ শেষ হলে, আশা করি, এ সমস্যা  আর থাকবে না।’ এ ছাড়া গ্যাস ও পানি সমস্যার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব সমস্যা দীর্ঘদিনের। ধীরে ধীরে সমাধান করা হবে।’

 


মন্তব্য